আমার অনাড়ম্বর নাট্যজীবনে যত্সামান্য যা কিছু রচনা করেছি তা আমি আমার দায়বদ্ধতা থেকে করেছি। মঞ্চ নাটক লিখেছি, পথনাটক লিখেছি, লিখেছি টেলিভিশন নাটক এবং সবটাতেই শিল্পের মধ্যদিয়ে সত্য আবিষ্কারের চেষ্টায় ব্রত থেকেছি। কতটা সফল হয়েছি তা ভবিষ্যত্ বলবে—তবে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, সম্প্রতি আমি যে নাটকটি রচনা করলাম তা আমার নাট্যজীবনে এক নতুন অভিজ্ঞতা। রাজনৈতিক ও শিল্পজীবনে আমার চেতনায় এই নাটক এনে দিয়েছে এক নতুন ঢেউ ও বিস্ময়। এ ঢেউ কতটা স্রোতঃস্বিনী, কতটা শিহরণ এনেছে আমার শিল্পের অন্তরে ও মননে তা স্বল্প কথায় বলা যায় না।
এ নাটকটি লিখতে বসে আমি নিজেকে প্রথমে অপরাধী ভেবেছি, এতটা বছর পর এমন একটি সত্য, নির্মম, নৃশংস কালো অধ্যায় নিয়ে আজও লিখিনি কেনো! যে ইতিহাস আমারই মাটিতে ঘটেছে, রক্তাক্ত হয়েছে আমার ভূমি, জল ও জননী। একই সঙ্গে আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছি এই ভেবে যে, দেরিতে হলেও আমি আমার এই নাট্য রচনার মধ্যদিয়ে সেই অধ্যায়ের, সেই নৃশংস ইতিহাসের কিছু চিত্র তুলে ধরবার সৌভাগ্য অর্জন করছি—যা দিনের আলোতে অভিনীত হবে, জাতির সব প্রজন্মকে দেখাবে সেই কালো দিনগুলোর কিছু কলঙ্কিত কালো মানুষের ষড়যন্ত্রের ডালপালা ও মুহূর্ত।
বলছিলাম সম্প্রতি লেখা নাটক ‘ইনডেমনিটি’ নিয়ে। হঠাত্ কিছুদিন আগে ওয়ান বাংলা নামের একটি সুপরিচিত সংগঠন, যারা প্রধানত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে নানা কর্মকাণ্ড করে থাকে, তারা আমাকে এই নাটকটি লিখবার প্রস্তাব দেন। প্রস্তাব এলো, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যা করবার পর সব খুনি ও তাদের সহায়ক শক্তিরা নিজেদের আইনি পদ্ধতিতে রক্ষা করবার প্রয়োজনে তত্কালীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ইনডেমনিটি অর্থাত্ দায়মুক্তি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই জিয়াউর রহমান জাতীয় সংসদে এই কালো অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করে বঙ্গবন্ধুসহ ১৫ আগস্টের সব হত্যাকাণ্ডের বৈধতা দেয় এবং সব বিচারের অধিকার হরণ করে।
বাংলাদেশসহ সব গণতান্ত্রিক বিশ্ব এই কালো আইনকে ধিক্কার জানিয়েছিল। সেই কলঙ্কিত ইনডেমনিটি যার বীজ বপন করেছিল খুনি মোশতাক, আর সেই বীজকে মহিরুহে পরিণত করেছিল জিয়াউর রহমান। সেই ২৬ সেপ্টেম্বরকে আমরা ধিক্কার জানাতে চাই—ঘৃণা জানাতে চাই। সে উপলক্ষ্যে ওয়ান বাংলা নাটককেই ঘৃণা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে খুনিদের চরিত্র উন্মোচন করে জনসম্মুখে অভিনীত করবার প্রয়াস নেন। আমি ওয়ান বাংলার এ প্রস্তাব সাগ্রহে মেনে নেই। এও জানতে পারি, নাটকটি ন্যূনতম ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত নাট্যদল এ বছর ২৬ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার বিকাল ৫ ঘটিকায় একই সময় স্ব স্ব বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিনীত হবে। এ আমার জন্য এক বিরল সম্মান ও চ্যালেঞ্জ। ৭৫ সালের ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে হত্যার অনেক স্মৃতি আমার মস্তিষ্কে আজও গেঁথে আছে। এবং পরবর্তী সময়ে ৩ নভেম্বর, ৭ নভেম্বর এবং সর্বশেষে নানাভাবে খুনিদের পুরস্কৃত করে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সমন্বয়ে জিয়াউর রহমান গড়ে তোলেন একটি রাজনৈতিক দল। সেই দল কর্তৃক নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা এই ইনডেমনিটি বিলটি পাশ করে। পুরো ঘটনাটি অচেনা নয়; কিন্তু আমাকে ভাবিয়ে তুলল—কলঙ্কিত এমন একটি ইতিহাসকে কীভাবে নাটকে রূপ দেব! কী হবে তার আঙ্গিক, কী হবে সংলাপের ধরন-ধারণ, কেমন হবে খুনিদের চরিত্রের রূপায়ণ! বিশাল পটভূমি, নানা চরিত্র, বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর মতো একটি হিমালয়সম মানুষকে খুন করবার স্পর্ধা যাদের হয়েছিল কেমন হবে তাদের মুখরেখা! সেই সঙ্গে জিয়াউর রহমানের পাশ করা আইন ইনডেমনিটি যখন নাটকের শিরোনাম তখন স্বভাবতই কাহিনিতে অনিবার্য হবে ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের মধ্যদিয়ে যে সব ব্যক্তি ও গোষ্ঠী উপকৃত হলো (বেনিফিসিয়ারি) তাদের কলঙ্কময় চরিত্রগুলো কীভাবে চিত্রায়িত হবে! খন্দকার মোশতাকের ষড়যন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদের অবস্থান এবং হত্যাকাণ্ডে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা পত্রিকার কলামে, ইতিহাসের পুস্তকে যেভাবে রচনা করা যায় নাট্যকার হিসেবে আমার বিবেচনা মঞ্চে তার উপস্থাপনা ও প্রয়োগ কৌশল ততটা সহজ নয়। তবুও সিদ্ধান্ত নিলাম ‘ইনডেমনিটি’ লিখব, কারণ নাটকটি হতে হবে ইতিহাস আশ্রয়ী শিল্প। এ পথেই এগিয়ে রচিত হলো ‘ইনডেমনিটি’।
যদিও ১৯৯৬ সালে মহান জাতীয় সংসদে এই কলঙ্কিত বিলটি সর্বসম্মতিক্রমে বাতিল করা হয়।
জাতির পিতার হত্যার আইনি অধিকার কেড়ে নেবার প্রায় ৪৫ বছর পর এমন মহত্ প্রয়াসের একটি আপ্রাণ প্রচেষ্টা আমার রচিত ‘ইনডেমনিটি’— রচনাকালে আমার অনুভূতি ছিল আকাশচুম্বী। ভবিষ্যতে নিশ্চয় ইনডেমনিটি আইন নিয়ে অনেক বড়ো শিল্পকর্ম নির্মাণ হবে বলে আমার বিশ্বাস; কিন্তু সূচনালগ্নে ওয়ান বাংলার কল্যাণে আমি সংযুক্ত হতে পেরেছি, জাতির পিতার খুনিদের ষড়যন্ত্রে কলঙ্কিত আইনের বিরুদ্ধে ক্ষুদ্র হলেও শিল্পের ভ্রূণ বপন করতে পেরেছি—এটাই আমার পরম প্রাপ্তি।
n লেখক : সংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
