২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটটি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল সাহেবের নিজের দেওয়া বাজেট। এই অর্থে এটি তার প্রথম বাজেট। এর প্রথম তিন মাস চার-পাঁচ দিনের মধ্যে শেষ হতে চলেছে। এর অর্থ অর্থনীতির প্রথম ত্রৈমাসিক কর্মকাণ্ড সমাপ্তি টানতে চলেছে। কেমন চলছে তার বাজেটের কর্মকাণ্ড? তিন মাস দিয়ে এক বছরের মূল্যায়ন করা যায় না। তবু মর্নিং শোজ দ্য ডে বলে একটা কথা আছে। এ কথায় বিশ্বাস রাখলে তিন মাসের অর্থনৈতিক পারফরম্যান্স নিয়ে একটি সমীক্ষা করাই যায়। এখানে প্রথম সমস্যা তথ্য-উপাত্তের। জুলাই-সেপ্টেম্বরের তথ্য হাতে নেই। তা পেতে আরো বেশ সময় লাগবে। তবু যা হাতে আছে তা দিয়েই শুরু করা যায়। বেসরকারি বিনিয়োগের অবস্থার উন্নতি হতে চলেছে বলে মনে হয়। ‘ইউনাইটেড আরব আমিরাত’ থেকে বেশ বড়ো ধরনের বিনিয়োগ আসবে—এই মর্মে কাগজে একটি রিপোর্ট দেখলাম। কথামতো প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এলে তা হবে অর্থমন্ত্রীর একটা বড়ো কৃতিত্ব। ইতিমধ্যে তিনি অবশ্য শেয়ারবাজারের অধোগতিটা সামলাতে পেরেছেন। শেয়ারবাজার কোনো মতেই অর্থনীতির কথা শুনছিল না। আমাদের সব সূচক ইতিবাচক, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের ওপর। কিন্তু এর প্রতিফলন শেয়ারবাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। এ প্রেক্ষাপটেই কাগজে দেখলাম অনেকগুলো নতুন কোম্পানির শেয়ার বাজারে আসবে। অনেকের এতে আপত্তি। কিন্তু অর্থমন্ত্রী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি শেয়ারের সংখ্যা বাড়াতে চান। এদিকে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশও (আইসিবি) নড়েচড়ে বসছে। সবচেয়ে বড়ো কথা, গত ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা শেয়ারের সূচক নেমেছিল সর্বনিম্ন পর্যায়ে অর্থাত্ ৫০০০-এর নিচে। ২৩ তারিখে তা ৫০০০-এ উঠে এসেছে। কারণ? কারণ, বাংলাদেশ ব্যাংক চায় বাণিজ্যিক ব্যাংক শেয়ারবাজারে তারল্য জোগাক। অর্থাত্ বাজারে সম্পৃক্ত হোক। তা কী করে সম্ভব? ওদের তো হাতে টাকা নেই, অর্থাত্ তারল্য (লিকুইডিটি) নেই। এমতাবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেপোর (রিপার্চেজ অর্ডার) বিপরীতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ফান্ড জোগাবে। সকল ব্যাংকেরই ‘ট্রেজারি বিল ও বন্ডে’ বিনিয়োগ আছে। এতে এদের টাকা আটকা। সিদ্ধান্ত হয়েছে, এর বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেবে। এতেই বাজার চাঙ্গা। বাজার চায় বিনিয়োগ করুক মানুষ। এ ধরনের বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য আমাদের প্রতিবেশী ভারত নিয়েছে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। তারা করপোরেট কর ১০ শতাংশেরও ওপরে হ্রাস করেছে। এক সিদ্ধান্তে শেয়ার-সূচক লাফিয়ে বেড়ে গেছে। আমাদের এ ধরনের চমক লাগানো কিছু সিদ্ধান্ত দরকার। ‘হোমিওপ্যাথি-কবিরাজি’তে এখন কাজ হবে না। একটা ঝাঁকুনি দরকার। আশা করি অর্থমন্ত্রী এসব নিয়ে ভাববেন।
তিন নম্বর ভালো খবর হচ্ছে মূল্যস্ফীতির খবর। আমরা সব সময় শুনে এসেছি ‘জিডিপি’র প্রবৃদ্ধির হার বেশি হলে, বাড়তে থাকলে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। আমাদের তা নয়। ২০১৯-এর জুনের তুলনায় জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেড়েছিল। কিন্তু আগস্ট মাসে তা জুন মাসের স্তর থেকেও নিচে নেমে এসেছে। আগস্ট মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৪৯, যা মোটামুটি সহনশীল একটা বর্ধিষ্ণু অর্থনীতির ক্ষেত্রে।
রপ্তানির পরিমাণ মোটামুটি আশানুরূপ। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার। আগস্টে কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। এর কারণ পুঁজিজনিত উত্পাদনে বিঘ্ন এবং রপ্তানিতে বিঘ্ন ঘটা। অবশ্য জুনের তুলনায় জুলাই-আগস্ট মাসে রপ্তানির পরিমাণ বেশি ছিল। আগস্টে সেই রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলার। অবশ্য সুখবর এখানে একটা আছে। বাণিজ্য ঘাটতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় বেশ হ্রাস পেয়েছে। ১৮-১৯ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১৫ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার (বিলিয়ন সমান শত কোটি)। এই ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্য ভবিষ্যতের জন্য সাবধান হওয়ার ব্যাপার আছে। আমাদের ‘জিডিপি প্রবৃদ্ধি’ অনেক বেশি। কিন্তু সেই তুলনায় রপ্তানি বৃদ্ধির পরিমাণ কম। এবং তা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। এর কারণ এক পণ্যনির্ভরতা। পাকিস্তান আমলের পাট, পাটজাত দ্রব্য, চা ও চামড়া—এই চারটি দ্রব্যের বদলে এখন আমরা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি শুধু তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর। তাও এর ভ্যালু এডিশন যেভাবে বাড়ার কথা সেভাবে বাড়ছে না। বাজারের পরিধিও ছোট। নতুন বাজার সৃষ্টি হচ্ছে না। এদিকে আমদানি কমার ফলে অর্থাত্ আমদানির প্রবৃদ্ধির হার কমার ফলে বাণিজ্য ঘাটতি কমার মতো সুখবর যেমন পাওয়া যাচ্ছে, তেমনি খবর পাওয়া যাচ্ছে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি হ্রাসের। এটা ভালো খবর নয়। শিল্পায়নের ধারা বোঝা যায় মূলধনি যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাচামাল আমদানির খবর দিয়ে। দুটো খবরই আশাপ্রদ নয়। এর সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যাংকঋণ। বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবাহ আশাপ্রদ নয়। এর কারণ কি উদ্যোক্তার অভাব, উদ্যোগের অভাব, না ঋণের চাহিদা কম? বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া দরকার। কিছুদিন আগে বিজিএমইএর বর্তমান সভাপতি বলেছেন, তার খাতে অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি তৈরি হয়েছে। ইস্পাত চিনি, বস্ত্র, সিমেন্টেও অতিরিক্ত উত্পাদনক্ষমতা তৈরি হয়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। অনেক উদ্যোক্তা বিদেশে বিনিয়োগ করছেন সরকারি ও বেসরকারিভাবে। আবার উলটোদিকে ব্যাংকারদের তারল্য সংকট আছে। ব্যাংকে আমানতের প্রবৃদ্ধি কম, ঋণের প্রবাহ বেশি। বিশেষ করে ২০১৬-১৭ এবং ২০১৮ সালে ঋণপ্রবাহ বেশি ছিল। সেসব এখন সমন্বয়ের প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া ব্যাংকিং খাতে এখন চলছে নানা ধরনের সংস্কার। খেলাপি নীতিমালা, সুদের হার ইত্যাদি ক্ষেত্রে বড়ো বড়ো পরিবর্তন হচ্ছে। এমতাবস্থায় ব্যাংক যেমন অপেক্ষা করার নীতি নিয়েছে তেমনি গ্রাহকদের মধ্যেও অপেক্ষা করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এসব কারণে আমানতের বাজারে একটা অস্থিরতা দেখা দিয়েছে যার প্রভাব পড়ছে ঋণপ্রবাহে। সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে সরকার সাবধানতা অবলম্বন করেছে। ফলে আমানতের বাজারে কিছুটা ঊর্ধ্বগতি অতিসাম্প্রতিক কালে লক্ষ্য করা যাচ্ছে; কিন্তু এখানে সমস্যা অতি নিম্ন সুদ হার। বর্তমানে তা মূল্যস্ফীতির হারেরও কম। এই জায়গাটাতে অর্থমন্ত্রীর অনেক করণীয় আছে। কারণ বিষয়টি সঞ্চয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। সঞ্চয়ই ব্যাংক আমানতে পরিণত হয় যার থেকে ঋণগ্রহীতারা ঋণ নেয়। অতএব এই ক্ষেত্রে যাতে কোনো ‘ইমব্যালেন্স’ তৈরি না হয় তা সরকারকে ভাবতে হবে। বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি ভাবনার বিষয়। সামগ্রিক অর্থনীতির বিষয়। এতে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া দরকার। সঞ্চয়ে উত্সাহ না দিলে, টাকা ব্যাংকে রাখতে উত্সাহ না জোগালে টাকা পাচার হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে। টাকা বড়োই ‘চঞ্চল’। যেখানে সে নিশ্চয়তা পায়, আর্থিক সুবিধা বেশি পায় সেখানেই সে চলে যায়। এখানে কোনো ‘দেশপ্রেম’ কাজ করে না। ভালো খবর আছে ‘রেমিট্যান্স’ খাতে। ‘রেমিট্যান্সের’ পরিমাণ স্থিতিশীল, বরং বাড়তির দিকে। সরকার রেমিট্যান্সের বিপরীতে যে নগদ আর্থিক সুবিধা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে অবশ্যই এর প্রভাব পড়বে সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর। মনে রাখা দরকার ‘রেমিট্যান্স’ গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রেখেছে। শিল্পের পণ্য বিক্রিকে স্থিতিশীল রাখছে। এখানে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে সমূহ বিপদ। দেখা যাচ্ছে রেমিট্যান্স জুন, জুলাই, আগস্ট মাসে ক্রমবর্ধমান ছিল। জুলাই মাসে বেশি বেড়ে ছিল ঈদের কারণে। এটা প্রতি বছরই হয়। দুই ঈদে, ফসল তোলার সময় রেমিট্যান্স কিছুটা বাড়ে। কৃষকের ছেলেরা যারা বিদেশে গেছে তারা উজাড় করে দেশে ডলার পাঠায়। আমাদের কৃতজ্ঞতা তাদের প্রতি।
একটা ক্ষেত্র মনে হয় অর্থমন্ত্রীকে ভাবাচ্ছে। আর তা রাজস্ব। ২০১৯-২০ অর্থবছরে রাজস্বের টার্গেট অনেক বড়ো। মনে হয় তা ৪৫ শতাংশ বেশি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তুলনায়। বর্তমান অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের টার্গেট ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এতে মাসিক রাজস্ব হতে হবে ২৭ হাজার কোটি টাকা; কিন্তু জুলাই মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে মাত্র ১৬ হাজার ১২৩ কোটি। এতে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার কারণ এখনো ঘটেনি। বছরের প্রথম দিকে সবসময়ই এমন হয়। আগামী নভেম্বর মাসে আয়কর আদায়ের শেষ মাস। এর মধ্যে সব আয়করদাতাকে সমস্ত কর পরিশোধ করতে হবে। মনে হয় এখন থেকে রাজস্ব আদায়ে একটা গতি আসবে। তবে কথা আছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের টার্গেটটি বেশ বড়ো। সেই তুলনায় রাজস্ব বোর্ডের জনবল কম। এমতাবস্থায় শোনা যাচ্ছে স্পেশাল আউটসোর্সিং করা হবে। ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে বৃদ্ধিটা খারাপ হবে না। তবে আয়করের ওপর নির্ভর করে চলতে হবে না। কারণ আয়করের টাকা সারা বছর ধরে উেসই অগ্রিম কর হিসাবে আদায় করা হয়ে থাকে। উেস অগ্রিম কর কাটা বস্তুত একটা ভালো ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। এমতাবস্থায় নির্ধারিত গ্রুপের জন্য, সাধারণ করদাতাদের জন্য আয়কর রির্টান জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা কি তুলে দেওয়া যায় না? আয়করের পরে আসে ‘ভ্যাট’ এবং ‘শুল্ক’। এই দুটোতেই ফাঁকিজুকি বেশি। শক্ত করে ধরলে এখান থেকে রাজস্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনা প্রচুর।
n লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
