কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ
আমরা সবাই জানি, বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে দ্রুত এগিয়ে চলছে। বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ইতিমধ্যেই ৮ শতাংশের অধিক অর্জিত হচ্ছে এবং জাতীয় আয় মাথাপিছু ১ হাজার ৯০০ ডলারের ওপর। উল্লেখ্য, ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হয়েছে। পাশাপাশি দারিদ্র্য কমে এসেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বর্তমানে জনসংখ্যার ২১-২২ শতাংশ দরিদ্র এবং ১১-১২ শতাংশ অতি দরিদ্র। তবে সংখ্যার ভিত্তিতে দারিদ্র্যসীমার নিচে এখনো প্রায় ৪ কোটি এবং অতি দরিদ্র প্রায় ২ কোটি। তদুপরি অধিকাংশ মানুষের আয় নিম্নপর্যায়ের। তাইতো দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত এবং দারিদ্র্য আরো দ্রুত কমিয়ে আনার লক্ষ্যে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে অতি ছোটো উদ্যোগ বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। সাধারণত এসএমই (ছোটো ও মধ্যম উদ্যোগ)-এর ওপর জোর দেওয়া হয়। কিন্তু ছোটো শিল্পের সংজ্ঞা হচ্ছে ন্যূনতম ৫০ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা বিনিয়োগ আর ২৫ থেকে ৯৯ জন শ্রমিক থাকতে হবে। ছোটো সেবা খাতে অবশ্য ৫ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা বিনিয়োগ এবং ১০ থেকে ২৫ জন শ্রমিক থাকতে হবে। বিনিয়োগ বেশি ও দক্ষতার ঘাটতির কারণে এই আকারের উদ্যোগ গ্রামাঞ্চলে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। অথচ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্যবসায়ভিত্তিক উদ্যোগ টেকসই দারিদ্র্য নিরসন এবং দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের মানুষের টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলার জন্য প্রয়োজনীয়; বিশেষ করে, বিদ্যমান বেকারত্ব এবং প্রতি বছর যে ২০ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে সেই বিবেচনায়।
ছোটো উদ্যোগ হতে পারে নানারকম পণ্য উত্পাদন ও বিপণনে। হতে পারে কৃষিজাত পণ্যের উত্পাদনে যেমন—ফুল, মাছ, হাঁস-মুরগি, গরু ও ছাগল আর কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণে যেমন—ফল, সবজি, দুধ ইত্যাদি প্রক্রিয়াজাতকরণ। এসব কর্মকাণ্ড অতি ছোটো আকারে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থাপন করা সম্ভব। এক্ষেত্রে দেড়-দুই লাখ টাকা থেকে পাঁচ-সাত লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করলেই একটি উদ্যোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। ইতিমধ্যেই এরকম উদ্যোগ গড়ে উঠতে শুরু করেছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। সম্ভাব্য ক্ষেত্রে এগুলো পরবর্তীকালে ছোটো বা তার চেয়ে বড়ো পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে।
ছোটো ও মাঝারি উদ্যোগ সম্প্রসারণে সরকারের নীতি আছে তবে অতি ছোটো উদ্যোগ স্থাপনে সহযোগিতা সম্প্রসারণে কর্মসূচি এখনো খুবই সীমিত। অবশ্য সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কিছু কিছু ব্যবস্থা নিচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সরকারি খাতে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ), জয়িতা ফাউন্ডেশন, এসএমই ফাউন্ডেশন ও এনজিও ফাউন্ডেশন উল্লেখযোগ্য। বেসরকারি খাতে অনেক এনজিও এই ক্ষেত্রে কাজ করছে। তবে সম্ভাবনা অনেক থাকলেও অর্জন এখনো সীমিত রয়েছে।
পিকেএসএফের চেয়ারম্যান হিসেবে বক্ষমান বিষয়ে এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড সম্বন্ধে আমি সম্যক অবহিত। তাই অতি ছোটো উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে পিকেএসএফের প্রচেষ্টা সম্বন্ধে কিছু কথা বলতে চাই। পিকেএসএফ বিগত ছয়-সাত বছর ধরে অতি ছোটো উদ্যোগ সৃষ্টিতে বিশেষ জোর দিচ্ছে। ইতিমধ্যেই গবেষণার মাধ্যমে প্রায় আড়াইশ পণ্যের ১ হাজারের অধিক গুচ্ছ উত্পাদন অঞ্চল চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের নিজ চেষ্টা এবং প্রায়শ নিজ অর্থায়নে শুরু করা হয়েছে। কাজেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পণ্যের মানের দিকে তেমন নজর দেওয়া হয়নি। আবার ভালো মানের কিছু পণ্য (যেমন জুতার ক্ষেত্রে) নিজের ব্র্যান্ডিংয়ে বিক্রি করতে সমস্যা হয়। কাজেই প্রতিষ্ঠিত কোনো কোম্পানির মাধ্যমে সেই কোম্পানির ব্র্যান্ডিংয়ে বিক্রি করতে হয়। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য পণ্যের মান উন্নয়ন করা এবং উত্পাদকদের সংগঠিত হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
পিকেএসএফের কর্মপরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সম্ভাব্য উদ্যোক্তা চিহ্নিত করা এবং তাদের উদ্বুদ্ধ করে তাদের পছন্দমতো পণ্য বা একাধিক পণ্য তৈরি বা বিপণনে উদ্যোগ স্থাপনে সহায়তা করা। এক্ষেত্রে তরুণদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। আর বিভিন্ন গুচ্ছ উত্পাদন-অঞ্চলের মধ্যে সম্ভাব্য ক্ষেত্রে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর যথাযথ উন্নয়নের জন্য। উদাহরণ স্বরূপ, সিরাজগঞ্জে জুতা তৈরি ও যশোরে গাড়ির বডি তৈরির গুচ্ছ উদ্যোগকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। উভয় ক্ষেত্রে ব্যবসা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ ও পণ্যের মান উন্নয়নে সহায়তা দেওয়া হয় এবং কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ইতিমধ্যে এই গুচ্ছ উত্পাদন অঞ্চলগুলো যথেষ্ট সুসংগঠিত হয়েছে এবং উত্পাদকদের ব্যবসায় উন্নতি হচ্ছে। উত্পাদকরা ইতিমধ্যে নিজের ব্র্যান্ডিংয়ে জুতা বিক্রি করতে পারছেন।
গুচ্ছ উত্পাদন অঞ্চল ছাড়া, মূলত যে পদ্ধতিতে পিকেএসএফ কাজ করে তা হচ্ছে নির্দিষ্ট এলাকাসমূহে সম্ভাবনাময় উদ্যোগ ও উদ্যোক্তা চিহ্নিত করা, এই আগ্রহীদের স্ব-স্ব বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া, বাজার তথ্য দেওয়া, উপযুক্ত প্রযুক্তি সংগ্রহে সহায়তা করা, প্রয়োজনে বাজারজাতকরণে সহায়তা দেওয়া এবং উপযুক্ত পরিমাণ অর্থায়ন করা। অর্থায়ন প্রয়োজনানুসারে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এই নতুন উদ্যোক্তাদের কাজ নিবিড়ভাবে তদারক করা হয় এবং কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা সমাধানে সহায়তা দেওয়া হয়। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা করার জন্য তাদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেওয়া হয়, কেননা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত দিন দিন বাড়ছে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে যেন ক্ষয়ক্ষতি না হয় বা কম হয়, সেদিকে নজর রাখা এবং সম্ভাব্য বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এসব উদ্যোগ কৃষিখাত এবং বিভিন্ন অকৃষি খাতে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। চরাঞ্চল, উপকূল, হাওর, পাহাড় ও দ্বীপাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
আগেই বলা হয়েছে, দেশের যে এলাকায় যেসব দ্রব্যের সম্ভাবনা বেশি, সেই এলাকায় সেসব দ্রব্য উত্পাদনে জোর দেওয়া হয়। এই প্রসঙ্গে পিকেএসএফের একটি বাস্তবায়িত ও একটি অদূর ভবিষ্যতে বাস্তবায়ন করা হবে—তা উল্লেখ করতে চাই। বাস্তবায়িত উদ্যোগটি হচ্ছে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে ভিয়েতনাম থেকে প্রযুক্তি এনে একটি কাঁকড়ার হ্যাচারি স্থাপন। এটি দেশে প্রথম সফল কাঁকড়ার হ্যাচারি। কয়েক বছর আগে স্থাপিত এই হ্যাচারি থেকে খামারি পর্যায়ে পোনা কাঁকড়া বিতরণ করা হচ্ছে। ফলে ইতিমধ্যেই অনেক দরিদ্র পরিবার দারিদ্র্যের কবল থেকে মুক্ত হয়ে এগিয়ে চলেছে।
এখানে আর যে উদ্যোগটি শিগগির বাস্তবায়িত করা হবে সেটি হচ্ছে ফল—আম, আনারস, কাঁঠাল ইত্যাদি প্রক্রিয়াজাতকরণ। ইতিমধ্যেই উপযুক্ত প্রযুক্তি ভিয়েতনাম থেকে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথমে দেশের তিনটি এলাকায় এই উদ্যোগ স্থাপন করা হবে। একই মেশিনে আম, কাঁঠাল, আনারস ও অন্যান্য ফল প্রক্রিয়াজাত করা যায়। সুতরাং সারা বছরই একটি মেশিন চালু রাখা যাবে, যেহেতু বিভিন্ন ফল স্বল্প মেয়াদে বছরের বিভিন্ন সময়ে উত্পাদিত হয়ে থাকে।
অবশ্যই পিকেএসএফ অতি দারিদ্র্য নিরসনে কাজ করছে এবং তারা যখন এগিয়ে চলে তখন সেই যাত্রায় তাদের পাশে থেকে যেন তারা দ্রুত সময়ে স্বাবলম্বী হয় এবং টেকসই উন্নয়নের দিকে যেতে পারে, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে। পিকেএসএফ বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১ কোটি ৪০ লাখ পরিবারের সঙ্গে কাজ করছে। এদের মধ্যে অতি দরিদ্র, দরিদ্র এবং স্বল্প আয়ের অদরিদ্র পরিবার রয়েছে; পিকেএসএফ অব্যাহত সহায়তা দিয়ে নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে, যেন যার যার অবস্থান থেকে আর্থসামাজিকভাবে পরিবারগুলো এগিয়ে যেতে পারে এবং টেকসই উন্নয়নের কাফেলায় শামিল হতে পারে। উল্লেখ্য, টেকসই উন্নয়নের ধারণা ও কর্মসূচি জাতিসংঘ কর্তৃক এমনভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে যে, এ যাত্রায় সবাইকে অংশ নিতে হবে, কাউকে বাদ দেওয়া যাবে না। পিকেএসএফ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে ১৭টির মধ্যে ১৩ থেকে ১৪টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের অনেকগুলো লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে।
n লেখক :অর্থনীতিবিদ
