মুখে কোনো বিশেষ শব্দ বারবার উচ্চারণ করিয়া বিরক্ত অথবা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করা, শারীরিকভাবে ছোটোখাটো আঘাত করিয়া উত্ত্যক্ত করা, আধুনিক কালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের (যাহার নাম দেওয়া হইয়াছে সাইবার বুলিং) কোনো বিষয় লইয়া কাউকে বারংবার লজ্জা দেওয়া, পরোক্ষভাবে নানা ইশারা-ইঙ্গিত করিয়া কাহাকে হেয় প্রতিপন্ন করা তথা উত্ত্যক্ত করার নামই হইল স্কুল বুলিং। বুলিং হইতে পারে সহপাঠীদের দ্বারা অথবা গমনাগমনের পথে অথবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও। স্পর্শকাতর কিশোর-কিশোরীদের এই বুলিংয়ের ফলে এমন পরিণতি ভোগ করিতে দেখা যায় যে, ইহার শিকার শিক্ষার্থী কেহ কেহ স্কুল ছাড়িয়া দিয়া থাকে, এমনকি মানসিক যন্ত্রণায় আত্মহত্যাও করে কেহ কেহ। এই স্কুল বুলিং দেখিতে পাওয়া যায় ইউরোপ আমেরিকার উন্নত দেশগুলিসহ বিশ্বের সর্বত্র। ইহার প্রকোপ এত বেশি যে, এক জরিপ হইতে দেখা যায় যুক্তরাজ্যে প্রতি ১০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে চার জন বুলিংয়ের শিকার। যুক্তরাষ্ট্রের একটি সমীক্ষা বলিতেছে—প্রতি পাঁচ জন শিক্ষার্থীর এক জন বুলিংয়ের শিকার। ঐ দেশের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল বলিয়াছে, ১৫.৫ শতাংশ উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থী এবং ২৪ শতাংশ মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষার্থীরা বুলিংয়ের শিকার হইয়া থাকে। প্রাইমারি শিক্ষায় ইহার হার আরো বেশি। এই বুলিংয়ের কারণে কেবল লেখাপড়াই বিঘ্নিত হয় না, কেহ কেহ বিদ্যালয় ছাড়িয়া অপরাধ জগতে প্রবেশ করিয়া থাকে। আমাদের দেশও ইহার ব্যতিক্রম নহে। সাইবার যুগে আসিয়া এই সমস্যা আরো তীব্র হইয়া উঠিতেছে। ইত্তেফাকের এক রিপোর্ট হইতে জানা গিয়াছে, রাজধানীসহ সারা দেশে তৈরি হইতেছে বুলিং গ্রুপ। স্কুল, মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেন—সর্বত্রই এই সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করিয়াছে।
বিশ্বব্যাপী এই সমস্যাটির প্রতিকার খুবই কঠিন। কারণ যাহারা ইহা ঘটাইয়া থাকে তাহারাও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কিশোর-কিশোরী। ফলে তাহাদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ আনা মুশকিল হইয়া পড়ে। বিশেষ করিয়া পশ্চিমা দেশগুলিতে সহসা ১৮ বত্সরের নিচে কাহারো অপরাধের বিচার প্রায় অসম্ভব। তবে বাংলাদেশে গত বত্সর অরিত্রী অধিকারী নামে ভিখারুন্নেছা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পর মাননীয় উচ্চ আদালত স্বপ্রণোদিত হইয়া আত্মহত্যা প্রতিরোধের উপায় নির্ণয়ে একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন। সেই অনুযায়ী অতিরিক্ত শিক্ষা সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠিত হয়, যেই কমিটি একটি খসড়া নীতিমালা প্রস্তুত করিয়া আদালতে দাখিল করে। সেই নীতিমালায় শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কিছু শাস্তির কথা বলা হইয়াছে, এমনকি নিয়ম ভঙ্গ করিলে টিসি দেওয়া হইবে—এমন বার্তা সকলের কাছে পৌঁছাইয়া দেওয়ার কথাও বলা হইয়াছে। তবে আমরা মনে করি, শাস্তির পরিবর্তে স্কুলেই শিক্ষাদানের পাশাপাশি গুরুত্বসহকারে শিক্ষার্থীদের সচেতন করাই উত্তম পন্থা। তাহাদিগকে বুঝাইয়া দিতে হইবে, তোমার একটু হাসির খোরাক করা, একটু আনন্দ লাভ করার কারণে তোমারই সহপাঠীর জীবন বিপর্যস্ত হইতে পারে। এই বিষয়ে কেবল শিক্ষক নহে পরিবার হইতেও সচেতন করা শিক্ষাদানের মতোই জরুরি বলিয়া আমরা মনে করি।
