সাকিলা মতিন মৃদুলা
সেবাপ্রদানকারী হিসেবে নার্সদের সম্পর্কে আমরা সবাই কম-বেশি অবগত। কিন্তু মিডওয়াইফ সেবা? সারা বাংলাদেশের উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোয় মা ও নবজাতক শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ করে যাচ্ছেন মিডওয়াইফরা। অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান প্রতিরোধ মিডওয়াইফদের অন্যতম মূল দায়িত্ব। একজন মা গর্ভধারণের পর থেকে শুরু করে সন্তান প্রসব পরবর্তী চার মাস পর্যন্ত মিডওয়াইফের তত্ত্বাবধানে থাকেন।
মিডওয়াইফরা তাদের পেশাদারি মনোভাব, কঠোর পরিশ্রম, প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা এবং বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বিভিন্ন কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করে গর্ভবতী নারী এবং নবজাতক সন্তানের নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করে। মাতৃমৃত্যু এবং নবজাতকের মৃত্যুর হার কমানোর জন্য মিডওয়াইফদের সেবা রয়ে যাচ্ছে সবার অলক্ষ্যে। তিন বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি কোর্স সম্পন্ন থাকার কারণে মিওয়াইফরা এখন আরো বেশি আত্মবিশ্বাসী। নিজ কর্মস্থলে সেবা দেওয়ার পাশাপাশি তারা প্রয়োজনে যেখানে দরকার সেখানেই সেবা দিতে প্রস্তুত থাকেন।
সায়েদা মাহফুজ আখতার (ঝুমু) বাংলাদেশ মিডওয়াইফারি সোসাইটি (বিএমএস)-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট। ছুটির দিনে গ্রামের বাড়িতে অবসর সময়েও সেবাদানে দ্বিধা করেননি তিনি। ছোট বোনের মাধ্যমে ঝুমু জানতে পারেন প্রতিবেশী এক গর্ভবতী মায়ের ব্যথা উঠেছে এবং অবস্থা খুব গুরুতর। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবেশীর বাড়িতে চলে যায় ঝুমু। কিন্তু সেখানে থাকা বয়স্ক মহিলারা তাকে দায়িত্ব পালনে বাধা দেন। তারা বলেন, এমন জটিল অবস্থায় তািন কোনো সাহায্য করতে পারবেন না। গর্ভবতী মহিলার তখন খুব খারাপভাবে রক্তপাত হচ্ছিল। রীতিমতো চ্যালেঞ্জ নিয়ে ঝুমু তার দায়িত্বে অনড় থাকেন।
অনেক বোঝানোর পর বাড়ির মুরুব্বিরা তাকে গর্ভবতী মায়ের কাছে যেতে অনুমতি দেন। মিডওয়াইফ হিসেবে কাজ করছি, মিডওয়াইফ হিসেবে ট্রেনিং আছে— এগুলো বলার পরও তারা আশ্বস্ত হতে পারছিলেন না। কারণ, তারা মিডওয়াইফ পেশাটার সঙ্গে পরিচিত নন।
ঝুমু ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘আমি সঙ্গে সঙ্গে মায়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলাম এবং বুঝতে পারলাম যে তার খুব খারাপভাবে রক্তপাত হচ্ছে। কারণ প্লাসেন্টা ঠিক ছিল না। আমি আমার গ্লাভস পরে নিই এবং ম্যানুয়ালই প্লাসেন্টা রাতে সক্ষম হই। আমার সঙ্গে কোনো অক্সিটোসিক ওষুধ ছিল না, কিন্তু আমি জানতাম যে গর্ভাবস্থায় কীভাবে ম্যাসাজ করতে হয় এবং রক্তপাত বন্ধ করা যায়। আমি মহিলা ও তার পরিবারকে বুঝিয়ে বললাম যে, রক্তপাত বন্ধ হয়ে গেলেও তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি। কারণ, রক্তপাতের কারণে তার শরীর খুব দুর্বল হয়ে গেছে। সেই পরিবারটি আমার তাত্ক্ষণিক সেবা পেয়ে খুব খুশি হলো এবং আমার পরামর্শ মতো হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করল।’
ঝুমুর গ্রামের লোকদের মিডওয়াইভদের সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। সেদিনের পর ঝুমুর কাজের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রসবকালীন সময়ে তথাকথিত ‘দাই মা’ এর সেবা গ্রহণের পরিমাণ কমে যায়। বাংলাদেশ মিডওয়াইফারি সোসাইটি (বিএমএস)-এর প্রেসিডেন্ট মমতাজ বেগম জানান, ‘মিডওয়াইফদের কাজের অনেক বেশি প্রচারণা দরকার, যেন এই সেবামূলক পেশায় আরো অনেক বেশি নারী আগ্রহী হয়।’ নার্সদের পোশাক যেমন পরিচিত হয়ে গেছে। একইভাবে মিডওয়াইফদের পোশাকটাও পরিচিত করে তুলতে হবে। গোলাপি পোশাক মানেই বিপদের বন্ধু মিডওয়াইফ। আগে আমাদের দেশে কোনো মিডওয়াইভ ছিল না বলে অনেক দরিদ্র পরিবারের মহিলারা অভিজ্ঞ কারো উপস্থিতি বা ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা ছাড়াই নিজ বাড়িতে সন্তান প্রসব করতেন। গরিব পরিবারের মহিলা মাত্রই সন্তান প্রসবকালে অকালে মারা যেতেন। দরিদ্র পরিবারে প্রসবকালীন মাতৃমৃত্যু এবং শিশুমৃত্যুর হার কমাতে মিডওয়াইফরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ।
