প্রাণিজগত্

পৃথিবীর দ্রুততম প্রাণী

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:১৬

একটি পাখি ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটার উড়তে পারে, শিকারির দূরত্ব বা প্রকৃতিভেদে এই ধরনের পাখি ঘণ্টায় ৩৮৯ কিলোমিটার বেগেও উড়তে পারে। আগে চিতাবাঘকে আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতগতির প্রাণী বলে জানতাম। চিতা ঘণ্টায় ১১৫ কিলোমিটার বেগে দৌড়াতে পারে। গতির দিক দিয়ে এই পাখিটি চিতাবাঘকেও হার মানিয়েছে। পাখিটির নাম পেরেগ্রিন শাহিন। পাখিটি পৃথিবীর দ্রুততম প্রাণী হিসেবে খেতাব পেয়েছে।

পেরেগ্রিন শাহিনের দৈর্ঘ্য ১৩ থেকে ২৩ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে এবং দেহের ওজন ৪৪০ থেকে ৭৫০ গ্রাম পর্যন্ত হয় (ঠোঁট ২.৬ সেন্টিমিটার, পা ৪.৯ সেন্টিমিটার, লেজ ১৪.৫ সেন্টিমিটার)। পুরুষ পাখির চেয়ে স্ত্রী পাখি বড় হলেও রঙে কোনো পার্থক্য নেই। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির পিঠের দিক কালচে ধূসর, দেহের নিচ লালচে, মাথা কালো, পেট ও রানে কালো ডোরা, চোখ গাঢ় বাদামি এবং পা ও পায়ের পাতা হলুদ। শিকারি পাখি হিসেবে এরা অপ্রতিরোধ্য। গোলাকার চোখ, বাঁকানো ধারাল দাঁত ও তীক্ষ নখ দিয়ে এরা শিকারকে মুহূর্তেই ছিন্নভিন্ন করে ফেলতে পারে। পেরেগ্রিন শাহিনের শিকার ধরার মুহূর্তটি জীবজগতের অন্যতম আকর্ষণীয় বিষয় বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে; যে পদ্ধতিতে পাখিটি শিকার করে তাকে বলা হয় Stoop, এর অর্থ নির্দিষ্ট উচ্চতা থেকে পাখিটি নিচের দিকে লাফ দেয় (মুক্তভাবে পড়তে থাকে), মাধ্যাকর্ষণকে কাজে লাগিয়ে গতি বৃদ্ধির জন্য শিকারি পাখি ডানা দুটো যতদূর সম্ভব দেহের সঙ্গে লেপটে রাখে। এই পতনের সময়ই পেরেগ্রিন শাহিন সহজেই ঘণ্টায় ১৮০ কিলোমিটার (১১২ মাইল) পাড়ি দিতে পারে। যদিও ঘণ্টায় ৩২২ কিলোমিটার (২০০ মাইল) বেগে চলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এদের ফুসফুস এবং হূদপিণ্ড দ্রুতগতিতে চলাচলের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। শিকার ধরার সময় অতি মৃদু নড়াচড়া করে চোখের নিমিষে দিক পরিবর্তন করতে পারে এবং অনায়াসে দুই কিলোমিটার দূর থেকে কবুতরের মতো ছোটোখাটো শিকারের দিকেও সোজা ধাবিত হতে পারে। সাধারণত শিকারকে বধ করতে এরা ধারালো নখর ব্যবহার করে, কিন্তু যে তীব্র গতিবেগে শিকারি পাখিটি অসহায় শিকারের ওপরে নেমে আসে, তাতেই নখরের সংস্পর্শে এসে শিকারের ঘাড় সঙ্গে সঙ্গেই মটকে যায়! এই অতিসফল Death-stoop পদ্ধতি পেরেগ্রিন শাহিনকে সারা বিশ্বে রাজত্ব করার ক্ষমতা দিয়েছে, তাই প্রায় সব মহাদেশেই এদের দেখা যায়। 

পৃথিবীতে পেরেগ্রিন শাহিনের মোট ১৯টি উপপ্রজাতি রয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, চীন ও ইন্দোনেশিয়াসহ বাংলাদেশের সব জেলাতেই বিরল পরিযায়ী পাখি হিসেবে এদের দেখা যায়।  পেরেগ্রিন শাহিন নদী, হ্রদ, খাড়া পাহাড়, জলাভূমি, লেগুন, প্যারাবন, অর্ধ-মরুভূমি ও পাথুরে প্রান্তরে বিচরণ করে। ডালে অথবা মাটিতে বসে কিংবা বৃত্তাকারে আকাশে উড়ে এরা শিকার খোঁজে। খাদ্যতালিকার মধ্যে আছে ভূচর পাখি, সৈকত পাখি, জলচর পাখি, পোষা পাখি এবং বাদুড়। ঊষা ও গোধূলিতে এরা খুব কর্মচঞ্চল থাকে এবং অত্যন্ত দ্রুত বেগে শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার দক্ষতা রাখে। মার্চ-মে মাসে প্রজননকালে এরা জোড়া বেঁধে আকাশে উড়ে সুনিপুণ মহড়া দেখায় ও মেকি লড়াই করে। মেয়েপাখি বাসার জন্য নির্ধারিত স্থানে বসে ডাকে চির-র-র-র। খাড়া পর্বতের গায়ে এবং কখনো গাছে ডালপালা, ঘাস ও পশম দিয়ে মাচার মতো বাসা বানিয়ে এরা তিন-চারটি ডিম পাড়ে। ডিমের মাপ ৫.২-৪.১ সেন্টিমিটার, ২৫ থেকে ২৭ দিনে ডিম ফোটে। মেয়েপাখি একা ডিমে তা দেয় এবং পরবর্তী প্রজন্মকে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে।