মুন্সীগঞ্জ হানাদার মুক্ত দিবস আজ। ১৯৭১ এর এই দিনে হানাদার বাহিনীমুক্ত হয়েছিল এই জনপদ। দিবসটি পালনে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও প্রশাসন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
১৯৭১-এ রক্তঝরা দিনগুলোতে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো মুন্সীগঞ্জ জেলার মানুষও গর্জে উঠেছিল। ২৯ মার্চ হরগঙ্গা কলেজের তত্কালীন অধ্যক্ষ আব্দুল মান্নান কলেজের শহীদ মিনারে সংগ্রামী ছাত্র-জনতার সম্মুখে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। ঐদিনই ছাত্র-জনতা মুন্সীগঞ্জ অস্ত্রাগার লুট করে এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে। মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটি হিসেবে মুন্সীগঞ্জের প্রতি পাক-সেনাদের তীক্ষ দৃষ্টি ছিল। তা ছাড়া মুন্সীগঞ্জ ঢাকার সন্নিকটে হওয়ায় পাক বাহিনী এলাকাটিকে দখলে রাখতে চেয়েছিল। পাক বাহিনী যাতে সেখানে ঘাঁটি গাড়তে না পারে সেজন্য ধলেশ্বরী তীর এলাকায় বাংকার তৈরি করে মুক্তিবাহিনী পূর্ব প্রস্তুতি নিয়েছিল। তবে পাক বাহিনী মুন্সীগঞ্জ শহরে প্রবেশ করে পয়লা মে। এরপরই চালায় ধ্বংসযজ্ঞ।
হরগঙ্গা কলেজে ছিল মুন্সীগঞ্জে হানাদার বাহিনীর প্রধান ক্যাম্প। কলেজটি নারকীয় নানা তাণ্ডবের সাক্ষী। কলেজের পূর্বপাশের বধ্যভূমিতে নির্মাণ হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ। নির্যাতন-হত্যা ছাড়াও অসংখ্য নারী সম্ভ্রম হারায় এখানে। ক্যাম্পে বসেই নীলনক্সা করে ক্যাপ্টেন সিদ্দিকীর নেতৃত্বে হানাদার বাহিনী। অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, হত্যাসহ ধ্বংসযজ্ঞ চালায় তত্কালীন মহকুমা জুড়ে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। ক্রমেই কোণঠাসা হতে থাকে পাক বাহিনী।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক জেলা কমান্ডার আনিস-উজ-জামান জানান, পাক বাহিনী ’৭১ এর ৯ মে হানাদার বাহিনী ও রাজাকাররা ৩৬০ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
শহীদ পরিবারের সদস্য দিপালী মুখার্জী জানান, ১৪ মে শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার উত্তরে কেওয়ার চৌধুরী বাড়িতে হানা দেয়। রাজাকারদের নিয়ে ভোররাতে বাড়িটি ঘেরাও করে সাতানিখিল খালের ধারে লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে গণহত্যা চালায়। শহীদ হন শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তি অনিল মূখার্জি, কেদারেশ্বর চৌধুরী, ডা. সুরেন্দ্র সাহা, দ্বিজেন্দ্র সাহা, বাদল ভট্টাচার্য্য, সচীন্দ্র মূখার্জী ও সুনীল মূখার্জীসহ বেশ কয়েকজন। লাশ খালে ভেসে যাওয়ায় স্বজনরা লাশ আনতেও পারেননি। এছাড়া আব্দুল্লাপুরের পাল বাড়িতে গণহত্যা চালায় পাকবাহিনী।
গোয়ালী মান্দ্রা যুদ্ধ এবং রামেরগাঁও যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের বড় বিজয় হয়। এছাড়া আব্দুল্লাপুরে মাদানীকে হত্যা করে মুক্তিযোদ্ধারা। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার এম এ কাদের মোল্লা জানান, মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে বারবার পাকবাহিনী পরাভূত হয়। পাক বাহিনীর নারকীয় তাণ্ডব ও গণহত্যার প্রতিবাদে তুমুল প্রতিরোধ গড়ে তোলে মুন্সীগঞ্জবাসী। অবশেষে মুক্তিযোদ্ধাদের শক্ত প্রতিরোধের মুখে ’৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর গভীর রাতে হানাদার বাহিনী শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়। গা-ঢাকা দেয় পাক বাহিনীর দোসর রাজাকাররাও। আর ১১ ডিসেম্বর কাক ডাকা ভোরে মুন্সীগঞ্জের আকাশে ওড়ে বিজয় কেতন। মুক্ত হয় মুন্সীগঞ্জ।
দিবসটি উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টায় শহরে বিজয় শোভাযাত্রা বের হবে। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ এবং জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়ের সামনের প্রধান সড়কে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এতে সভাপতিত্ব করবেন জেলা প্রশাসক ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা কামান্ডার সায়লা ফারজানা। এতে বিশিষ্টজনরা উপস্থিত থাকবেন।
