অয়েজুল হক
শরতের সন্ধ্যা। নদীর কূলেই হয়তো শরত্ আসে আজকাল। কিছু কিছু নদীর কূল দিয়ে ঘুরেফিরে শরত্ চলে যায়। শহরে আসে না। ঢাকা শহরে তো নয়ই। মাসুদ ফুটপাত দিয়ে হেটে ফার্মগেট থেকে গুলিস্তান যাবে। ফার্মগেটে কী ফার্ম আছে আর গেটইবা কোথায় কে জানে! হাঁটতে হাঁটতে ভাবে এক কাপ চা খেলে মন্দ হয় না। বিরস শরতের সন্ধ্যার চা। ফুটপাতের বেশির ভাগ অংশ দখল করে আছে নানা দোকান। এসব দোকানে পৃথিবীর যা কিছু গুরুত্বপূর্ণ, প্রায় সবকিছুই পাওয়া যায়। ব্যাপারটা মন্দ না!
মাসুদ চায়ের অর্ডার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পিটুল এসে হাজির, ‘আরে কী করিস?’
পিটুল তার বন্ধু। ভার্সিটিতে একসঙ্গে আছে। পিতার টাকা-পয়সার দাপটে অস্থির। সবাই তাকে সমীহ করে চলে।
‘চা খাব। এক কাপ লাল চা। খাবি?’
পিটুল মুখ সিটকায়। ‘জানিস না, আমি ফুটপাতের কিছু খাই না।’
গল্পের ফাঁকে ফাঁকে চা খাওয়া শেষ করে মাসুদ। অধিকাংশ কথাই হয়, বাবা ওই যে আমেরিকা গিয়েছিল, তা নিয়ে! ‘আমেরিকা থেকে আনা গিফটা কিন্তু অসাধারণ। না দেখলে ঠিক বুঝতে পারবি না।’
মাসুদ হ্যাঁ, হুঁ করে চা শেষ করে। চা খাওয়া শেষ হলেই পিটুল বলে, ‘চল ক্লাবে যাই। ড্যান ওভাল র্স্পোটিং ক্লাব।’
‘এ নামে ক্লাব আছে!’
পিটুল গাল ভরা হাসি দেয়, ‘ক্লাবের কি অভাব?’
প্রথমে আপত্তি জানালেও পিটুলের পীড়াপীড়িতে গাড়িতে চেপে কয়েক মিনিটের ভেতর পৌঁছে যায় এক ক্লাবে। আলিশান ক্লাব। স্পোর্টিং ক্লাবে রাতের খেলা চলছে! এ খেলা সে খেলা নয়। হঠাত্ করে শত শত কালো পোশাকধারী ক্লাবটি ঘিরে ফেলে। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে দৌড়ে দরজা দিয়ে পালাতে যায় মাসুদ। সবার আগে তাকেই ধরা হয়। বাকিরা হতভম্ব অবস্থায়ও মোটামুটি স্বাভাবিক রয়। অপরাধীরা অপরাধ করে বলেই হয়তো এসবের জন্য তাদের মানসিক একটা প্রস্তুতি থাকে। মাসুদকে ভেতর থেকে বাইরে নিয়ে আসা হয়। ভেতরে কী হচ্ছে কে জানে!
‘ক্যাসিনোতে কী?’
‘ক্যাসিনো কী, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আমাকে তো পিটুল বলল ক্লাবে যাওয়ার কথা। জীবনে বড়ো কোনো ক্লাবে ঢুকিনি। ক্লাবকে কি স্যার ক্যাসিনো বলে?’
‘এই চুপ। একদম কথা বলবি না।’
‘ওকে স্যার।’
‘পিটুল কে?’
‘একসঙ্গে পড়ি। ওরা অনেক বড়লোক স্যার।’
অনেক জেরার পর কয়েক থানায় ফোন করে নিশ্চিত হন বড়কর্তা। না কোনো মামলা নেই। রেকর্ড ভালো। আগে কখনো তাকে ক্লাব পাড়ায় দেখা যায়নি...। মাদকসহ অন্যান্য অপরাধ কর্মে লিপ্ত নয়। নিশ্চিত হয়ে বলেন, ‘তোমাকে ছেড়ে দিলাম।’
‘ধন্যবাদ স্যার।’
‘ভেব না একেবারেই ছাড়া। কোনো রকম জড়িত থাকার প্রমাণ পেলেই...’
মাসুদের চোখদুটো ভয়ে শুকিয়ে আসে। ‘জি স্যার।’
স্যার থামেন না, ‘ক্যাসিনো হোক আর ফ্যাসিনো হোক, সব অপরাধীকে ধরা হবে। মাইরের চোটে সব প্যাঁ প্যাঁ করবে। যা ভাগ।’
মাসুদ বাড়ির পথ ধরে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে, ‘ক্যাসিনো-ফ্যাসিনো ধরা। মাইরের চোটে সব প্যাঁ প্যাঁ।’
বাড়ি ফিরে দেখে বাবা জামান সাহেব পায়চারী করছেন। চোখ-মুখ লাল। বাবাকে নিশ্চয়ই ফোন করা হয়েছে। বাবা খুব রেগে আছেন। মাসুদের মাথাটা ঘুরে ওঠে, বিড়বিড় করে বলে, ‘ক্যাসিনো-ফ্যাসিনো রাধ ম্যা ম্যা ম্যা...’
জামান সাহেব কিছুটা অবাক। ক্যাসিনো থেকে ছাড়া পেলেও ক্যাসিনো তাকে ছাড়ছে না। দিনরাত বিড়বিড় করে গাইছে, ‘ক্যাসিনো ফ্যাসিনো রাধ ম্যা ম্যা ম্যা...’
মোবাইল বেজে ওঠে। মাসুদ মোবাইল হাতে নিয়ে রিসিভ করে। ওপ্রান্তে নিশির গলা। ‘কেমন আছ?’
মাসুদের গলায় গান, ‘ক্যাসিনো ফ্যাসিনো রাধ ম্যা ম্যা ম্যা...’ যদিও সুর করে গাওয়ার মতো কিছু না, তারপরও সুর করে গাইছে। জামান সাহেব ক্ষেপে আছেন। ভার্সিটিপড়ুয়া ভদ্র ছেলেটা যখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, তখন কোনো পিতাই স্বাভাবিক থাকতে পারেন না।
ছেলের কাছ থেকে মোবাইল কেড়ে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলেন, ‘হ্যালো কে?’
ভারী গলা শুনে নিশি কেঁপে ওঠে। বুঝতে পারে তার পিতা জামান সাহেবের গলা। বিনয়ী কণ্ঠে বলে, ‘আমি নিশি।’
‘সে তো বুঝতেই পারছি নিশি। এই নিশিতে নিশি ছাড়া আর কে ফোন করবে।’
নিশি ভ্যাবাচেকা খেয়ে বলে, ‘আমি মাসুদের বন্ধু। একসঙ্গে ভার্সিটিতে পড়ি।’
‘হু পড়। আকাশ আছড়ে পড়ার মতো ভার্সিটিতে গিয়ে পড়। তারপর মাজা ভাঙে, হাত ভাঙে, মাথা ভাঙে। তোমাদের লেজ হয়...’
‘আঙ্কেল!’
‘বল।’
‘সবাই কিন্তু এক রকম নয়, এই যেমন আপনার ছেলে, সেও কিন্তু যথেষ্ট ভালো।’
নিশির কথায় জামান সাহেবের রাগ পড়ে। সামান্য শীতল গলার একটা দীর্ঘশ্বাস। বলেন, ‘ওর যে কী হলো?’
নিশি অনুরোধ করে, ‘আমি কী মাসুদের সঙ্গে সামান্য কথা বলতে পারি?’
জামান সাহেব আবার উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। চড়া গলায় বলেন, ‘সে তো কথা বলে না। সারাদিন গান করে। শিল্পী হয়েছে, মহান শিল্পী। তার এই শিল্প গুণ সেটাও সাধারণ মানের নয়।’
‘মানে?’
‘মানে, সে জগত্ পেরিয়ে মহাজাগতিক স্তরের শিল্পী হয়ে গেছে। এলিয়েনদের ভাষায় গান করে। গত দুদিন ধরে এক নাগারে এলিয়েনদের গান শোনাচ্ছে।’
কলিং বেল বেজে ওঠে। জামান সাহেব কথা শেষ করে দরজার দিকে এগিয়ে যান। দরজা খুলে দিতেই দেখা যায় হাসান। ক্যাবলা ক্যাবলা চেহারা। দাঁড়িয়ে আছে।
‘কী চাই?’
‘ভিক্ষা করা তো আমার অভ্যাস না।’
জামান সাহেব রেগে যান। হাসান দূর সম্পর্কের বোনের ছেলে। ঢাকায় মেসে থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিছুটা ভবঘুরে টাইপের।
‘মন মেজাজ ভালো নেই। যা বলার সোজাসাপটা বল।’
‘কথা হলো শব্দ তরঙ্গ। তরঙ্গ হলো ঢেউয়ের মতো। কখনোই সোজাসাপটা যাবে না। এঁকেবেঁকে ঢেউ তুলে যাবে।’
জামান সাহেবের মেজাজ তুঙ্গে। চিত্কার করে বলেন, ‘গেট আউট, স্টুপিড।’
হাসান চলে যেতেই মাসুদের গানের ভলিউম বেড়ে যায়, ‘ক্যাসিনো ফ্যাসিনো রাধ ম্যা ম্যা ম্যা...।’ অর্থটা মাসুদই জানে। আপাতত সে শুধু গান গেয়েই যাবে। ‘ক্যাসিনো ফ্যাসিনো রাধ ম্যা ম্যা ম্যা...।’ অর্থ :ক্যাসিনো ফ্যাসিনো সব ধরা, ম্যা ম্যা করছে।
