৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ দৈনিক ইত্তেফাকের অডিটরিয়ামে অ্যাকশন ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট-এএসডি ও দৈনিক ইত্তেফাক-এর যৌথ আয়োজনে ‘শিশু নির্যাতন ও আমাদের করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বৈঠকে অনেকের বক্তব্যে উঠে এসেছে শিশুদের জন্য একটি স্বতন্ত্র অধিদপ্তরের প্রস্তাব। কেউ কেউ বলেছেন
আইনের সঠিক বাস্তবায়নের কথা, স্কুল-কলেজে যৌন শিক্ষা যথাযথভাবে দেওয়ার কথা। এই আলোচনার সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো।
শিশু অধিকার সপ্তাহ ২৯ সেপ্টেম্বর-৫ অক্টোবর
আসাদুজ্জামান খান কামাল
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
শিশুদের রক্ষা করা আমাদের নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সরকার কাজ করছে। তবে এসব কাজ সব সময় দৃশ্যমান হয় না। সরকারের নানা পদক্ষেপে শিশু নির্যাতন কমে এলেও এখনো তা আশানুরূপ নয়। ২০৪০ সালে যারা বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে তাদের, অর্থাত্ সেই শিশু-কিশোরদের রক্ষা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিশুদের শিক্ষার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু সারাদেশের প্রাইমারি স্কুলগুলোকে জাতীয়করণ করেছিলেন। জাতির পিতা চেয়েছিলেন দেশের সব শিশুকে বাধ্যতামূলক লেখাপড়ার আওতায় নিয়ে আসতে। আমরা মাঝে পথ হারিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুর কন্যা ক্ষমতায় আসার পর আবার সেই প্রাইমারি স্কুলগুলোকে জাতীয়করণ করেছেন। আজকে যারা শিশু, তাদের ভবিষতের জন্য আমরা একটা সুন্দর বাংলাদেশ উপহার দিয়ে যেতে চাই। যে দেশ আমরা হূদয় দিয়ে বিনির্মাণ করতে চেয়েছিলাম, সেটা আজকের শিশুরা তৈরি করবে। সে জন্য শিশুদের রক্ষা করা আমাদের নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। এই জায়গাটাতে সমাজের সবাইকে কাজ করতে হবে।
তাসমিমা হোসেন
সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক
বাংলাদেশ জনবহুল দেশ। তার পরও উন্নয়নে যথেষ্ট এগিয়ে আছি আমরা। সরকার অনেক কাজ করছে, বিশ্বে আমাদের যথেষ্ট সুনামও রয়েছে। তার পরও কিছু সমস্যা আছে, যা থেকে আমরা বেরোতে পারছি না। এর একটা হচ্ছে শিশু নির্যাতন। আমরা সবাই ছোটোবেলায় কোনো না কোনোভাবে সহিংসতার শিকার হয়েছি। আমাদের সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতা হচ্ছে ‘দারিদ্র্য’। আর এই দারিদ্র্যের জন্যই সমাজে শিশু শ্রমিক হ্রাস পাচ্ছে না। কাজেই এখানে প্রচুর পরিমাণে প্রণোদনা দিতে হবে। আমাদের অনেক ভালো কাজ হচ্ছে, তবে কিছু দুষ্ট লোকের জন্য তা ম্লান হয়ে যাচ্ছে। অনেক আইন আছে, সেই আইনগুলোকে সময়োপযোগী করতে হবে।
মো. ইকবাল হোসেন
যুগ্মসচিব, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়
যদি বলি, বাংলাদেশের শিশুদের দেখভালের দায়িত্ব কার? এক কথায় এর উত্তর আমরা কেউ দিতে পারব না। কারণ বঙ্গবন্ধু শিশু আইন করেছিলেন ১৯৭৩ সালে। ২০১৩ সালে আমরা সেটা আপডেট করেছি। শিশুদের দেখভালের দায়িত্বে আছে সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর। আবার শিশুনীতি যেটা করা হয়েছে, সেটা করছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। শিশু শ্রম দেখে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। শিশুর কল্যাণ দেখার জন্য সেইভাবে কেউ নেই বাংলাদেশে। শিশু অধিদপ্তর করতে ২০১৩ সাল থেকে আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি। শিশুদের দেখার জন্য আর একটি প্রতিষ্ঠান আছে— ‘শিশু একাডেমি’। এর ভূমিকা কী সেটা জানা দরকার। গণমাধ্যম এখন অনেক সোচ্চার। আগে নির্যাতনের প্রতিবাদ হতো না, এখন প্রতিবাদ হচ্ছে। প্রতিবাদ করতে গিয়ে অনেকে জীবন দিচ্ছে, তবু প্রতিবাদ হচ্ছে। নারী-শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আমাদের হেলপলাইন আছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হেলপলাইন ৯৯৯, ৩৩৩ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আবার সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হেলপলাইন আছে ১০৯৮। আমরা স্মার্ট ফোন ঠেকাতে পারছি না। আমরা শিশুর অধিকার আদায়ে একটি শিশু কমিশন গঠন করতে যাচ্ছি। শিশুদের দেখভালের জন্য আমরা ডে-কেয়ার সেন্টার করতে যাচ্ছি। সরকার ৯৪টি ডে-কেয়ার সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছে। এটা বেসরকারিভাবে যাতে করতে পারে, সেই সুযোগ করে দিচ্ছি।
অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল
পরিচালক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট
আমরা মনস্তাত্ত্বিকরা শিশু নির্যাতনকে সেক্সচুয়াল অ্যাবিউজ ও ফিজিক্যাল অ্যাবিউজ হিসেবে দেখি। প্রতিটি অ্যাবিউজ শিশুর জন্য ক্ষতিকর। যখন এ ধরনের ঘটনা নিয়ে আমাদের কাছে কেউ আসে, তখন আমরা দেখি ঘটনার ব্যাপকতা। একটি বাচ্চা শিশু যখন এ ধরনের ঘটনার ভেতর দিয়ে যায়, তখন তার পাশে কেউ থাকে না। সে ভাবে, নিজে সে অপরাধ করেছে। আর সেই অপরাধের বোঝা পুরো জীবন সে বহন করে বেড়ায়। কেউ ৪০-৫০ বছর পার করেছে, কিন্তু শিশু বয়সের সেই অ্যাবিউজের কারণে সে নানা ধরনের মানসিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তার পুরো জীবনের পারিবারিক শান্তি বিনষ্ট হয়ে যায়। দোষ করেছে অপরাধী। আর সেই অপরাধের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে শিশু বয়স থেকে অন্যজন। সুতরাং, শিশুকাল থেকে সন্তানদের আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তুলতে হবে। শিশুকে বোঝাতে গেলে তার সমপর্যায়ে নেমে বিচার করতে হবে।
আফসান চৌধুরী
অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
১৯৯৮ সালে আমরা প্রথম ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের মাধ্যমে প্রকাশ করি শিশু নির্যাতনের কথা। আমাদের বেইজলাইন সার্ভে না থাকার কারণে আমরা আসলে বলতে পারি না যে শিশু নির্যাতন কমেছে বা বেড়েছে। এটা একটা বড়ো সমস্যা। তাছাড়া শিশু নির্যাতন আসলে এক ধরনেরও হয় না। আমরা ১৯৯৭ সালে যখন মাঠপর্যায়ে কাজ করি, তখন দেখলাম সবাই ছেলেশিশুর যৌন নির্যাতনের কথাটা বাদ দিয়ে যাচ্ছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, দেশের অধের্ক শিশু নির্যাতনের কথা লুকিয়ে রাখছে। ছেলেশিশু যখন যৌন নির্যাতন নিয়ে বড়ো হয়, তখন সে-ও নিজে নির্যাতনকারী হতে পারে। যৌন নির্যাতনকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে এটাকে বোঝা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে গবেষণা প্রয়োজন।
তৌহিদুল হক
সহযোগী অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশে আমাদের শিশু নির্যাতনের যে ক্যানভাস, তা অনেক বড়ো। ঘরের দরজা বন্ধ করে আমাদের সন্তানেরা কী করছে, আমরা তা জানছি না। আমাদের অভিভাবকদের সময় নেই বা সময় থাকলেও ভিন্ন কাজে ব্যস্ত। এই সময়ে একটি বড়ো প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা শিশু প্রতিপালন করতে প্রস্তুত কি না। শিশুদের প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। শিশু নির্যাতনের কারণ যদি আমরা বের করি, তাহলে ১০১টা কারণ বের হবে। আমাদের সেই সব কারণের পেছনের কারণগুলো খুঁজে বের করতে হবে। প্রত্যেকে নিজ অবস্থান থেকে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে কাজ করতে হবে। আমাদের শিশুরা আসলে কার কাছে নিরাপদ? আমি মনে করি, সে কারো কাছেই নিরাপদ নয়। মা তার নিজের শিশুসন্তানকে বিক্রি করে দিচ্ছে, ডাস্টবিনে ফেলে দিচ্ছে কিংবা শিশুকে হত্যা করছে। শিশু প্রতিপালনে আমাদের সমাজকে প্রস্তুত করা দরকার। আমাদের দেশে সোশ্যাল ইনভেস্টমেন্টের জায়গা খুব কম, এটা বাড়াতে হবে।
জামিল হোসেন চৌধুরী
নির্বাহী পরিচালক, এএসডি
প্রতিদিন সংবাদপত্র খুললেই আমরা দেখতে পাই শিশুর ওপর নির্যাতন; এটা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। ঘরে-বাইরে, স্কুল-মাদ্রাসায়— কোথাও শিশুর নিরাপত্তা নেই। শিশু নির্যাতনের যে আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি, এই বৃদ্ধি যদি আমরা থামাতে না পারি, তাহলে আরো ভয়ংকর রূপ ধারণ করবে। এই ব্যাপক নির্যাতন কেন হচ্ছে? আকাশ সংস্কৃতির কারণে? নাকি শিক্ষা বাণিজ্যিকীকরণের জন্য? নাকি সার্বিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে এমনটা হচ্ছে? আমরা প্রতিদিন দেখতে পাচ্ছি, শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এটা কঠোরভাবে দমন করা দরকার। তা শুধু আইনের শাসন দিয়ে হবে না। আমাদের মনে হচ্ছে, অন্য ব্যবস্থা করতে হবে। সেটা সামাজিক আন্দোলন হোক বা নৈতিক শিক্ষার পরিসর বৃদ্ধি করেই হোক।
ব্যারিস্টার মো. হুমায়ন কবির পল্লব
আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট
দেশের প্রায় ৮০ ভাগ স্কুলগামী শিশু পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত। তারা ক্লাসে মোবাইল ফোনে পর্নোগ্রাফি দেখছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে মোবাইল ফোনে পর্নোগ্রাফি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের সরকারও পদক্ষেপ নিয়েছে এবং পর্নোগ্রাফি অনেকাংশে বন্ধ হয়েছে। শিশুদের মামলাগুলো দ্রুত পরিচালনা করার জন্য ‘শিশু বিচার ট্রাইব্যুনাল’ নামে একটি আলাদা ট্রাইব্যুনাল হওয়া উচিত। নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল একসঙ্গে এখন কাজ করছে এবং এখানে বলে দেওয়া আছে, কত দিনের মধ্যে একটি মামলা শেষ করবে। কিন্তু তা করা হচ্ছে না। কারণ এখানে সরকারি প্রসিকিউটর যাদের নিয়োগ করা হয়, যারা ট্রায়ালটা পরিচালনা করেন, তাদের শিশুবান্ধব ট্রেনিং নেই। সেটা সরকারিভাবে করার উদ্যোগ আমাদের এখানে দেখা যায় না। তাই মামলার বিচারে দীর্ঘসূত্রতা হচ্ছে। আমাদের যে পুলিশ অফিসার আছেন, তাদের কি শিশুবান্ধব ট্রেনিং আছে? আমরা আলোচনা করছি, আমাদের যে অঙ্গগুলো শিশুদের নিয়ে কাজ করছে, সেগুলো শিশুদের কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে?
ডা. ইসরাত জাহান শর্মী
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, কোওর্ডিনেশন সেল, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
শিশুরা যখন নির্যাতিত হচ্ছে, তখন সেটা বন্ধের উপায় কী? ফ্ল্যাটে যখন কোনো শিশু নির্যাতনের শিকার হয়, তখন কি আমরা গিয়ে তাদের কাউনসেলিং করছি? আমরা হেলপলাইন পর্যন্ত চিন্তা করছি। কিন্তু তার আগে যে সহজভাবে নির্যাতন বন্ধ করা যায়, তা দেখছি না। আমি আমার কাজের সূত্রে গ্রামে দেখেছি, আউটডোরে প্রতিদিন দুই-তিন জন মাদ্রাসার ছেলেশিশু আসত ইউরিন ইনফেকশন নিয়ে। আমরা ইনফেকশনের চিকিত্সা দিই। কিন্তু আমরা একবারও চিন্তা করছি না, এই ইনফেকশনটা কেন হলো। নির্যাতনের কারণে হচ্ছে। এটা কারা করছে? অথচ এই ডাটাগুলো কোথাও নেই। হেলথ কমপ্লেক্স থেকে অনেক ডাটা সংগ্রহ করা যায়। এই ছেলেশিশু নির্যাতনের বিষয়টি কোথাও সেভাবে আসছে না। এটাও উঠে আসা দরকার।
আনোয়ারুল ইসলাম সিকদার
সাবেক সচিব
আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইন মনে হয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০১৩ এবং ১৯৭৪ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, যেটা বঙ্গবন্ধুর সময় হয়েছিল। এই আইনে ১৮০ দিনে মামলা সমাপ্ত হওয়ার কথা। অথচ এসব আইনে মামলা পাঁচ বছর পর্যন্ত চলছে। এসব মামলার ৯৭ ভাগ আসামির সাজা হয় না। সরকারের আইনের কোনো ঘাটতি নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা বাস্তবায়ন করতে পারছি কি না। আমরা ১৩টা মন্ত্রণালয়কে শিশু বাজেটের আওতায় আনতে পেরেছি মাত্র। ৪৫টি মন্ত্রণালয়কে জেন্ডার বাজেটের আওতায় আনা হয়েছে। শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে গ্রাম আদালতের কোনো ভূমিকা নেই। সারাদেশেই শিশু শ্রম আছে। এটা বন্ধ করতে হবে। আমিও মনে-প্রাণে চাই, ১৮ বছরের আগে কোনো শিশু কর্মে যোগ না দিক।
রোকসানা সুলতানা
নির্বাহী পরিচালক, ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স
ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স ১৯৯৪ সাল থেকে যে কাজটি করছে, তা হচ্ছে কীভাবে যৌন শিক্ষাটাকে কারিকুলামে আনা যায়। ২০১৩ সালে গিয়ে সেটা বাস্তবায়িত হয়েছে। আমরা কারিকুলামে তা ঢোকাতে পেরেছি। সপ্তম শ্রেণির শারীরিক শিক্ষা বইয়ে পুরোপুরি যৌন শিক্ষার বিষয়টি আছে। যৌন নির্যাতন কী? এটা কারা করে? কেন করে? শিশুর করণীয় কী? কীভাবে ‘না’ কথাটা বলবে। এখন সমস্যা হচ্ছে, পাঠ্যবইয়ে এসব আছে, কিন্তু শিক্ষকেরা তা ক্লাসে পড়ান না। আমরা ন্যাশনাল কারিকুলাম বোর্ডের সঙ্গে কথা বলেছি— শিক্ষকদের ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে বিষয়টি কীভাবে পড়ানো যায়, তা শেখানো হবে। আমরা এ বিষয়ে এখন কাজ করছি।
আবদুছ সহিদ মাহমুদ
পরিচালক, বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম
আমাদের দেশে আইনে ভিক্টিমের কোনো সুরক্ষা নেই। পিছিয়ে পড়া মানুষ এবং তাদের সন্তানেরা বেশি নির্যাতনের শিকার হয়। তারা আইনের আশ্রয় নিলেও মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আর যারা নির্যাতনকারী, তারা রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে যথেষ্ট প্রভাবশালী হয়ে থাকে। ফলে তারা এই সুযোগগুলো নেয়। আইনে ভিক্টিম ও সাক্ষীর সুরক্ষা থাকা দরকার। ২০১৫ সালে রাজন-রাকিব হত্যার রায় দ্রুত সময়ের মধ্যে হয়েছে। সর্বোচ্চ শাস্তির রায়ও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই রায় চার বছরেও কার্যকর হয়নি। যে আইন মানুষের কল্যাণ করে না, সে আইন অবশ্যই সংশোধনের দাবি রাখে। ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রম প্রতিরোধে কোনো অগ্রগতি নেই। কিন্তু আমার কাছে এখন মনে হচ্ছে, ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রম বন্ধ করা অসম্ভব।
অ্যাডভোকেট মাকছুদা আখতার
পরিচালক, লিগ্যাল অ্যাডভোকেসি ও লবি
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ
আসলে শিশু ও মা একসঙ্গে জড়িত। একটি ধর্ষণ মামলা যখন ৯-১০ বছর ধরে চলে, সেই সময়ে ধর্ষণে শিকার শিশু দ্বিতীয়বার ধর্ষণের শিকার হয়। তখন ভিক্টিম শিশুকে যেভাবে প্রশ্ন করা হয়, সেটাও মোটেই নারীবান্ধব বা শিশুবান্ধব নয়। শুধু লেগে থাকার কারণে মাত্র ৩ ভাগ মামলার বিচার হয়। কিন্তু সেটার জন্য দীর্ঘ সময় লেগে থাকতে হয়। যৌন নির্যাতন আইন করা এখন সময়ের দাবি। গৃহকর্মী শিশুদের জন্য আইন করা দরকার। ডে-কেয়ার সেন্টার না থাকলে আমাদের মেয়েরা বাইরে কাজ করতে পারবে না। সেক্স এডুকেশন থাকতে হবে। শাস্তি না হলে শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে।
সৈয়দা মুনিরা সুলতানা
প্রোগ্রাম অফিসার, আইএলও
শিশু শ্রম ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রম উভয় অপরাধের জন্য শাস্তি ৫ হাজার টাকা জরিমানা। এটা যুক্তিসম্মত নয়। এটা আমাদের সুপারিশ থাকল। গৃহকর্মী নির্যাতন হলে আমরা তার পাশে দাঁড়াতে পারি না। কারণ কোনো আইন নেই। গৃহকর্মী শিশুরা প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। আইন না থাকায় আমরা তা প্রচার করতে পারছি না। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা ১৪ বছর পর্যন্ত, কিন্তু সেটা এখনো আইনে রূপান্তর হয়নি। এসব হলে শিশু শ্রম এমনিতেই বন্ধ হবে। এছাড়া গুড প্যারেন্টিং বড়ো ভূমিকা রাখতে পারে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে। এছাড়া সরকারের সোশ্যাল সেফটি নেট প্রোগ্রামগুলো যদি শর্তসাপেক্ষে করা হয়, তাহলে ভালো ফল পাওয়া যাবে।
আবদুল্লা আল মামুন
পরিচালক, শিশু সুরক্ষা কার্যক্রম, সেভ দ্য চিলড্রেন
আমাদের সমাজে একটা বদ্ধমূল ধারণা আছে যে শিশুদের নির্যাতন করাই যায়। কারণ তারা সাইজে ছোটো, ওজনে কম এবং অধিকারেও হয়তো কম হবে। এমন একটি ধারণা আছে বড়োদের। শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে অনেক আইন আছে। আবার এমন কিছু আছে, যা আইনে নেই। আমাদের সংস্কৃতি এমন যে শিশুকে একটু মারধর করাই যায়! সরকারের পরিপত্র আছে স্কুলে নির্যাতন বন্ধের। কিন্তু এটা কোনো আইনে নেই। আমাদের দেখতে হবে, শিশু নির্যাতন যেন না হয় এবং হলেও যেন সুবিচার পায়। শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে অনেকগুলো পথ রয়েছে, কিন্তু পথগুলো একসঙ্গে মেলেনি। দেশের মোট জনসংখ্যার ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ শিশু, যাদের জন্য একটি আলাদা মন্ত্রণালয় দরকার। আমাদের গৃহকর্মীকল্যাণ সুরক্ষা নীতি হয়েছে, কিন্তু আইন হয়নি। আমাদের জনসংখ্যার বেশিসংখ্যক শিশু-কিশোর, যাদের যথার্থভাবে গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াবে বা বাংলাদেশের চেহারা পালটে যাবে।
চায়না রানী সাহা
ন্যাশনাল ফোকাল পারসন (শিশু সুরক্ষা),
এসওএস শিশুপল্লী বাংলাদেশ
আমাদের শিশুদের বলার জায়গা নেই। তাদের বলার জায়গা থাকলে তারা নিজেদের এমপাওয়ারড মনে করত। সে জন্য পাড়া-মহল্লায় দরকার শিশু সুরক্ষা কমিটি। নামেমাত্র নয়, অবশ্যই তাদের কাজ করতে হবে। আমাদের এসওএস শিশু পল্লীতে একটি শিশু নির্যাতনের ঘটনা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শনাক্ত করতে হয়। সে কারণে আমাদের পল্লীতে শিশু নির্যাতন নেই।
ফারুখ আহমেদ
কান্ট্রি চাইল্ড প্রটেকশন ফোকাল, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ
শিশুরা থাকে পরিবারে, স্কুলে, খেলার মাঠে। স্থান-কালভেদে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগগুলো আমরা নিতে পারি। টেলিভিশনের একটি বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, বাবা মেয়েকে নিয়ে স্যানিটারি নেপকিন কিনতে যাচ্ছে। এটা আমাদের সমাজে টনিকের মতো কাজ করেছে। এ ধরনের কাজ মিডিয়াকে বেশি বেশি করতে হবে— আমরা কীভাবে শিশুদের যৌন ও প্রজনন শিক্ষা দিতে পারি। গত চার বছর যাবত্ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সঙ্গে পাইলটিং প্রোগ্রাম করছি। ৩৫০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আমরা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি— কীভাবে ৪৫ মিনিট শিশুদের এ বিষয়ে পড়াবে। এই প্রকল্প সবার কাছে সমাদৃত হয়েছে।
রাফেজা শাহীন
সমন্বয়কারী, শিশু সুরক্ষা, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন
যখনই আমরা শিশু নির্যাতনের কথা বলি, তখনই এটাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার চেষ্টা করি। আমরা সংবাদপত্র ঘেঁটে শিশু নির্যাতনে করণীয় ঠিক করেছি। জেলায়, পাড়া-মহল্লায় শিশু সুরক্ষা কমিটি গঠন করে সেখানে তরুণ-যুবা সবাইকে যুক্ত করেছি। আমরা নির্যাতনের ভয়াবহতা প্রকাশ করতে যতটা পারদর্শী, ততটা সমাধানের পথ খুঁজি না। একটি সমাজ যখন বিকশিত হয়, তখন এ ধরনের সহিংসতা বেড়ে যায়। নির্যাতনের কথা বলে আসলে শিশু ধর্ষণের ব্যাপ্তি প্রকাশ পায় না। একটি প্যাকেজে যৌন নির্যাতন বোঝা যায় না। বকাঝকা দেওয়াটাও নির্যাতন, কানমলা দেওয়াটাও নির্যাতন। একটি শিশুকে নম্বরের জায়গায় যখন ডবল জিরো দেওয়া হয়, তখন সেটাও একধরনের নির্যাতন।
হাসিনা বেগম
সামাজিক নীতি বিশেষজ্ঞ, ইউনিসেফ
আমরা আসলে সবকিছুই শিশুর কাঁধে চাপিয়ে দিচ্ছি। এর নেতিবাচক দিক থাকে। বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার বেশি। এখনো ৪৮ ভাগ বাল্যবিবাহ হচ্ছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের বিয়েটা একটা যৌন নির্যাতন। এটার জন্য আমাদের কাজ করতে হবে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় যে শিশুরা থাকে, তারা যৌন নির্যাতনের ঝুঁকিতে থাকে। যারা গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসী হয়ে আসে, তারাও যৌন নির্যাতনের ঝুঁকিতে থাকে। আমরা মনে করি, এসবের সমাধান প্রয়োজন।
ফারজানা রূপা
সাংবাদিক, একাত্তর টেলিভিশন
শিশুরা সব সময় ভীত থাকে। ভাবে, তার পাশে কেউ নেই। এই জায়গাটায় আমাদের হাত দিতে হবে। গণমাধ্যম এ বিষয়ে কাজ করতে পারে। আমরা বাড়িতে যারা থাকি মেয়েরা বা মায়েরা, তারা সারাক্ষণ খুব উদ্ভ্রান্তের মতো থাকি। এই উদ্ভ্রান্ততা শিশুদের জন্য যে কত বড়ো সংকট তৈরি করে, সেটা আমরা বুঝতে পারি না। শিশু তার নির্ভরযোগ্য কোনো জায়গা পায় না যে সে তার কথাটা বলবে। আমরা প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই দেখতে পাই শিশু নির্যাতনের কথা। আমরা আসলে কী করতে পারি? শিশুর প্রতি যৌন নির্যাতন যে কতটা ভয়াবহ, তা যদি বারবার আমরা বলি, তাহলে হয়তো একসময় অভিভাবকদের কানে পৌঁছাবে এবং সচেতনতা বাড়বে। এখন আমাদের সচেতন করতে হবে, কোনো ফ্ল্যাটে শিশু নির্যাতন হচ্ছে জানলে আমাকে যেতে হবে, ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিতে হবে।
লুত্ফুন নাহার কান্তা
ম্যানেজার, মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন, এএসডি
প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনে হারিয়ে যাচ্ছে অগণিত শিশুর শৈশব। অনেক ক্ষেত্রেই শিশুরা তা ঠিকমতো বলতে পারছে না। এ ধরনের নির্যাতনের কারণে ব্যাহত হচ্ছে শিশুর বিকাশ। তাই শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে আমাদেরই। নিশ্চিত করতে হবে সব শিশুর শৈশব ও কৈশোর। শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। একটি পৃথক ‘শিশু অধিদপ্তর’ করতে হবে। একই সঙ্গে শিশুর প্রতি পরিচিতজন ও অভিভাবকদের কেমন আচরণ হবে, তা খেয়াল করতে হবে। যেসব জায়গায় শিশুর নির্যাতিত হওয়ার আশঙ্কা আছে, সেসব জায়গা কৌশলে শিশুদের জানাতে হবে। সর্বোপরি শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, যাতে সে কোনো কিছু হলে নির্দ্বিধায় অভিভাবককে বলতে পারে।
তাহমিনা শিল্পী
কবি ও গণমাধ্যম কর্মী
শিশু নির্যাতনের সংবাদ কতটা তথ্য দিয়ে সংবেদনশীল করে প্রচার করা যায়, সেই প্রতিযোগিতাটা আমাদের করতে হবে। আমরা ক্ষমতাসীনদের প্রভাবমুক্ত হয়ে কতটা সংবাদ প্রচার করতে পারছি, সেটাও দেখতে হবে। আমাদের গণমাধ্যমের ফলোআপ নিউজগুলোও করা উচিত। অনুষ্ঠান বিভাগ থেকে ছোটো ছোটো নাটিকা তৈরি করতে পারে সচেতনতা বাড়াতে। বিজ্ঞাপন বিভাগ থেকে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের মাঝে মাঝে সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন প্রচার করতে হবে। আমরা আমাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সচেতনতা বাড়াতে যে যার অবস্থান থেকে কাজ করতে পারি।
