শুধুই গল্প নয়

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৮:৪৮

 

তাহমিদ আহমেদ শুভ্র

 

পৃথিবীর পথে পথে কতশত গল্প, তা অফিসের ডেস্কে কিংবা খবরের কাগজ হাতে নিয়ে কী বোঝা যায়? বেরুতে হবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, যত বেশি জায়গায় নিজের পদচিহ্ন রাখতে পারবেন গল্প ও অভিজ্ঞতার ঝুলি ততই সমৃদ্ধ হবে। বাংলাদেশের পতাকাবাহী পরিব্রাজক নাজমুন নাহার যেন একটি বাস্তব অভিযাত্রার ইতিহাস, একটি পৃথিবীর গল্প। পৃথিবীর শতশত শহরে তিনি ঘুরেছেন, তার আড্ডা হয়েছে লাখ লাখ মানুষের সঙ্গে। তাইতো তার মুখের প্রতিটি গল্পই যেন ‘বিশ্বমানচিত্রে গাঁথা’। যিনি এত এত উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় উঠেছেন, এত সমুদ্রতটে গুটিগুটি করে পা চালিয়েছেন, অচেনা সব নগরে খেয়েছেন অদ্ভুত সব খাবার তার মুখেই তো এসব গল্প মানায়। তবে তার কথায়, সবেমাত্র ১৩৫টি দেশ হলো, পুরো পৃথিবী ঘুরতে হবে।

নাজমুনি নাহার এগিয়ে চলছেন অবিরত। কোনো ভয়ঙ্কর ঘটনা কিংবা বাঁধাই তাকে আটকাতে পারেনি, পারবেও না। ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে এবারের ৫টি দেশের অভিজ্ঞতা তার বিশ্বভ্রমণ অভিযাত্রার অভিজ্ঞতায় ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। গুয়াতেমালার রাস্তায় মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে ফিরে আসা এই নারী ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলো সড়কপথে একা একা ভ্রমণ করেছেন। গুয়াতেমালা থেকে রাতের অন্ধকারে পার হয়েছিলেন এল সালভাদরের সীমান্ত, সেখানে এল তুনকো শহরে কিছুদিন থাকার পর পাড়ি দিয়েছিলেন বাকি সব দেশগুলো। এল সালভাদোর থেকে হন্ডুরাস, নিকারাগুয়া ও কোস্টারিকার সীমান্তগুলো একা একা সড়কপথে পাড়ি দিয়ে তিনি এখন অবস্থান করছেন কোস্টারিকার তামারিন্দ শহরে। সেখান থেকেই তিনি শোনালেন টুকরো টুকরো কয়েকটি অভিজ্ঞতার কথা—

 

স্বর্গীয় নৈসর্গিক নাকাচকোলো উপদ্বীপে

আমার দেখা কোস্টারিকার সবচেয়ে সুন্দর জায়গা নাকাচকোলো উপদ্বীপ। যার সৈকত কোস্টারিকার অন্যান্য সমুদ্র সৈকতের থেকে একটু ভিন্ন। এই উপদ্বীপ পাপায়া পেনিনসুলার মধ্যে পড়েছে। কোস্টারিকার কুলেব্রা থেকে এই দ্বীপটি কোস্টারিকার ভূখণ্ড থেকে বেরিয়ে ঠিক প্যাসিফিক সমুদ্রের কিছুটা অংশজুড়ে রয়েছে। দেখে মনে হবে আলাদা একটি ভূখণ্ড বিশাল কোনো বড় ভূখণ্ডের ভেতর থেকে বেরিয়ে সমুদ্রের মধ্যে হাত ছড়িয়ে সাঁতার কাটছে।

কোস্টারিকার লাইবেরিয়া শহরের ডডেরো হোস্টেল থেকে আমরা ৬ জন বের হলাম এই উপদ্বীপ দেখার উদ্দেশ্যে। আমি সান, যিশু, ম্যানদিলিনা, আলবার্ট ও এওয়েন। পাহাড়ি এলাকা ও জঙ্গল পেরিয়ে যখন আমরা পৌঁছালাম সৈকতের কাছাকাছি দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল সেই অপূর্ব নীলাভ্র পানির রঙ, কোরাল আর অদূরেই পাহাড়ের ভ্যালি। সৈকতের কাছাকাছি যখন পৌঁছালাম তখন অনেক ম্যানগ্রোভ জঙ্গল দেখতে পেলাম। ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের মধ্যে প্রতিদিনই বিকেলে পানি এসে ডুবে যায় অপূর্ব সমুদ্র সৈকত, আবার দিনের বেলায় পানি নিচে নেমে যায়। আমরা ম্যানগ্রোভ জঙ্গল পার হয়ে সামনের দিকে অনেকদূর সৈকতের পানির কাছাকাছি গেলাম। আমি হাত দিয়ে প্যাসিফিক সমুদ্রের পানি স্পর্শ করলাম। কী অপূর্ব! পানিগুলো যেন হালকা কুসুম গরম পানির মতো নিচে সামুদ্রিক মাছের দৌড়াদৌড়ি, কোরাল আর ছোট ছোট পাথর, রঙ-বেরঙের শামুক ঝিনুক সবকিছুই দেখা যাচ্ছে।

প্রথমে আমি ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের ভেতরে ঢুকলাম। তারপর ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের গাছগুলোকে স্পর্শ করে দেখলাম ডালপালাগুলো যেন উপর হয়ে মাটি ছুঁয়ে আছে। ঘন ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের কাছাকাছি আবার সামুদ্রিক বালি দেখা যাচ্ছে। পেছনে উঁচু উঁচু পাহাড়, কোথাও খণ্ড খণ্ড পাথর, সব মিলিয়ে এমন অপূর্ব দৃশ্য যেন আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম নিমিষেই। পৃথিবীর অনেক সমুদ্রের পানিতে আমি গোসল করেছি, সাঁতার কেটেছি। কিন্তু নাকাচকোলো সমুদ্র সৈকতের পানি এবং প্যাসিফিকের এই অংশটুকু আমার কাছে একটু ভিন্নরকম মনে হলো। উত্তাল কোনো ঢেউ নেই। সমুদ্রের সৈকতের পুরোটাই সমতল মনে হলো। সমুদ্র থেকে যে পানিগুলো পাড়ে এসে ভিড় করছে সেগুলো খুবই ধীরে ধীরে আসছিল, সব মিলিয়ে আমার কাছে এই উপদ্বীপের সৈকত একটু নিরাপদ মনে হলো।

এমন সৈকতের পানিতে আমি না নেমে থাকতে পারলাম না। আমরা সবাই মিলে নেমে পড়লাম প্যাসিফিক সমুদ্রের লবণাক্ত সেই পানিতে। সমুদ্রের নিচে লুকিয়ে থাকা প্রবাল পাথর, ঝিনুক, শামুক সবকিছু এত স্বচ্ছ মুক্তোর দানার মতো লাগছিল দেখতে যেন আমি ওই সমুদ্র থেকে আর ফিরে না আসি।

এর মধ্যে আকাশের রঙ পরিবর্তন হলো। দূর পাহাড়ের মধ্যে জমে উঠল মেঘের মেলা। বৃষ্টি আসার আগের মুহূর্তে আমার কাছে কেমন যেন অপূর্ব একটা ভালোলাগার অনুভূতি সৃষ্টি হলো। সবকিছু কেমন যেন ফেরিটেলের মতো লাগছিল চারদিকে। এরমধ্যেই শুরু হলো বৃষ্টি আর আকাশের গর্জন। আমরা ৬ জন সমুদ্রের মধ্যে বৃষ্টিতে ভিজছি আর কথা বলছি তখনো। আমরা তখন যেন ভিন্ন রাজ্যে হারিয়ে গিয়েছি। কেউই ভয় পাচ্ছিলাম না, মুহূর্তটি আমরা সবাই উপভোগ করছিলাম। নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল বলে এখানে বৃষ্টি বেশিক্ষণ থাকে না। এই বৃষ্টি আসে, এই আবার রোদ ওঠে। এমনই চলতে থাকে কোস্টারিকার আবহাওয়ার পরিবর্তন।

কিছুক্ষণের মধ্যে আবার রোদ উঠে গেল। প্যাসিফিক সমুদ্রের গোলটেবিল বৈঠক থেকে আমি তখন বের হয়ে এলাম। প্যাসিফিকের সমুদ্রের কিনারায় তলা থেকে পানিতে ডুব দিয়ে কিছু অপূর্ব রঙের শামুক-ঝিনুক আর পাথর কুড়িয়ে নিলাম আমি আর আলবার্ট।  পারে উঠে আকাশ খোলা উপদ্বীপের সমুদ্রের কিনারা দিয়ে হেঁটে বেড়ালাম। সমুদ্রের হিমেল হাওয়া, বাতাসে অপূর্ব সুন্দর রেশ। ছুঁয়ে যাচ্ছিল আমার প্রতিটি লোমকূপ। যেন নতুন করে বেঁচে থাকার আনন্দ এখানেই।

 

গুয়াতেমালার অ্যান্টিগুয়া

ভোরের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে যখন ঘুম ভাঙলো তখন আমি চায়ের কাপ হাতে নিয়ে পারপাস হোস্টেলের ছাদে উঠে পড়লাম। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে দূরে দেখতে পেলাম ভলকানিক মাউন্টেনের সে অপূর্ব দৃশ্য! পাহাড় ঘিরে আছে সাদা সাদা মেঘের ভেলা।

অ্যান্টিগুয়া দক্ষিণ গুয়াতেমালায় আগ্নেয়গিরির চারপাশে ঘেরা একটি ছোট শহর। এটি এর স্পেনীয় উপনিবেশিক বিল্ডিংগুলোর জন্য বিখ্যাত তার মধ্যে অনেকগুলো ১৭৭৩ সালের ভূমিকম্পের পরে পুনরুদ্ধার করেছিল। অ্যান্টিগুয়া উপনিবেশিক রাজধানী হিসেবে ২০০ বছরের স্পেনীয় উপনিবেশিক রাজত্বের স্মৃতিচিহ্নকে বহন করছে। তাই গুয়াতেমালায় মধ্যে এই ছোট্ট শহরটি সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। ছোট্ট শহরটি চারদিকে ঘিরে আছে আগুয়া, ফিউগো, আকাতেনাঙ্গো এবং প্যাচায়া নামক আগ্নেয়গিরিগুলো। এরমধ্যে আমার দেখা ভলকান পাচায়া সবচেয়ে আকর্ষণীয় ভলকানো।

আমি দ্রুত ভোরের দৃশ্য অবলোকন শেষে যাত্রা শুরু করলাম অ্যান্টিগুয়া শহরকে ওপর থেকে দেখার জন্য। আমি যখন পৃথিবীর কোনো দেশে যাই তখন আমার খুব ভালো লাগে, আমি সেই শহরটিকে কোনো পাহাড়ের ওপর কিংবা উঁচু কোনো জায়গা থেকে দেখি। আর তার উদ্দেশ্যে আমি রওনা দিলাম ‘সেরো দে লা ক্রুজ’ অর্থাত্ ‘হিল অব দ্য ক্রস’।

অ্যান্টিগুয়ার কোলঘেঁষে হাঁটছি আর হাঁটছি। চারদিকে অসংখ্য মানুষ শহরের ভেতর। তাদের স্বাধীনতা দিবসের উত্সব চলছে। কোথাও গান চলছে রাস্তার মোড়ে মোড়ে, কোথাও রাস্তার মাঝে নৃত্য করতে করতে বাদ্যযন্ত্র বাজাতে বাজাতে শহরের মেইন স্কয়ারে এসে পৌঁছেছে স্কুলের বাচ্চারা। তাদের উত্সব দেখতে আমি এক সময় পাহাড়ের কিনারায় পৌঁছালাম চূড়ার ওপরে ওঠার জন্য। পাহাড়ের কোল থেকে ওপরের দিকে উঠে গেছে কয়েকশ’ সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি ভেঙে আমি ওপরে উঠছি। দেখলাম বেশকিছু পর্যটক। যেতে যেতে কথা হলো নেদারল্যান্ড থেকে আসা বেথের সঙ্গে। সঙ্গে ছিল আরো ৩ জন ফেলো, যারা জার্মানি, ইংল্যান্ড ও আমেরিকা থেকে এসেছে।

চূড়ায় যখন উঠে গেলাম দেখতে পেলাম পুরো অ্যান্টিগুয়া শহরকে। বিকেলের নরম রোদ আর মেঘের ভেলায় ভেসে যাচ্ছে পুরো অ্যান্টিগুয়া। কী অপূর্ব লাগছিল! হঠাত্ করে ছোট্ট একটি বাচ্চা আমাদের সামনে এসে আমার দিকে তাকিয়ে মুখ উঁচু করে হাসছে। আমি হাঁটু গেঁড়ে ওর সামনে বসে হ্যান্ডশেক করলাম। আমাকে বললো, তার নাম সোফিয়া। সে সেখানকার আদিবাসী, পাহাড়ের কোলে তার ঘর। বাচ্চাটির গায়ে গুয়াতেমালার ঐতিহ্যবাহী আদিবাসী পোশাক দেখে আমার ভীষণ ভালো লাগলো। আমি যেন গুয়াতেমালার রাস্তায় ঘটে যাওয়া সেই রক্তাক্ত ঘটনার কথা মুহূর্তেই ভুলে গেলাম।

ছোট্ট এই বাচ্চা মেয়েটি জানতে চাইলো আমি কোথা থেকে এসেছি। আমি বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা খুলে তাকে দেখালাম। তার খুশি যেন চোখ-মুখে দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ল, জানতে চাইল বাংলাদেশ কোথায়। আমি তাকে গুগল ম্যাপ সার্চ করে বাংলাদেশের অবস্থান দেখালাম। বাংলাদেশের স্কুলের বাচ্চারা দেখতে কেমন তা দেখালাম। বাংলাদেশের রয়েল বেঙ্গল টাইগার দেখতে কেমন তাও দেখালাম তাকে। পাশ থেকে থেকে উত্সুক অনেক বাচ্চা সেদিন পাহাড়ের চূড়ায় এসে ভিড় করলো আমার আশেপাশে বাংলাদেশের কথা জানার জন্য। বাংলাদেশের সকল দর্শনীয় স্থান তাদেরকে গুগলে সার্চ করে দেখালাম। উত্সাহী সব মানুষগুলোও গল্পে কিছুক্ষণ মুখরিত হলো আমার সঙ্গে।

ধীরে ধীরে সন্ধ্যার আকাশে ভরে উঠল স্বাধীনতা দিবসের মশালের আলোয়। ঘনঘটা করে এই স্বাধীনতা দিবস পালন করছে গুয়াতেমালার মানুষজন। এই ছোট্ট শহরের সকল মানুষ একত্রিত হয়ে নেমে এসেছে শহরের মেইন স্কয়ারে। হাজার হাজার স্কুলের বাচ্চাকে দেখে আমি খুব অবাক হলাম। তারা সবাই রাস্তায় তাদের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য এবং গান করছে। তারপর তারা স্কয়ারের একটা উঁচু মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাতে আলোর মশাল জ্বেলে উত্সবে মেতে উঠেছে। আর মঞ্চ থেকে নেমে সবাই দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে আসছে এই পাহাড়ের ওপর।

ছোট্ট সুন্দর এই শহরটির চারদিকে ঘিরে আছে ভলকানিক পাহাড়ের ভ্যালি। আর শহরের ভেতরে স্পেনীয় সভ্যতার সকল নিদর্শন। এই শহরটির নাম ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটে আছে। এই শহরের উল্লেখযোগ্য স্থাপত্যের উদাহরণগুলোর মধ্যে বারোক লা মার্সেড চার্চ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এটি শহরের বিখ্যাত সেমানা সান্তার একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, যেকোনো ধর্মীয় পবিত্র সপ্তাহে এখানে কুচকাওয়াজ এবং অনুষ্ঠান হয়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, ধীরে ধীরে পাহাড় থেকে আমরা সবাই নেমে এসেছি শহরের কোলে আবার। সন্ধ্যার বাতাস ছড়িয়ে যাচ্ছে তাদের স্বাধীনতা উত্সবের আনন্দে, আরো বেশি মানুষ ভিড় করছে শহরের কোণায় কোণায়। এমন উত্সবমুখর দিনে গুয়াতেমালার আনন্দের সঙ্গে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা হাতে আমি সামিল হয়েছে সেই দূরপ্রান্ত থেকে ছুটে এসে। এটাই যেন আমার আত্মার প্রশান্তি!