এতদিনের ক্ষতির দায়ভার কে নেবে

ক্যান্সার সৃষ্টিকারী রেনিটিডিন ওষুধ আমদানি উত্পাদন ও বিক্রি নিষিদ্ধ

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২২:২২

ক্যান্সার সৃষ্টিকারী রেনিটিডিন ওষুধের উত্পাদন, আমদানি ও বিক্রি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছে সরকারের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। গতকাল রবিবার অধিদপ্তর এই ওষুধ সম্পর্কিত সভা শেষে এ সিদ্ধান্তের কথা  জানায়। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, রেনিটিডিনের বেশ কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া আছে। বিদেশে একাধিক গবেষণায় এর প্রমাণ মিলেছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ওধুষ প্রশাসন রেনিটিডিনের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তবে এতদিন যারা ক্ষতিকর এই ওষুধ সেবন করেছেন তাদের ক্ষতির দায়ভার কে নিবেন-এমন প্রশ্ন এখন অনেকের। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের অনেকে মনে করছেন, বাংলাদেশে আশঙ্কজনকহারে ক্যান্সার বৃদ্ধির জন্য এই ওষুধ অন্যতম কারণ।

জানা গেছে, নিম্নমান ও ক্ষতিকর এই ওষুধ প্রেসক্রিপশন করছেন এক শ্রেণির চিকিত্সক। শুধু এই ওষুধ নয়, অকার্যকর অনেক ওষুধ লিখে দিয়ে রোগীদের জীবন হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছেন চিকিত্সকরা। এক্ষেত্রে ওষুধ প্রেসক্রিপশনের জন্য কোম্পানির কাছ থেকে এক শ্রেনির ডাক্তার কোটি কোটি টাকার উপঢৌকন পান। বিদেশ থেকে চোরাই পথে আসা লিভার, ক্যান্সারসহ জীবনরক্ষাকারী ওষুধ শুধু রোগীর ব্যবস্থাপত্রে লিখে প্রতি মাসে বিক্রেতাদের কাছ থেকে ১ লাখ থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত কোন কোন ডাক্তার কমিশন নেন। ৫টি নামিদামি ওষুধ বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ইত্তেফাকের কাছে এর সত্যতা স্বীকার করেছে। শুধুমাত্র টাকার লোভে সাধারণ মানুষকে এভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছেন ডাক্তার নামধারী এই ধরণের চিকিত্সকরা। নরসিংদির একটি সরকারি প্রাইমারি স্কুলের সাবেক শিক্ষক হেলেনা বেগম।              তার ৩০ ভাগ কিডনি কাজ করে। বাকি ৭০ ভাগ কাজ করে না। ঢাকার একজন প্রখ্যাত চিকিত্সকের পরামর্শে সেবা নেন তিনি। ওই চিকিত্সক সঠিক রোগ নির্ণয় করেন এবং সঠিক ব্যবস্থাপত্রও দেন। সেই ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ওষুধ খাওয়ার পর তার অবস্থা অবনতির দিকে যেতে থাকে। এমন প্রেক্ষিতে হেলেনা বেগম উন্নত চিকিত্সকার জন্য থাইল্যান্ডের ব্যাংককে যান। সেখানকার চিকিত্সক রোগীকে জানান, বাংলাদেশের চিকিত্সক আপনার রোগ ঠিকই নির্ণয় করেছেন এবং ওষুধও ঠিক দিয়েছেন। কিন্তু ওষুধের গুণগত মান নিম্নমানের কারণে ওষুধে কাজ হয়নি। একই ওষুধ ব্যাংককের ডাক্তার রোগীকে ব্যবস্থাপত্রে দেন। সেই ওষুধ খেয়ে রোগী এখন সুস্থ।

রেনিটিডিন ওষুধের আবিস্কার হয় লন্ডনে। এই ওষুধে ক্ষতিকর কিছু আছে কিনা সেটা আমেরিকায় গবেষণা চলছে। ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্য এই ওষুধ বাজার থেকে তুলে নিয়েছে। বাংলাদেশে অনেক কোম্পানি বিভিন্ন নামে রেনিটিডিন নামক ওষুধ বাজারজাত করে আসছে। এই ধরনের কোম্পানির মধ্যে দুটি কোম্পানির উত্পাদিত রেনিটিডিন ওষুধে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান রয়েছে বলে ওষুধ প্রশাসন প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে। ওষুধ শিল্প সমিতিও একই দাবি জানায় ওষুধ প্রশাসনের কাছে। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানান, দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার কথা বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ শিল্প সমিতির নেতাদের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা শেষে রেনিটিডিন ওষুধের কাঁচামাল আমদানি উত্পাদন ও বিক্রির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। তিনি জানান, বর্তমানে বাংলাদেশের ৩১টি ওষুধ কোম্পানি প্রতিবেশী দেশ ভারতের ফারাক্কা নামক একটি কোম্পানি থেকে রেনিটিডিন ট্যাবলেটের কাঁচামাল আমদানি করে। এছাড়া ডক্টর রেড্ডি নামক আরেকটি কোম্পানির কাঁচামাল আমদানির জন্য ব্ল্যাকলিস্টে তালিকাভুক্ত থাকলেও সেখান থেকে এখনো আমদানি করা হয়নি। জনস্বার্থ বিবেচনায় এ দুটি কোম্পানি থেকে রেনিটিডিনের কাঁচামাল আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়। এছাড়া ওই কোম্পানি থেকে আমদানিকৃত কাঁচামাল দিয়ে নতুন করে কোনো রেনিটিডিন উত্পাদন করা যাবে না। শুধু তাই নয়, বাজার থেকে কোম্পানিগুলো স্ব-উদ্যোগে রেনিটিডিন ট্যাবলেট প্রত্যাহার করে নেবে।

ওষুধ শিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এম শফিউজ্জামান ইত্তেফাক বলেন, নেতারা জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় নিয়ে স্বপ্রণোদিতভাবে বাজার থেকে রেনিটিডিন প্রত্যাহার, নতুন করে কাঁচামাল আমদানি ও উত্পাদন না করার ব্যাপারে সর্বসম্মত হন। কোম্পানিগুলো বাজার থেকে রেনিটিডিন নমুনা সংগ্রহ করে নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে ক্ষতিকর কিছু আছে কিনা তা দেখে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরকে অবহিত করবে। এছাড়া অধিদফতর নিজস্ব উদ্যোগে রেনিটিডিন ট্যাবলেটের গুণগত মান পরীক্ষা করবে।

উল্লেখ্য, বিশ্বের শীর্ষ ওষুধ প্রস্তুতকারী বৃটিশ সংস্থা গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন (জিএসকে) গ্যাস্ট্রিকের চিকিত্সায় একসময় বহুল সেবনকৃত রেনিটিডিন ট্যাবলেটে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদানের উপস্থিতির কারণে বিশ্ববাজার থেকে ওষুধটি তুলে নেয়ার ঘোষণার কারণে বাংলাদেশও এই ওষুধ বিক্রি নিষিদ্ধ করলো। ভারতের ইংরেজি দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বিশ্বের শীর্ষ ওষুধ প্রস্তুতকারী বৃটিশ সংস্থা গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন (জিএসকে) গ্যাস্ট্রিকের চিকিত্সায় একসময় বহুল সেবনকৃত রেনিটিডিন ট্যাবলেটে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদানের উপস্থিতির কারণে বিশ্ববাজার থেকে ওষুধটি তুলে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ইতোমধ্যে ভারতের বাজার থেকেও রেনিটিডিন গ্রুপের ‘জ্যানটেক’ নামের এই ট্যাবলেট প্রত্যাহারের বিষয়ে নিশ্চিত করেছে কোম্পানিটি। রেনিটিডিন ছাড়াও একই ব্র্যান্ডের রেনট্যাক, রেনট্যাক-ওডি, আর-লক, রেনিটিনও গ্যাসের ট্যাবলেট হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। বিশ্বের বাজার থেকে বৃটিশ ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন রেনিটিডিন তুলে নিলেও অন্যান্য সংস্থা গ্যাসের চিকিত্সার এই ওষুধ তুলে নিচ্ছে কি-না সে ব্যাপারে এখন পর্যন্ত পরিষ্কার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে রেনিটিডিন গ্রুপের অন্যান্য ট্যাবলেট স্বেচ্ছায় প্রত্যাহার করে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা স্যানডোজ। গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইনের এক মুখপাত্র বলেন, নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ ও প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্ববাজারে রেনিটিডিন উত্পাদন, বাজারজাত ও সরবরাহ স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।