হূদেরাগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:১৩

অধ্যাপক ডা. গোবিন্দ চন্দ্র দাস

মানসিক উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা, আবেগের আগ্রাসন, কাজের বাড়তি চাপ, জীবনযাপনের চাপ প্রভৃতি হূদেরাগের ঝুঁকি বাড়ায়। ক্রমাগত মানবজীবনে আকাঙ্ক্ষা বেড়ে যাওয়া, কাজকর্মে তাড়াহুড়ো, আধুনিক জীবনযাত্রায় নিত্যদিনের দুর্ভাবনা সরাসরি মানবদেহের রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়ায় (কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেম) প্রতিক্রিয়া ঘটায় বা প্রভাব ফেলে। হূদযন্ত্রকে যদি অশ্বের সঙ্গে তুলনা করা হয় তবে মনকে বলতে হবে এর চালক বা অশ্বারোহী। জীবনের দৌড়ে যদি গতি বাড়ানোর কাজ করে মন, তবে স্বাভাবিকভাবেই চাপ বাড়ে মনে এবং তার প্রভাবও পড়ে হূদযন্ত্রে। আজকের মানুষ সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে। স্বাভাবিকভাবেই এর জন্যে তাকে চড়া দামও গুনতে হচ্ছে। ফলস্বরূপ অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন হূদেরাগে। আর কোনোরকম পূর্বাভাস ছাড়াই যে-কোনো সময় এটি কেড়ে নিতে পারে মানুষের জীবন। বেঁচে থাকার জন্য যেমন খাদ্যের প্রয়োজন পড়ে তেমনি রোগাক্রান্ত হলে প্রয়োজন চিকিত্সার। তাই হূদেরাগের চিকিত্সা হিসেবে প্রচলিত বহুল আলোচিত দুটি পদ্ধতি বাইপাস ও স্ট্যান্টিং। এ দুটিই অপারেশন। আর এই দুই পদ্ধতির চিকিত্সা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। রোগী সুস্থও হচ্ছেন কিন্তু বেঁচে থাকতে হয় মুঠো মুঠো ওষুধ সেবন ও বিভিন্ন শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে। তার পরেও ভয় থাকে পুনরায় রোগে আক্রান্ত হওয়ার। বিশ্বের এক নম্বর হন্তারক রোগ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে হূদেরাগকে। প্রতি বছর ১৭ দশমিক ৩ মিলিয়ন বা প্রায় পৌনে ২ কোটি মানুষ মারা যাচ্ছেন এই রোগে। অন্যদিকে ম্যালেরিয়া, এইচআইভি এইডস এবং যক্ষা—এই তিনটি রোগ মিলে প্রতিবছর গোটা বিশ্বে মারা যাচ্ছেন ৩৮ লাখ মানুষ। অথচ এ তিনটি রোগকেই ভয়ংকরভাবে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে হূদেরাগের ভয়াবহতার ব্যাপারে ব্যাপক প্রচারণা অনুপস্থিত। তাই বিশ্ব হার্ট দিবসে গোটা বিশ্বেই এ বিষয়টির প্রচারণার সুযোগ গ্রহণ করে থাকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

হূদেরাগ প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণের ওপরেই জোর দেন অভিজ্ঞ চিকিত্সকরা। এজন্যে পরিবারকে গুরুত্বপূর্ণ ধরা হয়। পরিবারের অভিভাবকবৃন্দ, বিশেষ করে নারীদের ভূমিকা এক্ষেত্রে বেশি। নিয়মিত ব্যায়ামও হূদেরাগের ঝুঁকি কমিয়ে আনে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে দৈহিক ওজন ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হলে হূদেরাগের ঝুঁকি অনেকখানি কমে আসে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী, তাই হার্ট সুরক্ষার আন্দোলন ও তত্পরতার বাইরে নারীকে রাখা হলে সেটা হবে আত্মঘাতী। নীরব ঘাতক হূদেরাগ থেকে বাঁচতে হলে গোটা জীবনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। বলা যায় সুস্থ হার্ট অর্জন করার জন্যে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

বিশ্বের ১৯৪টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশেও পালিত হতে চলেছে বিশ্ব হার্ট দিবস। আমরা মনে করি, হার্ট দিবস পালন তখনই সার্থক হবে যখন দেশের অপেক্ষাকৃত কম বিত্তবান মানুষ হূদেরাগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারের আওতায় আসতে পারবে। এ জন্য জাতিসংঘ সুস্থ জীবন-যাপনের জন্য বিশেষত হার্ট সুস্থ থাকার জন্য বিকল্প চিকিত্সা হিসেবে যোগব্যায়ামকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়ে ২১ জুন দিনটিকে বিশ্ব যোগদিবস হিসেবে পালন করছে। তাই হূদেরাগের বিকল্প চিকিত্সার কথাটিও আমাদের স্মরণে রাখতে হবে। এই বিকল্প চিকিত্সাকে হলিস্টিক চিকিত্সা বলা হয়। হলিস্টিক চিকিত্সা হলো আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রাচীনতম প্রাকৃতিক পদ্ধতির আশ্চর্য সমন্বয়। এই চিকিত্সার মূল চাবিকাঠি দুটি। স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যায়াম। রোগীর বয়স, রোগের ধরন এবং তার বর্তমান অবস্থার ওপরই নির্ভর করে তার প্রতিদিনের খাদ্যগ্রহণ। আর ব্যায়ামের ব্যাপারটি বিবিধ। তার আগে মন নিয়ন্ত্রণের জন্যে চাই সঠিক উপায়ে মেডিটেশন। মানসিক চাপই মানুষের অসুখ ও অশান্তির মূল কারণ। মানসিক চাপ কমানোর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহাজাগতিক শক্তি থেকে জ্যোতি বা প্রাণরস আহরণের কথাও বলা হয়ে থাকে। এসব অর্জনের কাজটি কিন্তু অত সহজ নয়। তার জন্যে নিয়মিত সময় দিতে হয়, চর্চা করতে হয় সঠিক নিয়ম মেনে। যোগব্যায়াম, প্রাণায়াম, মেডিটেশন ও নিউরোবিক জিম— প্রত্যেকটিরই নিজস্ব রীতিনীতি আছে। হলিস্টিক চিকিত্সায় সোল-মাইন্ড-বডি বা আত্মা-মন-দেহ সবকিছুর ওপরেই লক্ষ্য রেখে প্রোগ্রাম দেওয়া হয়। সংক্ষেপে বলতে পারি হলিস্টিক চিকিত্সা এরই মধ্যে দেশে আস্থা অর্জন করেছে। বিগত দশ বছর যাবত্ দেশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে হাজার হাজার হূদেরাগীর জীবনে বাইপাস অপারেশন বা স্টেন্টিং বা রিং ছাড়াই সুবাতাস বয়ে এনেছে। আজকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হূদেরাগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে।

n লেখক :চিকিত্সক

e-mail :[email protected]