খাদ্যে ভেজালের কথা আসিলেই মনে পড়ে নীরোদ সি চৌধুরীর ‘আত্মঘাতী বাঙালির’ কথা। একটি জাতি নিজেরাই নিজেদের পঙ্গু করিয়া ফেলিতেছে দিনে দিনে। নানাবিধ খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকারক কেমিক্যাল মিশানো আমাদের দেশে রীতিমতো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হইয়াছে। বিশেষ করিয়া শহরে যেইখানে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসামগ্রীর উপর ভোক্তারা বেশি নির্ভরশীল, সেইখানে অধিকাংশ খাদ্যেই পাওয়া যায় ভেজাল ও ক্ষতিকর কেমিক্যাল। নানা সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন অভিযান, মোবাইল কোর্ট ইত্যাদি পরিচালনা করিলেও কোনো ক্রমেই এই সমস্যাকে বাগে আনা যাইতেছে না। ভেজাল খাদ্যসামগ্রী জাতিকে নীরবে মরণদশার দিকে ঠেলিয়া দিতেছে। ইহার কারণে নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হইতেছে মানুষ; চিকিত্সায় ব্যয় হইতেছে বিপুল অর্থ। সম্প্রতি নতুন করিয়া হলুদে পাওয়া গিয়াছে সিসা। আইসিডিডিআর,বি এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় এই তথ্য উঠিয়া আসিয়াছে। হলুদ আমাদের দেশে বহুল ব্যবহূত একটি মসলা; স্বাস্থ্যের জন্য ইহার নানাবিধ উপকারী দিকও রহিয়াছে। হলুদ হূদ্যন্ত্রকে রক্ষা করে, হলুদের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ক্যানসার ঠেকাতে সাহায্য করে, মস্তিষ্কের ক্ষয়জনিত সমস্যা রোধ করে, যকৃত্ সুরক্ষিত রাখে, হজমের সমস্যা দূর করে, ওজন হ্রাসে সাহায্য করে। ফলে হলুদে সিসা পাওয়া যাওয়ার এই খবরে দুশ্চিন্তায় পড়িয়াছেন ভোক্তারা। গত সোমবার এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ জার্নালে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে বলা হয়, সবচাইতে বেশি হলুদ উত্পাদন করা হয়, এমন নয়টি জেলা থেকে ১৪০টি নমুনা সংগ্রহ করেন গবেষকরা। এর মধ্যে সাতটি জেলা থেকে হলুদে সিসা বা লেড ক্রোমেট পাওয়া গিয়াছে। ২০১৮ সালে আইসিডিডিআর,বি একটি গবেষণা প্রতিবেদন দিয়াছিল, যেখানে বলা হইয়াছিল, অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের শরীরে তারা সিসার উচ্চমাত্রা পাইয়াছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে এই সিসার উত্স আবিষ্কার করা হয়। ইহাতে দেখা যায়, মায়ের রক্তে পাওয়া সিসা আর হলুদের মধ্যে মিশ্রিত সিসা একই। আইসিডিডিআর,বির গবেষণায় বলা হইতেছে, ২০১২-১৩ সালের দিকে বাংলাদেশের নয়টি জেলার অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের শরীরে ক্ষতিকারক সিসা বা লেড ক্রোমেট পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাব টেস্টে দেখা যায়, এ সিসার উত্স অবৈধভাবে ব্যবহূত রং বা উজ্জ্বলকারক লেড ক্রোমেট। স্থানভেদে এই লেড ক্রোমেট স্থানীয়ভাবে পিউরি, বাসন্তী রং, কাঁঠালি বা সরিষা ফুল রং নামেও পরিচিত। হলুদকে আরো চকচকে করিতে ইহা ব্যবহার করা হইতেছে।
অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের রক্তে এই সিসা বা লেড ক্রোমেট থাকিলে শিশুর ব্রেন ডেভেলপমেন্ট বা বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ সঠিকভাবে হয় না। ইহা ছাড়া হরমোনজনিত রোগ বৃদ্ধি ও দেহের রোগপ্রতিরোধক্ষমতা হ্রাস করে সিসা। স্নায়ুবিক নানা রোগও হইতে পারে সিসা গ্রহণের কারণে। সিসার এই ক্ষতিকর দিক বিবেচনায় নিয়া এই ভেজাল রোধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানাইয়াছেন, আগামী সপ্তাহে এই ধরনের হলুদ শনাক্তে মোবাইল কোর্ট বসানো হইবে। আমরাও আশা করি, জনস্বার্থে হলুদের ভেজাল রোধে ধারাবাহিক নজরদারি কার্যকর থাকিবে।
