ইহসান আজিজ
সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম বিশ্বের ১৪০টি দেশের ওপর ‘ভ্রমণ এবং পর্যটন প্রতিযোগিতা ২০১৯’ শীর্ষক তাদের রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। যেখানে সারাবিশ্বের পর্যটনশিল্পের বর্তমান অবস্থা ফুটে উঠেছে। এ রিপোর্টটা মূলত চারটি প্রধান ফ্যাক্টরের উপরে করা হয়েছে—উপযুক্ত পরিবেশ, ভ্রমণ এবং পর্যটন নীতিমালা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রাকৃতিক এবং সাংস্কৃতিক সম্পদ। গত বছরের তুলনায় কিছুটা অগ্রগতি হলেও বাংলাদেশ এখনো তলানিতেই অবস্থান করছে। ১৪০টি দেশের মধ্যে আমাদের অবস্থান ১২০। বিশ্বের অন্যান্য দুটি পর্যটন স্পট কক্সবাজার এবং সুন্দরবন থাকার পরেও এই অবস্থা পর্যটন শিল্পে আমাদের দুরবস্থাকেই নির্দেশ করে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহের মধ্যে একমাত্র পাকিস্তানই (১২১) আমাদের চেয়ে পিছিয়ে আছে। যেখানে ভারত (৩৪), শ্রীলঙ্কা (৭৭), নেপাল (১০২) আমাদের চেয়ে এগিয়ে আছে এবং এটা আশ্চর্যজনক কিছু নয়। কারণ পর্যটকদের নিরাপত্তা এবং সুরক্ষায় কিছু উন্নতি করলেও অবকাঠামোগত উন্নয়নে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। রাস্তাঘাটের বেহাল দশা, জলাবদ্ধতা, হোটেলের অব্যবস্থাপনা, রাস্তার পাশেই ময়লা-আবর্জনার বিশাল স্তূপ, দুর্গন্ধ এবং পরিবেশ দূষণের মতো বিষয়গুলো আমাকে উদ্বিগ্ন করে। আমার বাড়ি কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের খুব কাছে হওয়ায় অনেকদিন ধরেই বিষয়গুলো একেবারে স্বচক্ষে দেখে আসছি। সদর উপজেলা পরিষদের সামনে পানি জমে থাকায় রাস্তাটা প্রায় সময় খানাখন্দে ভরা থাকে। শুধু এটা না, লিংকরোড থেকে কক্সবাজার শহরের অধিকাংশ রাস্তা ভাঙা অবস্থায় পড়ে থাকে মাসের পর মাস। পর্যটন শিল্প বর্তমানে বিশ্বে দ্রুত বিকশিত এবং বহুমাত্রিক শিল্প খাতগুলার অন্যতম। বিদেশি পর্যটকের কথা বাদ দিই, বর্তমানে এখন প্রতিবছর ৫০ থেকে ৬০ লাখ মানুষ ঘুরতে যায়। পাঁচ বছর আগে এ সংখ্যা ছিল ২৫ থেকে ৩০ লাখ। কিন্তু অবকাঠামোগত দুরবস্থার কারণে পর্যটকরা ভোগান্তিতে পড়ছে। বছরখানেক আগে আমরা কিছু বন্ধুরা মিলে সিলেট ঘুরতে গিয়েছিলাম। ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের বুক চিরে বের হয়ে আসা মনোলোভা পাহাড়ি ঝরনা, নয়নাভিরাম চা-বাগান, পুণ্য ব্যক্তিদের মাজার, থরে থরে সাজানো নানা রঙের নুড়ি পাথরের সঙ্গে মিতালি করতে প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যটক সিলেট ঘুরতে যান। কিন্তু পাথরবাহী ট্রাক চলাচলের কারণে রাস্তায় যে পরিমাণ গর্তের সৃষ্টি হয়েছিল বিছানাকান্দি, জাফলং যাওয়ার পথে, বাসে বসে রীতিমতো আমাদের মনে হচ্ছিল যেন রোলার কোস্টারে বসে আছি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেখানে এখন অবকাঠামোগত উন্নয়নে প্রচুর বিনিয়োগ করছে সেখানে আমাদের এ অবস্থা হতাশাজনক। বিগত কয়েক দশকে স্পেন মিলিয়ন মিলিয়ন ইউরো রাস্তাঘাট, রেল এবং আকাশপথে উন্নয়নে ব্যয় করছে যার ফলে তারা ধারাবাহিকভাবে পর্যটন শিল্পে শীর্ষে অবস্থান করছে। দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যা, পরিবেশগত বিপর্যয়সহ বিভিন্ন বিষয়গুলোকে মাথায় রেখে পর্যটন শিল্পের বিকাশে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। বাংলাদেশ বর্তমানে এই খাত থেকে যেখানে প্রায় ৭৬.১৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বার্ষিক আয় করে সেখানে সার্কভুক্ত অন্য দেশগুলোর আয় কয়েকগুণ বেশি। ভারতের আয়ের পরিমাণ ১০,৭২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, মালদ্বীপে ৬০২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, শ্রীলঙ্কায় ৩৮৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, পাকিস্তানে ২৭৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং নেপালে এর পরিমাণ ১৯৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তাই এখনই এ সেক্টরে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে দেশের আয় তথা জিডিপি বাড়াতে সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
n লেখক :শিক্ষার্থী, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সন্তোষ, টাঙ্গাইল
