ইলিশ দিয়ে দিন গণনা

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৮:৪৯

শাকুর মজিদ

আমাদের ছোটবেলার সবচেয়ে অপছন্দের মাছ ছিল ইলিশ। আমার দাদা সপ্তাহে দু-বার বাজারে যেতেন। সোম ও শুক্রবার। তার বাজেট থাকতো বিশ টাকার মতো। ৭-৮ টাকায় কেবল ইলিশ মাছই পাওয়া যেত। সেকারণে প্রতিদিনই শেষ আইটেম হিসেবে একটি সস্তার ইলিশ তিনি নিয়ে আসতেন। চল্লিশ বছর আগের সবকিছু স্পষ্ট মনে নেই, যেটুকু আছে তাতে মনে হয় এখনকার ৭-৮০০ গ্রামের একেকটি ইলিশ মিলতো ৭-৮ টাকায়। দাদা কাপড়ের ঝোলা ক্যারি করতো, ওটা ভারি। ওর ভেতর আলু, মুখি, পান, তামাক, চিনি, চা-পাতা, বিস্কুট এসব। আমি আস্ত ইলিশটা বয়ে আনতাম। ইলিশের মুখের ভেতর বেত আটকানো। যেতে যেতে যাদের সঙ্গে দেখা হতো তারা দাম জানতে চাইতো। সব সময় আমার দাম জানা থাকতো না। দাদার কাছ থেকে জিজ্ঞেস করে দাম জেনে বলতাম। এর উত্তরে সবাই বলতো, ইলিশের দাম দেখি বাড়ি গেল।

সন্ধ্যার পর বাড়ির বাইরে থাকা হতো কেবল বাজারের দিন। মাগরিবের নামাজ শেষ করে দাদা বাড়ি আসতেন। তারপর মাইল দুই পথ হেঁটে হেঁটে বাড়ির কাছে আসতেই ডানে-বামে অনেক বাড়ির রান্না ঘরের পাশ দিয়ে যেতে হতো। সেখানেও প্রথমে শব্দ পেতাম, পরে গন্ধ। কারো উনুনে কড়াইয়ের ওপর তেল ঢালা হয়েছে, আর তার ওপর ইলিশ পড়ে চেব্যত করে শব্দ করে উঠলো, শোনা যেত। আর ঘরের উঠোন মাড়িয়ে পাশের সরু রাস্তা বরাবর তার ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়তো টের পেতাম। বুঝতাম ওবাড়ির কপালেও শুধুই ইলিশ।

আমাদের অঞ্চলে (সিলেটের বিয়ানী বাজার) সস্তায় ইলিশ পাওয়ার একটা কারণ ছিল। ভারতের করিমগঞ্জের বর্ডার আমাদের এলাকাসংলগ্ন। চাঁদপুর থেকে এই রুটে রাতের অন্ধকারে ইলিশ পাচার হতো ভারতে। বর্ডার ‘গরম’ থাকলে ‘বুঙ্গা’র এই মালগুলো বাজারে বিক্রি করে ফেলা ছাড়া উপায় ছিল না। সেকারণে প্রায় প্রতিটি বাজারেই ইলিশের আমদানি ছিল প্রচুর। আমরাও সপ্তাহে দুটো করে ইলিশ খেতে খেতে ইলিশের প্রতি প্রায় বিতৃষ্ণা জন্মে যেত। ইলিশ ছাড়া অন্য মাছ বেশি প্রিয় ছিল। কিন্তু উপায় ছিল না। সারাবছরই ইলিশে নির্ভর ছিলাম, যেহেতু এর দাম কম। আর এক সময় টের পেলাম যে, এই একটি মাত্র মাছ নানাভাবে, নানারকমের তরকারি দিয়ে রান্না করা যায় এবং প্রতিটিরই ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ। আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিল মুখি দিয়ে ইলিশ। দুটোই পিছলে পিছলে। আমার কাছে বড়ই সুস্বাদু। ইলিশের ডিম ভাজা, কিংবা আমের বোল দিয়ে পাতলা ঝোলের তরকারিও ছিল প্রিয়। ভাজা ইলিশ ২-৩ টুকরো করা হতো বড়দের জন্য, কদাচিত্ তার ভাগ আমরা পেতাম। ইলিশের মাথা দেওয়া হতো বাবাকে। বাবা বছরের বেশিরভাগ সময় জাহাজে থাকতেন, তখন মাথা পেয়ে যেতাম আমি। এই ছিল আমার শৈশবের ইলিশ বিলাসিতা।

ইলিশ যে এমন মহার্ঘ্য টের পেলাম তার একযুগ পর ঢাকা এসে। এখানে ইলিশের অনেক রেসিপির কথা শুনি। ইলিশ দোপেয়াজা, সর্ষে ইলিশ, আরো কত কী। আরো শুনি, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে নাকি এটা বাংলাদেশের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত খাবার। তখনকার মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুকে নাকি প্লেনে করে ইলিশ পাঠাতেন সামরিক শাসক এরশাদ।

এই ইলিশ পহেলা বৈশাখের একটি আইটেম হয়ে দাঁড়ায় রমনার বটমূলে এবং এটা আমি টের পাই এখানে আমার প্রথম উপস্থিতি সেই ১৯৮৭ সালেই। খবর নিয়ে জানি যে, ১৯৮৩ সালে কয়েকজন রমনার বটমূলে এক ডেকচিতে কিছু পান্তা ভাত আর কড়াইতে ইলিশ ভাজা নিয়ে বসেছিলেন। প্লেটে প্লেটে করে তারা বিক্রিও করেছিলেন। এই ঘটনার দাবিদার দু’জন। একজন দৈনিক জনকণ্ঠের সাংবাদিক বোরহান আহমেদ, অন্যজন সাংবাদিক শহিদুল হক খান। এদের সঙ্গে অবশ্য আরো কয়েকজন ছিলেন। নিতান্ত কৌতুহলী হয়েই তারা এটা প্রথম করেছিলেন। কিন্তু পরের বছর দেখা যায়, মুড়ি-মুড়কির সঙ্গে সকালের নাস্তা হিসেবে এটার বাজার ভালো যাচ্ছে। খুব ভোরে যারা রমনার বটমূলে গান শুনতে আসেন তারা সকালবেলা ক্ষুধার্ত হয়ে পড়লে এই আইটেমটা বাজার পেয়ে যায়। ১৯৯১ সালে এরশাদের পতনের পরের বছর মহা জমজমাট বৈশাখী উত্সব হয় রমনায়। দেখি মাছের বাজারের মতো পান্তা-ইলিশের হাট বসেছে সেখানে। সৌখিন রাঁধুনিরা নিজেই দোকান দিয়ে বসেছেন। আমাদের হলের এক বড়ভাই আমাকে প্রায় জোর করে নিয়ে যান তার স্টলে। ভাবীর পান্তা-ইলিশের দোকানে বসিয়ে আমাকে মাটির শানকির ওপর কিছু ভেজানো ভাত আর এক টুকরো ইলিশ, সঙ্গে পেয়াজ-কাঁচা মরিচ দিয়ে সাজিয়ে দেন। আমি অনেক কষ্টে ২-৩ লোকমা খেলাম। পান্তা ভাত আমি কখনো খাইনি। আমার গলায় আটকে যায়। খাওয়া শেষ করে বিল দিতে চাই। দেখি দাম লেখা, ইলিশ প্রতি পিস ২৫ টাকা, পান্তা ৫ টাকা। আমি হলে ৬ টাকায় ফুল কোর্স ডিনার খাই। এখানে ৩০ টাকা দিতে হবে? তাও বড়ভাই বলে কথা। বড় মুখ করে নিয়ে এসেছেন। আমি মানি ব্যাগে হাত দিই।

বড়ভাই নিতান্ত ভদ্রতা করে বললেন, ‘আরে না, না, লাগবে না।’

আমি আবার হাত বের করে ফেলি। আমার ৩০ টাকা রক্ষা পেল।

এসব কাহিনির দুই দশক পর দেখি ইলিশ নিয়ে এলাহি কাণ্ড। বৈশাখের সঙ্গে ইলিশ এসে জড়িয়ে যায়। টেলিভিশনের রান্নার অনুষ্ঠান, দৈনিক-সাপ্তাহিক-পাক্ষিকের রাঁধুনির পাতা, সর্বত্র বৈশাখের খাবার হিসেবে আমাদের ‘এক্সপার্ট’ রন্ধনবিদরা ইলিশ-পান্তাকে প্রায় জোর করে বৈশাখের খাবার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করতে থাকেন এবং মিডিয়ার সৃষ্ট এই উপাচার আমাদের এক শ্রেণির নাগরিকদের সংস্কৃতি হয়ে যায়। সঙ্কট দেখা দেয়, যখন এই কারণে ইলিশের চাহিদা বেড়ে যায় এবং তখন আগে থেকে স্টক করে রাখা বড় ইলিশ ১০ গুণ পর্যন্ত বেশি দামে এটা বিক্রির চেষ্টা করে। আর তখনই আরেক শ্রেণির নাগরিক এই ইলিশকে বর্জনের কথা বলে।