এম এ আলআমিন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এখন আফগানিস্তানে তাদের মিশন গুটিয়ে আনার কাজে হাত দিয়েছে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে হামলার জেরে পরের মাস থেকে দেশটিতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক আগ্রাসন শুরু হয়েছিল। ১৮ বছর পর এখন দেশটিতে ১৪ হাজারের মতো মার্কিন সৈন্য রয়েছে। ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হলো আফগানিস্তানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি আবারো জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তবে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আব্দুল্লাহ আব্দুল্লাহও বলছেন তিনিই হবেন নতুন প্রেসিডেন্ট। দেশটির হাল এখন যিনিই ধরুন তাকে মার্কিন সহায়তা ছাড়াই পথ চলতে হবে বলে মনে হচ্ছে। ২০০১ সালের শেষের দিকের কথা। মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে তালেবান ক্ষমতাচ্যুত। জার্মানির বন শহরে আফগানিস্তান পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা চলছে। তালেবান তখন মার্কিন প্রতিপক্ষের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিল তারা আল কায়েদার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করবে, লড়াই বন্ধ এবং পরবর্তী আফগান সরকারের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি আলোচনায় অংশ নেবে। তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের তখন এমন প্রস্তাব গ্রহণের মতো মনেবৃত্তি ছিল না। স্বাভাবিকভাবে আল-কায়েদার মতো জঙ্গি গ্রুপকে যারা আশ্রয় দিয়েছে তাদের প্রস্তাবে বুশ প্রশাসন কান দেবে না এটাই স্বাভাবিক ছিল।
১৮ বছর পর অবস্থা যেন অনেকটা ঘুরে গেছে। তালেবানের সেই পুরনো প্রস্তাব নিয়েই বিবদমান দুই পক্ষ এখন আলোচনায় বসেছে। আলোচনার ফলে উভয় তরফে একটি শাস্তিচুক্তি হতো। কিন্তু ট্রাম্প সে সম্ভবনা আপতত নাকচ দিয়েছেন। ১৮ বছর আগে তালেবান ছিল যুদ্ধবিধস্ত। কিন্তু এখন তারা আবার শক্তি সঞ্চয় করেছে। তালেবান প্রতিনিধি দলের সঙ্গে মার্কিন বিশেষ দূত জালমে খলিলজাদ কাতারের রাজধানী দোহায় সিরিজ বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকের ফল মোটামুটি ইতিবাচক ছিল। দুপক্ষে চুক্তির খসড়া তৈরি করে ফেলেছিল। তালেবান প্রতিনিধি দলের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের অবকাশ যাপন কেন্দ্র ক্যাম্প ডেভিডে ট্রাম্পের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কাবুলে তালেবান হামলায় কজন মার্কিন সৈন্য নিহত হওয়ার কারণ দেখিয়ে ট্রাম্প ওই বৈঠক বাতিল করে দিয়েছেন।
ট্রাম্পের বৈঠক বাতিলের পর দেশটির ভবিষ্যত নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এক হিসেবে দেখা যায় চলতি বছর বিভিন্ন বিদ্রোহী গ্রুপের হামলায় বছরের প্রথমার্থে ১ হাজার ৩৬৬ জন বেবাসমরিক লোক প্রাণ হারিয়েছেন। হামলায় তালেবান বা অন্যান্য বিদ্রোহী গ্রুপের যত লোক নিহত হয়েছে আফগান নিরাপত্তা বাহিনী ও মার্কিন বাহিনীর তার চেয়ে বেশিসংখ্যক সদস্য মারা গেছে। বিষয়টি আফগান সরকারের জন্য উদ্বেগজনক। তারা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এখনও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল। তালেবান মার্কিন আলোচনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সূত্রে এটাও জানা গেছে যে যে শান্তিচুক্তির জন্য দুই পক্ষ কাজ করে যাচ্ছে তাতে আল-কায়েদা বা আইএসের মতো জঙ্গি গ্রুপকে প্রশ্রয় না দেওয়া এবং আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর হামলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও আফগান সরকারকে লক্ষ্য করে হামলা করা হবে না এমন কথা সেখানে বলা হয়নি। এমনকি দোহা আলোচনায় কাবুলকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। ট্রাম্প ২৪ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে সাধারণ পরিষদের বার্ষিক সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে সাফ জানিয়ে দেন যে, তার দেশ অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে ইচ্ছুক নয়। তার এই বক্তব্য এটি প্রমাণ করে আলোচনা আপতত বন্ধ থাক কিন্তু আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের ব্যাপারে ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারণী মহল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, পরবর্তী আফগান প্রেসিডেন্ট এই চ্যালেঞ্জ নিতে পারবেন কি?
