প্রভিশন রাখতে হিমশিম খাচ্ছে সরকারি ব্যাংকগুলো

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০১৮, ২২:১১

রেজাউল হক কৌশিক

ঋণের ঝুঁকি বিবেচনায় ব্যাংকের আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য খেলাপি ঋণের বিপরীতে নির্দিষ্ট একটি অংশ প্রভিশন রাখতে হয়। ব্যাংকগুলোর মুনাফা থেকে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে তা সংরক্ষণ করতে হয়। ব্যাংকের আয় খাত থেকে অর্থ এনে এ প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয়। আর প্রভিশন রাখতেই ব্যাংকের মুনাফার বড় অংশ চলে যাচ্ছে। খেলাপি ঋণ বাড়লে, আর সে অনুয়ায়ী ব্যাংকের আয় না হলে প্রভিশন ঘাটতি দেখা দেয়। টাকার অভাবে অনেক ব্যাংকই নির্ধারিত প্রভিশন রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে সরকারি ব্যাংকগুলো। ব্যাংক খাতের মোট প্রভিশন ঘাটতির চেয়ে বেশি ঘাটতি সরকারি চার ব্যাংকে।

জানা গেছে, ব্যাংকগুলো যে পরিমাণ আমানত গ্রহণ করে তার একটি অংশ ব্যাংকগুলোকে সংরক্ষণ করতে হয়, যাকে এসএলআর (স্টাটুটরি লিকুইডিটি রেশিও) বলে। আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য এ অর্থ রাখা হয়। আর বাকি আমানত ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করে থাকে; কিন্তু ব্যাংক যাদের কাছে বিনিয়োগ করে তারা ঋণ ফেরত না দিলে আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য খেলাপি ঋণের প্রকার ভেদে বিভিন্ন হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়।

খেলাপি ঋণের তিনটি পর্যায় রয়েছে, নিম্নমান, সন্দেহজনক এবং মন্দ বা কুঋণ। সাধারণত কোনো ঋণ মন্দ ঋণে পরিণত হলে ওই ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। আর সন্দেহজনক (ডাউটফুল) খেলাপি হলে ৫০ ভাগ ও নিম্নমানের (সাব-স্ট্যান্ডার্ড) খেলাপি হলে ২০ ভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। ব্যাংকের অশ্রেণিকৃত বা নিয়মিত ঋণের বিপরীতে দশমিক ২৫ থেকে ৫ শতাংশ হারে প্রভিশন রাখতে হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে সরকারি-বেসরকারি ১২টি বাণিজ্যিক ব্যাংক। এ তালিকায় সরকারি খাতের ৪টি ও বেসরকারি খাতের ৮টি ব্যাংকের নাম রয়েছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে এসব ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে আট হাজার ১২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, অগ্রণী, রূপলী ও বেসিক ব্যাংকেরই ঘাটতি ৯ হাজার ২৯২ কোটি টাকা। এছাড়া বেসরকারি খাতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক। সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়ায় ৪২১ কোটি টাকা। একই পরিস্থিতি সোস্যাল ইসলামী, ন্যাশনাল ও এবি ব্যাংকেরও। সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৩৫৭ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংকের ২৬১ কোটি ও এবি ব্যাংকের ১২৩ কোটি টাকা প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল ৫৬ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। এর বিপরীতে সংরক্ষণ করা হয়েছে ৪৮ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে আট হাজার ১২৭ কোটি টাকা। আগের প্রান্তিক জুন পর্যন্ত ব্যাংক খাতের সামগ্রিক প্রভিশন ঘাটতি ছিল ৬ হাজার ১৯২ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেশি হলে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যায়। তাতে ব্যাংক ঋণের সুদের হারও বাড়ে। বাংলাদেশে আমানতের সুদের হার কমিয়ে এসব সমন্বয় করা হচ্ছে। এতে একদিকে খেলাপি ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত প্রভিশন না থাকায় গ্রাহকদের জমা দেওয়া অর্থ অনিরাপদ হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে খেলাপি ঋণের কারণে কস্ট অব ফান্ড বেড়ে যাচ্ছে বলে আমানতের বিপরীতে সুদহার কমিয়ে দিয়ে আমানকারীদের ঠকাচ্ছে ব্যাংকগুলো।

প্রভিশন ঘাটতির কারণে শুধু ব্যাংকই যে বিপাকে পড়ছে তা নয়, আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডারদের জন্য বিপদ। সাধারণত কোনো ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দেখা দিলে মূলধনেও টান পড়ে। আর মূলধন ঘাটতিতে পড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মানুযায়ী ওই ব্যাংক বছর শেষে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশও দিতে পারে না। এতে প্রভিশন ঘাটতির ফলে একদিকে যেমন আমানতকারীদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হচ্ছে, অপর দিকে শেয়ারহোল্ডাররাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। যা বিতরণ হওয়া ঋণের ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ।