মামুন হায়দার
কিছু কিছু মানুষের জীবন গল্পের চেয়েও ঘটনাবহুল হয়ে থাকে! রূপকথার চেয়েও হয় চমকপ্রদ! যারা চেনা বৃত্তের বাইরে থাকতে ভালোবাসেন তারা জীবনের সার্থকতা খোঁজার চাইতে জীবনকে উপভোগ করতে চান। মোয়াজ্জেম হোসেন তাদেরই একজন। তিনি টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের কদিম হামজানী গ্রামের বাসিন্দা ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী। তার নিরন্তর পথচলা মোটেও মসৃণ ছিল না। তবু তিনি এক মহত্ উদ্যোগ নিয়ে নিজ জমিতে এবং নিজ অর্থে গ্রামবাসীর জন্য ফ্রি কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ করেছেন। আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন এই কমিউনিটি সেন্টারটিতে এলাকার যে কেউ বিয়েসহ যেকোনো অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারেন বিনা পয়সায়।
উদ্যোগের নেপথ্যে
ছোট বয়সে যখন তিনি দেখতেন গ্রামের বিয়ে-শাদিসহ নানা অনুষ্ঠানে স্থানের খুবই অভাব। যা দরিদ্রের জন্য চরম ভোগান্তির! এমন উপলব্ধি তাকে কষ্ট দিতো। সেসময় গ্রামবাসীর জন্য কিছু একটা করার ভাবনা মগজে গেঁথে যায় তার। ফ্রি কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণটি সেই ভাবনারই প্রতিফলন এবং এটি নির্মাণ না করা পর্যন্ত এ ভাবনা তাকে প্রতিনিয়ত তাড়িত করতো। হাসি-খুশি মুখ তার। বিনয়ী আর কর্মদক্ষতায় পটু সাধারণ একজন। কিন্তু তিনিই আবার নিজের সর্বস্ব দিয়ে গ্রামবাসীর জন্য ফ্রি কমিউনিটি সেন্টার করে অসাধারণ হয়ে উঠলেন। গ্রামবাসীর জন্য এমন এক কাজ তিনি করছেন, যা বিত্তবানদেরও হার মানিয়েছে। দৃষ্টিনন্দন এই কমিউনিটি সেন্টারটি একনজর দেখার জন্য এখন বিভিন্ন এলাকার মানুষ আসছেন।
৩ হাজার ৩শ’ স্কয়ার ফিট আয়তনের সদৃশ এই কমিউনিটি সেন্টারে রয়েছে হলরুম, অনুষ্ঠান মঞ্চ, আলাদা একটি কক্ষ, ঝকঝকে টাইলস করা একাধিক ওয়াশরুম কাম বাথরুম আর রান্নার জন্য রয়েছে কিচেন রুম। মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘যারা এখানে অনুষ্ঠান করে তারা এখানে শুধু ফ্রি স্পেসটা পায়। চেয়ার-টেবিল এবং অন্যান্য ডেকোরেটর সামগ্রী তাদের নিজেদের ব্যবস্থা করতে হয়। তবে লাইট, ফ্যান এবং পানির খরচটা আমিই বহন করি।’
মোয়াজ্জম খুবই সাধারণ
কৃষক পিতার পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে সবার বড় মোয়াজ্জেম। ১৯৭২ সালে বগুড়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে পরের বছরই উপ-সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে সড়ক ও জনপথ বিভাগে চাকরিতে যোগ দেন।
চাকরি জীবনে পূর্ণ সত্ এবং নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা হিসেবে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে ২০০৯ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর নিজ গ্রামে ফিরে আসেন। চাকরি জীবনে সঞ্চয় করা টাকা দিয়ে পৈতৃক ভিটায় বাড়ি তৈরি করে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন তিনি। পরে গ্রামের পৈতৃক এবং নিজের ফসলি জমিজমা যা ছিল সব বিক্রি করে সেখান থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে ২০১৪ সালে বসতবাড়ির পাশে পতিত জমিতে কমিউনিটি সেন্টারটি তৈরি করেন।
কমিউনিটি সেন্টার কেন করলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে মোয়াজ্জেম জানান, কখনো কখনো গ্রামে মানুষের বিয়েসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাকে যেতে হয়েছে। সেখানে অধিকাংশ বাড়িতেই দেখেছেন অনুষ্ঠান আয়োজনের জায়গা নেই। তখন থেকেই ভেবেছেন গ্রামের মানুষের জন্য তার বাড়ির পাশের পতিত জমিতে একটি ফ্রি কমিউনিটি সেন্টার করবেন।
তিনি বলেন, ‘বছর দুয়েক আগে গ্রামের এক দরিদ্র হিন্দু লোকের (কার্তিক পাল) মেয়ের বিয়েতে দূর থেকে বরপক্ষ আসে। কিন্তু এত মানুষকে কোথায় বসতে দেবে সে, ৫ জন লোক বসারও জায়গা নেই তার ছোট্ট বসতবাড়িটিতে। মাত্র কয়েকদিন আগে আমি কমিউনিটি সেন্টারের কাজ শেষ করেছি। তখনো কাউকে জানাইনি ভবনটা আমি কেন করেছি। আমি কার্তিককে ডেকে বললাম তোমার মেহমানদের আমার এখানে নিয়ে এসো। আমার এই কমিউনিটি সেন্টারে তোমার মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান করো। ওরা এলো। দু-দিন ধরে চললো সেই বিয়ের অনুষ্ঠান। হিন্দু বিয়ের ঢাক আর বাজনার শব্দে গ্রামের এবং আশেপাশের অনেক মানুষ সেখানে ভিড় জমিয়েছিল। আর তা দেখে আনন্দ আর সন্তুষ্টিতে আমার হূদয়টা ভরে গিয়েছিল।’
হাসপাতালও আছে
তিনতলা পাকা ভবনের নিচতলায় কমিউনিটি সেন্টার। ভবনের ওপরের দুটি তলা অবশ্য মোয়াজ্জেম খালি রেখেছেন এই আশায় যে, সেখানে গ্রামের মানুষের বিনামূল্যে চিকিত্সার জন্য একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করবেন।
মোয়াজ্জেম বলেন, ‘কবে নাগাদ হাসপাতালটি বাস্তবায়ন হবে জানি না, তবে আমি স্থাপনা নির্মাণ করে গেলাম। আমার বড় ছেলে ডাক্তার, এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত আছে। সে বলেছে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল চালু করতে। কিন্তু এ হাসপাতালের জন্য তো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন আয়োজনে কমপক্ষে দুই/তিন কোটি টাকা লাগবে। সে অর্থবিত্ত আমার নেই। তাই আপাতত এটা করা সম্ভব না। ছেলেটা এখন যদিও হাসপাতালটি চালু করতে পারছে না, ভবিষ্যতে হয়তো পারবে। আর সে যদি না পারে, অন্য কোনো হূদয়বান ব্যক্তি যদি করতে চায় সেখানে করতে পারবে।’
হাসপাতাল চালু করতে না পারলেও ছেলেকে মোয়াজ্জেম বলেছিলেন প্রতি সপ্তাহে একবার এসে গ্রামের মানুষের ফ্রি ট্রিটমেন্ট করতে। ছেলেও প্রতি শুক্রবার যান। তিনি অর্থপেডিক্সের ডাক্তার, কিন্তু গ্রামের সব ধরনের রোগীই তার কাছে চিকিত্সা নিতে যান।
‘বিনা ফি-তে দেখার কারণে গ্রামের সুস্থ লোকরাও আসে। একদিনে এত রোগী সে দেখতে পারেন না। তাই প্রকৃত রোগীরাই যাতে আসে সেজন্য তাকে কিছুদিন হলো রোগী প্রতি ১০০ টাকা ভিজিট নিতে বলেছি। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাবদ রোগীদের যাতে অতিরিক্ত টাকা ব্যয় করতে না হয় সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে বলেছি।’—বললেন মোয়াজ্জেম।
অন্যান্য উদ্যোগ
পুকুরের পাশেই করেছেন গ্রামের মানুষের বসার জন বেঞ্চ এবং শিশুদের খেলাধুলার জন্য স্লিপার ও দোলনা ব্যবস্থা।
মোয়াজ্জেম বলেন, ‘কমিউনিটি সেন্টার আর পুকুরের পাশে খোলা জায়গা এবং মানুষের বসার ব্যবস্থা রেখেছি। গরমের দিনে রাত ১২টা পর্যন্ত এখানে গ্রামের মানুষ দলবেঁধে বসে হাওয়া খায়। দেখে আমার খুব ভালো লাগে।’ পুকুরপাড়ে অনেকটা জায়গাজুড়ে পাকা বেদিসহ একটা সুদৃশ্য শহীদ মিনারও নির্মাণ করেছেন মোয়াজ্জেম।
‘গ্রামের ছোট ছেলেমেয়েদের দেখতাম কলাগাছ দিয়ে শহীদ মিনার বানিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারিতে ফুল দিতে, তাই শহীদ মিনারটি নির্মাণ করেছি ভাষা শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে। একটু বেশি জায়গা নিয়েই করেছি, যাতে সেখানে আলোচনা, সমাবেশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যায়’—বলেন মোয়াজ্জেম।
গ্রামবাসী আবদুল জলিল বলেন, ‘সারাদিন মাঠ-ঘাটে কাজ করে গ্রামের মানুষ মোয়াজ্জেমের করা কমিউনিটি সেন্টারের সামনে এসে বসে তাদের ক্লান্তি দূর করে। আমাদের বসার জন্য সিমেন্টের বেঞ্চ বানিয়ে দিয়েছেন মোয়াজ্জেম।
গ্রামের এক গৃহিণী জয়ফুল বেগম জানান, মোয়াজ্জেম পুকুর কেটে দেওয়ায় তাদের অনেক সুবিধা হয়েছে। গ্রামের অনেক মানুষ এই পুকুরে গোসল করে। তিনি বলেন, ‘বছরে ৬ মাস নদীতে পানি থাকে না, অন্য সময় থাকলেও আমরা মহিলারা তো আর সেখানে যেতে পারি না। গ্রামে আরেকটা পুকুর আছে, কিন্তু মোয়াজ্জেম কাকার পুকুরের পানি খুবই পরিষ্কার।’
এত টাকা পেলেন কোথায়?
এসব করতে আমার পৈতৃক এবং নিজের করা জমি বিক্রি করতে হয়েছে। এখন বসতবাড়িটা ছাড়া আমার আর কিছু নেই। কিন্তু তাতে কী হয়েছে? জমি দিয়ে আমি আর কী করবো? এসব তো আর সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবো না। পৃথিবীতে এসেছি খালি হাতে, যেতেও হবে খালি হাতে।’—বললেন তিনি।
আবহমান বাংলার লোকজ সংস্কৃতি পালনের অংশ হিসেবে মোয়াজ্জেম তার বাড়ি এবং বাড়ি সংলগ্ন নিজস্ব ভূমিতে এলাকাবাসীর জন্য ২০১০ সাল থেকে প্রতিবছর বাংলা নববর্ষে আয়োজন করে আসছেন বৈশাখী মেলা এবং বাউল গানের আসরসহ নানা জমজমাট আনন্দ আয়োজন। এলাকার কিছু মানুষ অবশ্য শুরুতে বাধ সেঁধেছিল তাতে। কিন্তু মোয়াজ্জেমের অকাট্য যুক্তি আর দৃঢ়তার কাছে হার মানতে হয়েছে তাদের। গ্রামের জরাজীর্ণ মসজিদটি সংস্কারেও অবদান রেখেছেন মোয়াজ্জেম।
‘আমি আসলে লালন ভক্ত একজন মানুষ। ধর্মের নামে গোঁড়ামি আমি পছন্দ করি না। সৃষ্টিকর্তা মানুষ সৃষ্টি করেছেন, আর ধর্ম সৃষ্টি করেছে মানুষ। তাই যার যার ধর্ম সে সে পালন করবে, আর সব ধর্মের মূলমন্ত্র তো একই। সব ধর্মেই শান্তি আর সম্প্রীতির কথা বলা আছে।’—বললেন মোয়াজ্জেম।
গ্রামে বড় হয়ে ওঠা মোয়াজ্জেমের গ্রামের দৃশ্য মননে মগজে শৈশব ভিড় করে। তার কথায়, ‘গ্রাম যেখানে প্রকৃতি তার সব সুন্দর নিয়ে বসে আছে পরিব্রাজকের মন জোগাতে। গ্রামের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য যেখানে কান পাতলেই মেলে বাতাসের আন্দোলিত গাছের শব্দ, মেঘের গর্জন, পাখ-পাখালির ডাক। আর যে ক’টা দিন বাঁচবো গ্রামের মানুষের সঙ্গে থেকে তাদের সেবা করে যাবো। নিজের জন্য চাওয়ার আর কিছু নেই। আমার ছেলেমেয়েদেরও বলেছি, চাকরি জীবন শেষে গ্রামে ফিরে আসতে। অবসর জীবনে গ্রামে থেকে গ্রামবাসীদের জন্য কাজ করতে।’
