তালেব রানা
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী বেশ কিছু অপরাধের জন্য ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে ইমপিচ (অভিশংসন) করা যেতে পারে। কারণ প্রেসিডেন্ট নিজেও দায়বদ্ধতা প্রদর্শনে বাধ্য। যদিও এই প্রক্রিয়া খুব একটা সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত দুই জন প্রেসিডেন্টকে ইমপিচ করা হলেও পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়নি। সর্বশেষ ৪২তম প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকে ইমপিচ করা হয়। কিন্তু তিনি পদে বহাল ছিলেন। তবে একজন প্রেসিডেন্টকে ইমপিচ করার অবস্থা তৈরি হয়েছিল। তিনি রিচার্ড নিক্সন। যদিও ১৯৭৪ সালে তার বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্টের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই তিনি পদত্যাগ করেন। এবার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভিশংসনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত শুরু করেছে ডেমোক্র্যাট পার্টি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্য বিদেশি শক্তির সাহায্য নেওয়ার অভিযোগে এই তদন্ত শুরু হয়েছে।
ইউক্রেনের নতুন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্পের একটি ফোনালাপের ভিত্তিতে এক ‘হুইসেলব্লোয়ার’ আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করার পর এই বিষয়টি সামনে এসেছে। ওই অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও তার ছেলে হান্টারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করতে ইউক্রেনকে চাপ দিয়েছেন। এক্ষেত্রে সামরিক সাহায্য বন্ধ করার হুমকি দিয়েছেন। বাইডেনের ছেলে হান্টার ইউক্রেনের এক গ্যাস কোম্পানিতে চাকরি করতেন।
ডেমোক্র্যাটরা তদন্ত শুরুর ঘোষণা দেওয়ার পর গত বুধবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ট্রাম্পের ফোনালাপের মেমো প্রকাশ করেছে হোয়াইট হাউজ। এতে দেখা গেছে, গত ২৫ জুলাই প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে জো বাইডেনের বিষয়ে তদন্ত করতে চাপ দিয়েছেন ট্রাম্প। ইউক্রেনে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধ করার কয়েক দিন পরই এই ফোন করেন ট্রাম্প। তবে সামরিক সহায়তার ব্যাপারে কোনো কথা হয়নি দুই নেতার মধ্যে।
এর একদিন পরই ওই হুইসেলব্লোয়ারের অভিযোগপত্রটি প্রকাশ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ওই অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউজ এই ফোনালাপের বিস্তারিত কিছু আড়াল করতে চেয়েছিল। কারণ দুই প্রেসিডেন্টের মধ্যকার আলাপের অনুলিপি সচরাচর যে কম্পিউটার ব্যবস্থাপনায় রাখা হয় সেখানে না রেখে গোপনীয় তথ্য থাকে এমন পৃথক ব্যবস্থাপনায় রাখা হয়েছিল। যেখানে হোয়াইট হাউজ ও মার্কিন প্রশাসনের অল্প কিছু মানুষের প্রবেশাধিকার রয়েছে।
ওই ‘হুইসেলব্লোয়ার’ আরো অভিযোগ করেন যে, ২০২০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অন্য দেশের হস্তক্ষেপের জন্য নিজের কার্যালয়ের ক্ষমতাকে ট্রাম্প ব্যবহার করেছেন। আগামী নির্বাচনে তার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন এমন একজনের বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য বিদেশি রাষ্ট্রকে চাপ দিয়েছেন। প্রেসিডেন্টের এই কার্যকলাপ আইনের লঙ্ঘন, অপব্যবহার এবং ভয়াবহ সমস্যা।
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আগে থেকেই ছয়টি অভিযোগের তদন্ত চলছিল। কংগ্রেসের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের বিভিন্ন কমিটি তদন্ত কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এগুলোর মধ্যে সর্বশেষ অভিযোগটি অনেক বেশ স্পর্শকাতর ও ভয়াবহ বলে মনে করা হচ্ছে।
তদন্তের বিষয়ে স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আইন ভঙ্গ করেছেন। তার এই কাজ ‘সাংবিধানিক দায়িত্বের লঙ্ঘন’। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোনো ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং ডেমোক্র্যাটদের এই উদ্যোগের পরিহাস করেছেন। বিভিন্ন সময়ে টুইটে ট্রাম্প বলেন, ডেমোক্র্যাটরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে তার জাতিসংঘ সফর বানচাল করতে এই ধরনের অভিযোগ তুলেছে। ডেমোক্রেটরা দেশের জন্য দুর্নাম নিয়ে আসছে, এটির অনুমোদন দেওয়া উচিত হবে না। তিনি বলেন, হুইসেলব্লোয়ারকে যারাই তথ্য দিয়েছে, তারা অনেকটাই গুপ্তচর।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জোসেফ ম্যাগুয়্যার হাউজ গোয়েন্দা কমিটির সামনে সাক্ষ্য দিয়েছেন। ডেমোক্র্যাটরা এ বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ রয়েছে এমন মানুষকে সাক্ষ্য দেওয়ার আহবান জানিয়েছে। ইতোমধ্যে হাউজ কমিটি সমন জারি করে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওকে নথিপত্র জমা দিতে বলেছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে আরো কিছু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সাক্ষীকে শুনানির জন্য ডাকা হবে। তদন্ত শেষে হাউজের বিচার বিভাগীয় কমিটি একটি ইমপিচমেন্ট আর্টিকেল তৈরি করবে। এটি ওই কমিটিতে পাসের পর হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে পাসের জন্য যাবে। সেখানে পাস হলে এটি সিনেটে যাবে। সিনেটররা জুরি হিসেবে অভিযোগ দেখবেন। সেখানেও নতুন করে শুনানি হতে পারে। এরপর সিনেটররা মতামত দেবেন। প্রেসিডেন্টকে ইমপিচ করতে দুই-তৃতীয়াংশ সিনেটরের সমর্থন লাগবে। যদিও রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত সিনেটে এর সম্ভাবনা ক্ষীণ।
মার্কিন আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ‘ক্রিমিনালিটি’ নয়। তবে ট্রাম্পকে ইমপিচ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জর্জটাউন আইনের অধ্যাপক লুইস মাইকেল সিডম্যান বলেন, ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ রয়েছে। যদি দেখা যায়, প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের জন্য জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ হুমকিতে পড়েছে, সে ক্ষেত্রে এটি প্রেসিডেন্টের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে। তাকে ইমপিচ করতে এটি যথেষ্ট হতে পারে।
