আহমেদ শরীফ
যানজট কিছুটা এড়াতে মগবাজার হয়ে কাওরানবাজার যাচ্ছিলাম অফিসের উদ্দেশে। বাসে থাকা অবস্থায় মালিবাগ এলাকায় সিগনাল পড়ল। হঠাত্ পাশে গড়ে ওঠা ফ্লাইওভারের পিলারে দেখলাম বড়ো আকারের একটি পোস্টার। তাতে লেখা ভিকারুন্নিসা নুন স্কুল এন্ড কলেজের অভিভাবক প্রতিনিধি নির্বাচন। পোস্টারে বিশাল এক ছবিসহ প্রার্থী ভোট চাইছেন। আরেকটু সামনে দেখলাম আরো বড়ো এক পোস্টার। এক মহিলা ভিকারুন্নিসা নুন স্কুল এন্ড কলেজের ঐ গভর্নিং বডির নির্বাচনে ভোট চাইছেন। ফ্লাইওভারের আরেকটি পিলারে দেখলাম পুলিশ সুপার অভিভাবক হিসেবে গভর্নিং বডিতে নির্বাচিত হতে পোস্টার সাঁটিয়েছেন। অদ্ভুত লাগল বিষয়টা। একটা স্কুলের অভিভাবক প্রতিনিধি বা গভর্নিং বডি নির্বাচন কি বিরাট কিছু? এ যেন সংসদ নির্বাচনের মতোই ব্যাপার! এটা কি বিশাল কোনো ক্ষমতার পদ? এখানে আর্থিক কোনো বিষয় কি মূখ্য? এমন প্রশ্ন উঠে আসতেই পারে। ঢাকার সব স্কুলেই তো এখন ভর্তি বাণিজ্য রমরমা। সেটা অন্য এক সমস্যা। প্রায় সব ক্ষেত্রেই দেখা যায় আমরা আসলে জাতি হিসেবে কতটা দলবাজ। আমরা রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায় যেমন থাকতে চাই, তেমনি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনেও না জড়ালে যেন প্রেস্টিজইস্যু হয়ে যায়। কত শত সংগঠন, সমিতি যে আছে এ দেশে, তা এক গবেষণার বিষয়। আইনজীবী, ডাক্তার, সাংবাদিক, অভিনয় শিল্পী, সর্বস্তরের কর্মজীবী মানুষও কোনো না কোনো সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। সেসব সংগঠনে আবার নিয়মিত হই-চই করে নির্বাচনও হয়। সেসব নির্বাচন নিয়ে নোংরা রাজনীতি, দুর্নীতি দিন দিন যেন সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সেটাও এক বিরাট আনন্দের বিষয়। স্কুলকলেজের পুরোনো বন্ধুদের নিয়ে সংগঠন, সে সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রতি বছর বনভোজন, নানা অনুষ্ঠানে চাঁদা সংগ্রহ, এসব এখন কমন বিষয় হয়ে গেছে। আমি ঠিক জানি না অন্য সব শ্রমজীবী লোকদের মতো কামার-কুমার বা মুচিদেরও নিজস্ব কোনো সংগঠন আছে কি না। থাকতেও পারে। আমরা স্বভাবজাত কারণেই দলবদ্ধ হতে চাই। হয়তো অধিকার আদায়ের লক্ষ্যেই এই দলবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করি আমরা। মূলকথা বাঙালি দলবাজ, দল তাকে করতেই হবে। তা সেটা সামাজিক হোক বা রাজনৈতিক। আর বিভিন্ন দল বা সংগঠনের গর্বিত সদস্য হয়ে সব ধরনের ফায়দা লুটতেও ভুলে না অনেকে।
সে কারণে দেশের প্রায় সব জেলাতেই মসজিদ কমিটি, মন্দির কমিটি, মাজার কমিটি, স্কুলকলেজ কমিটি, বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি গঠন নিয়ে দ্বন্দ্ব, সংঘর্ষের ঘটনাও কম হয় না। এক্ষেত্রে যারা কোনো দল বা সংগঠনের সঙ্গে নেই, তারা অনেকটাই বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো, অসামাজিক। তবে সাংবাদিকদের যেসব সংগঠন রয়েছে, আমার মনে হয় সেসব সংগঠন এ যাবত্ সাংবাদিকদের সার্বিক উন্নয়নে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। নইলে প্রিন্ট মিডিয়া ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার আজ এমন বেহাল অবস্থা হতো না। এখানেও জাতি হিসেবে আমরা দলবাজ বলেই সাংবাদিকরা শুধু দলবদ্ধ হওয়ার জন্য একজোট হচ্ছেন বলেই মনে হয়।
n লেখক :সাংবাদিক
