বিশ্বজিত্ দাস
‘আঙ্কেল, আপনি কী করেন?’ পায়ের উপর পা তুলে বসল মারুফ। মাত্র কিছুক্ষণ আগে ট্রেন ছেড়েছে। সামান্য সময়ের জন্যই থেমেছিল স্টেশনে। অমনি একগাদা মানুষ হুড়মুড় করে এসে উঠেছে ট্রেনে। ভিড় ঠেলে ঠেলে নিজের সিট খুঁজে বের করল মারুফ। মাথার উপর লাগেজ রেখে আয়েশ করে পায়ের ওপর পা তুলে বসল ও। চোখ পড়ল সামনে বসা আধবুড়ো একটা লোকের ওপর।
‘যাহ্! জার্নিটা মনে হয় ভালো কাটবে না।’ আশা করেছিল সহযাত্রী হিসেবে কোনো মেয়েকে পাবে ও।
‘ওকে। নো চিন্তা ডু ফুর্তি! বুড়োর সাথেই গল্প করি কিছুক্ষণ,’ ভাবল মারুফ।
‘আঙ্কেল, কী করেন?’
‘তেমন কিছু করি না, বাবা। এই ছোটখাটো চাকরি করি।’ বুড়ো উত্তর দিল।
‘কোথায় যাচ্ছেন?’ ছটফটে মারুফ কী জিজ্ঞেস করবে, সেটা যেন বুঝতেই পারছে না।
‘পরের স্টেশনে যাচ্ছি। তুমি কোথায় যাচ্ছ?’
‘আমি ঢাকায় যাচ্ছি আঙ্কেল।’
‘চাকরির পরীক্ষা দিতে?’
‘না আঙ্কেল। ‘কে হবে মন্টু মিয়া’ নামের একটা রিয়েলিটি শোতে অংশগ্রহণ করতে।’
‘বাহ্! চান্স পেয়ে গেছ না কি?’
‘নাহ্ আঙ্কেল। এখন তো মাত্র অডিশন। প্রাথমিক বাছাইয়ে টিকলে তারপর...’
‘কী মনে হয় অডিশনে টিকবে?’
‘টিকব না মানে! দু লাখ দিয়েছি।’
‘অডিশনের জন্য দু লাখ! তাহলে তো টিকে যাওয়ার পর আরো কত লাখ যে লাগবে।’
‘সেটা নিয়ে চিন্তা করি না আঙ্কেল। আজ যদি দশ লাখ যায়, দু’দিন পর ডাবল ফিরে পাব। খালি প্রতিযোগিতায় মাথাটা আগে ঢুকিয়ে নিই।’
‘তোমার পড়াশোনা কি শেষ?’
‘না, আমি অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ছি।’
‘তাই। কোন ভার্সিটিতে?’
‘ন্যাশনাল ভার্সিটির আন্ডারে একটা কলেজে।’
‘কোন কলেজে?’
মারুফ কলেজের নাম বলল।
‘ঐ কলেজের খুব নাম শুনেছি। কলেজটা খুব ভালো নিশ্চয়ই।’
‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই।’ গদগদ হয়ে বলল মারুফ।
‘তুমি কোন ডিপার্টমেন্টে পড়ো?’
‘ম্যানেজমেন্টে।’
‘ঐ বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের নামটা কী বলতে পারবে? আমার একজন পরিচিত ছিল ঐ বিভাগে।’
‘আঙ্কেল, বলতে পারব না।’
‘অন্য স্যারদের নাম বলতে পারবে? যদি চিনি।’
‘পারব না আঙ্কেল। আসলে অনেকদিন ডিপার্টমেন্টে যাওয়া হয় না তো। স্যারদের নাম ভুলে গেছি।’
‘ক্লাস কি হয় না?’
‘হয় কিন্তু আমরা ছাত্ররাই যাই না।’
‘কেন! সরকারি কলেজের স্যাররা সব বিসিএস ক্যাডার। তারা নিশ্চয়ই ভালো কিছুই পড়াবেন।’
‘সেটা বুঝি কিন্তু আঙ্কেল পাস করার জন্য শর্ট টেকনিক গাইড পড়লেই সব প্রশ্ন কমন পেয়ে যাই।’
‘তবু কলেজে কি একেবারেই যাও না?’
‘সময় কই আঙ্কেল!’ তাচ্ছিল্য ভরে বলল মারুফ।
‘কেন। সময় নেই কেন?’
‘টিউশনি করানো, বিসিএস কোচিং করা আর ফেসবুকিং এইসব মিলিয়ে সময় চলে যায়... কলেজে যাব কখন?’ হাসতে হাসতে বলল মারুফ।
‘আর পরীক্ষার ফরম ফিলাপ? তখনো কি কলেজে যাও না?’
‘না আঙ্কেল। যাই না। কলেজের বিভাগে অফিস সহকারী মামা আছেন। তাকে বিকাশে করে টাকা পাঠিয়ে দিই। তিনি ফরম পূরণ করে দেন?’
‘ইনকোর্স পরীক্ষা দিতেও কি কলেজে যাও না?’ অনার্সপড়ুয়া প্রতিটি ছাত্রছাত্রীকেই নিজ নিজ বিভাগে আলাদা আলাদা বিষয়ে ক্লাস টেস্ট পরীক্ষা দিতে হয়। এর নাম ইনকোর্স পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর মূল মার্কশিটে যোগ হয়।
‘প্রথম প্রথম দিতাম। এখন আর দিই না।’
‘কেন?’
‘বিভাগে অফিস সহকারী মামা আছে না! তাকে টাকা দিলেই মার্কস দিয়ে দেয়। এটা তো এখন অফিস সহকারীদের জমজমাট ব্যবসা।’
‘তাহলে তো বেশ ভালো কলেজেই পড়ছ বলা চলে?’ বৃদ্ধ ব্যঙ্গ করে বললেন।
‘না, আঙ্কেল আসলেই আমাদের কলেজটা ভালো। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম শুনলেই যে কেউ বুঝে আমরা ভালো ছাত্র। সেজন্য অন্য কলেজে সিট পড়লেও আমরা ভালো পরীক্ষা দিতে পারি?’
‘সেটা কীভাবে?’
বৃদ্ধের কৌতূহল যেন বাঁধ মানছে না।
‘অন্য কলেজে যখন পরীক্ষা দিই, তখন পরিদর্শকেরা ভাবেন, এরা তো ভালো ছাত্র, এদের তেমন কড়া গার্ড না দিলেও চলবে। তাই আমরা দেখাদেখি করে বা নকল করে ভালোই পরীক্ষা দিতে পারি।’
‘নকল করে! বল কী! দেশ থেকে নকল উঠে গেছে বলেই তো জানতাম।’
‘আপনি ঠিকই বলেছেন আঙ্কেল। নকল সরকার উঠিয়ে দিয়েছে। আমরা মানে অনার্সের ছাত্ররা এখনো নকল উঠাইনি।’
‘বাহ্! বাহ্! তা তোমাদের এই স্বনামধন্য কলেজের প্রিন্সিপালের নামটা একটু জানতে পারি?’
ট্রেন থামতে শুরু করল।
ইতস্তত করল মারুফ, ‘ইয়ে মানে, প্রিন্সিপাল স্যারের যে কী নাম এই মুহূর্তে ঠিক মনে পড়ছে না।’
‘কেরামত আলী না কি?’ উত্সাহ দিলেন বৃদ্ধ।
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। উনিই আমাদের প্রিন্সিপাল।’
‘ধুর! তুমি দেখি কিছুই জানো না কলেজ সম্পর্কে! এটা তোমার কলেজের ভাইস প্রিন্সিপালের নাম।’
‘অ্যাঁ!’
‘হ্যাঁ। তোমার কলেজের প্রিন্সিপালের নাম প্রফেসর মো. নজিবর রহমান।’ বৃদ্ধ বলল।
‘আপনি দেখি আমাদের কলেজ সম্পর্কে অনেক জানেন। প্রিন্সিপাল স্যার কি আপনার পরিচিত?’
বৃদ্ধ হাসলেন।
ট্রেন থেমেছে।
তিনি আসন থেকে উঠলেন।
যেতে যেতে বললেন, ‘আমিই তো ঐ কলেজের প্রিন্সিপাল।’
