আশুলিয়া ক্রাইম জোনে পরিণত!

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০৪

সাভার উপজেলার আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। প্রতিদিনই এখানে জনবসতি বাড়ছে। আর মানুষ বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। এলাকাবাসী প্রশ্ন তুলছেন পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে। সন্ত্রাস, মাদক, ভূমি দখল, খুন, ছিনতাই, ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ প্রায় প্রতিদিনই ঘটে থাকে এখানে। শিল্পাঞ্চল আশুলিয়া এখন যেন এক ক্রাইম জোনে পরিণত হয়েছে।

আশুলিয়া এলাকায় ডিইপিজেডে পাঁচ শতাধিক ছোটো-বড়ো মিলকারখানা, বিনোদন কেন্দ্রসহ সরকারি ও বেসরকারি বহু প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ফলে এ অঞ্চলে জনবসতির সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। আশুলিয়া থানা এলাকাটি চারটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হলেও জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। আশুলিয়া থানা এলাকায় ৩০ লাখের অধিক মানুষের বসবাস। প্রতিদিনই এর সংখ্যা বাড়ছে। এ অঞ্চলে ভাসমান ও বহিরাগত বেশি হওয়ায় এরা কোনো অপরাধ করে সটকে পড়লে ধরা কিংবা শনাক্ত করা অনেক ক্ষেত্রেই  প্রশাসনের পক্ষে সম্ভব হয় না। 

এখানে জমি দখল, ঝুট ব্যবসা নিয়ে রয়েছে একাধিক সিন্ডিকেট। এসব সিন্ডিকেট অর্থের বিনিময়ে মানুষের জমি বেদখল করে থাকে। এই অঞ্চলের সরকারি সম্পত্তি বিশেষ করে বন বিভাগের জায়গা একটি শক্তিশালী ভূমি দখলদার চক্র জাল কাগজপত্র তৈরি করে গ্রাস করে ফেলেছে। জমির দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় জমি নিয়ে প্রতারণার ঘটনাও ঘটছে বেশি। বিবদমান সম্পত্তির বিরোধ মীমাংসার ক্ষেত্রে প্রশাসনও বাড়তি সুবিধা আদায় করে থাকে। ফলে অনেকেই জমি কিনে ও জালিয়াতির খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন।

আশুলিয়া অঞ্চলে প্রায় প্রতিদিনই উদ্ধার হচ্ছে নারী কিংবা পুরুষের মরদেহ। উদ্ধারকৃত লাশের অধিকাংশই অজ্ঞাতনামা। পুলিশের ধারণা, কোনো সন্ত্রাসী চক্র অন্যত্র হত্যার পর এ অঞ্চলে লাশ ফেলে যায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে নিহতের পরিচয় এবং হত্যাকারীদের গ্রেফতার করা সম্ভব হচ্ছে না।

গত বৃহস্পতিবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের বিপরীতে ডেইরি গেটের পাশ থেকে রবিউল ইসলাম রবিন (২৫) নামে এ যুবকের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। রবিন হানিফ পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার হিসেবে বাইপাইলে কর্মরত ছিলেন। তার বুকে, মাথায়, চোখে ও কপালেসহ শরীরের  বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ার পলাশবাড়ি এলাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে অজ্ঞাত এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। আশুলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রামকৃষ্ণ জানান, নিহত যুবকের মুখে ফেনা লেগে ছিল।

গত দুই মাসে আশুলিয়া এলাকায় এক ডজনের অধিক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। পোশাক কারখানার নারী শ্রমিকরা প্রতিনিয়তই যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ৯ সেপ্টেম্বর সোমবার দিবাগত রাতে উপজেলার উত্তর গাজীরচট ভুঁইয়াপাড়া মহল্লার ফজল ভুঁইয়ার মালিকানাধীন ভাড়াবাড়িতে এক পোশাক শ্রমিক দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী নারী শ্রমিক আশুলিয়া থানায় মামলা দায়ের করলে রাতেই অভিযান চালিয়ে ধর্ষক কাইয়ূম ও তুহিন আলমকে আটক করে পুলিশ। একই দিন উত্তর গাজীরচট এলাকার একটি পরিত্যক্ত কারখানায় চাকরি দেওয়ার কথা বলে এক তরুণীকে ডেকে নেয় শারফিন নামে এক গাড়িচালক। পরে তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে সেখানে আটকে রেখে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় তরুণীর অভিযোগের ভিত্তিতে রাতেই গাজীরচট এলাকায় অভিযান চালিয়ে শারফিনকে আটক করে পুলিশ।

এর আগে ১৭ আগস্ট আশুলিয়ার ডেন্ডাবর এলাকার নতুনপাড়া মহল্লায় এক উপজাতি গৃহবধূ নিজ বাসায় গণধর্ষণের শিকার হন। এছাড়া আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে একটি প্রতারক চক্র দীর্ঘদিন যাবত্ নারী দিয়ে প্রতিপক্ষ কিংবা প্রভাবশালীদের ফাঁসিয়ে অর্থ আদায় করে আসছে। মানসম্মানের ভয়ে অনেকে এ চক্রের শিকার হয়েও মুখ খুলছেন না। এ প্রতারক চক্রের সঙ্গে পুলিশের কতিপয় অসত্ সদস্যও জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার কিংবা প্রতারিত ব্যক্তি অভিযোগ করতে চাইলেও অপরাধীরা প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় থাকার কারণে ভয়ে টু শব্দটিও করে না। প্রশাসন অপরাধ সংগঠিত হয়েছে জেনেও ‘অভিযোগ পাওয়া যায়নি’ অজুহাতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ থেকে বিরত থাকে। ফলে অপরাধ করেও অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে মিলকারখানার ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রায়শই সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।  

এদিকে মাদকে ছেয়ে গেছে গোটা এলাকা। ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক ব্যবসা করে অনেকেই আজ কোটিপতি বনে গেছে। মাদকের ছোবলে যুবসমাজ ক্ষতবিক্ষত। অনেক গার্মেন্টস ও পোশাক কারখানায় নারী শ্রমিকদের কৌশলে ব্ল্যাকমেইল করে ধর্ষণ ও যৌন ব্যবসায় বাধ্য করছে একটি চক্র। ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে অনেকে দেহব্যবসা চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্যে স্থানীয় অনেক শিল্প মিলকারখানার মালিকরাও আতঙ্কিত। এসব সন্ত্রাসী স্ব-স্ব এলাকার প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে স্থানীয় মিলকারখানা থেকে প্রতিমাসে মোটা অঙ্কের টাকা চাঁদা আদায় করছে। ব্যবসা চালানোর স্বার্থে মালিকরা এ সমস্ত নেতা কিংবা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মুখ খোলেন না। আশুলিয়ার বিভিন্ন সংযোগ সড়কে গণপরিবহনে চাঁদাবাজি এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতাসীন প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় এলাকার সন্ত্রাসী যুবকরা এ চাঁদা আদায় করে থাকে।

ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) সাইদুর রহমান বলেন, সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান। প্রতিটি অপরাধেরই তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে জিরো টলারেন্সে প্রশাসন।