ত্রাণের টাকায় দুর্গত এলাকায় গেছেন মন্ত্রীরা :টিআইবি

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২২:২২

সরকারের ত্রাণ তহবিলের টাকায় মন্ত্রীদের বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শনের অভিযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। এছাড়া বন্যাদুর্গত এলাকায় রাজনৈতিক বিবেচনায় ত্রাণ দেওয়া, স্বজনপ্রীতি, ত্রাণে চাল কম দেওয়া, একই পরিবারকে একাধিকবার ত্রাণ দেওয়াসহ নানা অনিয়মের কথা উঠে এসেছে সংগঠনটির এক গবেষণায়। গতকাল রবিবার ধানমন্ডিস্থ টিআইবি কার্যালয়ে ‘বন্যা ২০১৯ মোকাবিলায় প্রস্তুতি এবং ত্রাণ কার্যক্রমে শুদ্ধাচার পর্যবেক্ষণ’ বিষয়ক গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।

গবেষণায় বলা হয়, এ বছরের বন্যায় দেশের উত্তরাঞ্চল ও সিলেট অঞ্চলের ২৮ উপজেলার মানুষের ক্ষয়ক্ষতি    ১৯৮৮ সালের ক্ষয়ক্ষতিকেও ছাড়িয়ে গেছে। এর বিপরীতে সরকারি সহায়তা ছিল নগণ্য। ত্রাণ বিতরণে ছিল বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের তালিকা করা হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনা ও স্বজনপ্রীতি করে। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। জনপ্রতিনিধিদের প্রত্যাশিত ভূমিকা ছিল অনুপস্থিত। কোনো কোনো এলাকায় ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা অধিকতর ক্ষতিগ্রস্তদের বাদ দিয়ে আত্মীয়স্বজনের তালিকা প্রণয়ন করেছেন। দুর্গত মানুষের মধ্যে মাথাপিছু বরাদ্দের চেয়ে কম ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। জিআর চাল ১০ কেজির বদলে তিন থেকে আট কেজি করে দেওয়া হয়েছে। আবার কাউকে কাউকে দুইবারও দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যার সময় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারপিছু ত্রাণ বরাদ্দ ছিল চার থেকে ৭৬ টাকা পর্যন্ত। বন্যার পর সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত ঘরপ্রতি গড়ে ২০ থেকে ৭৭২ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। ত্রাণ পরিবহনে বরাদ্দ না থাকায় অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে তা মেটানো হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে চালের বস্তা পরিবহনে সরকারি বরাদ্দ না থাকার অজুহাতে চেয়ারম্যানরা ক্ষতিগ্রস্তদের নির্ধারিত বরাদ্দের চেয়ে কম চাল দিয়েছেন। আশ্রয়কেন্দ্রে বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের জন্য উপযোগী ব্যবস্থা ছিল না। বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের ঘাটতি ছিল।

গবেষণা প্রতিবেদনে বন্যা মোকাবিলা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সরকারের গৃহীত কিছু পদক্ষেপের প্রশংসাও করা হয়েছে। যেমন বন্যার আগে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর থেকে নদীর পানি বৃদ্ধি ও বন্যার পূর্বাভাস সংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হয়েছে। বন্যার সময় জরুরি ভিত্তিতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের তহবিল ব্যবহার করে শুকনা খাবার, স্যালাইন ইত্যাদি বিতরণ করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বেড়েছে। তবে ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। এনজিওগুলো তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেনি। ক্ষেত্রবিশেষ তারা নিজেদের উপকারভোগীদের বেশি সহযোগিতা করেছে। মন্ত্রীরা বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন করবেন তাদের কাজের অংশ হিসেবে। তবে কোথাও কোথাও মন্ত্রীর পরিদর্শন ব্যয় মেটানো হয়েছে ত্রাণের বরাদ্দ থেকে।

এ বছর বন্যায় ২৮টি উপজেলায় স্থানভেদে ৪০ লাখ মানুষ ১০ থেকে ১৫ দিন পানিবন্দি ছিল। সরকারি হিসাবে ১০৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে, বেসরকারি হিসাবে যা ছিল ১১৯। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ছিল ৯৮ হাজার ৬৮৮টি, আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ১৩ লাখ ৬০ হাজার ১২০টি। বন্যা মোকাবিলা ও ত্রাণ কর্মকাণ্ড পরিচালনায় শুদ্ধাচারের ঘাটতি পূরণে ১৮ দফা দাবি সুপারিশ করেছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি।

সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন টিআইবির উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার এস এম জুয়েল প্রমুখ। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন জলবায়ু অর্থায়নে পলিসি ও ইন্টিগ্রিটি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মাহ্ফুজুল হক এবং জলবায়ু অর্থায়নে সুশাসন বিভাগের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. নেওয়াজুল মওলা।