‘তোমরা কত টাকা দেওয়ার জন্য রেডি?’

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০১৯, ২২:৩২

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) আইন বিভাগে প্রভাষক নিয়োগে নির্বাচনী বোর্ডের একজন আবেদনকারীকে অর্থের বিনিময়ে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে উপ-উপাচার্য চৌধুরী মোহাম্মদ জাকারিয়ার কথোপকথন ফাঁস হয়েছে। আবেদনকারীর স্ত্রীর সঙ্গে দর-কষাকষির ঐ অডিওতে উপ-উপাচার্য জানতে চেয়েছেন কত টাকা দিতে তারা (চাকরিপ্রার্থী ও তার স্ত্রী) প্রস্তুত আছে।

ফোনালাপটিতে দেখা যায়, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মোহাম্মদ জাকারিয়া চাকরি প্রার্থী নুরুল হুদার স্ত্রী সাদিয়াকে কল দিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে কথা          বলছেন। নুরুল হুদার স্ত্রীও আইন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।

‘উপ-উপাচার্য : হ্যাঁ, তুজ সাদিয়া। আমি প্রফেসর জাকারিয়া (চৌধুরী মোহাম্মদ জাকারিয়ার), প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর।

চাকরি প্রত্যাশীর স্ত্রী : আসসালামু আলাইকুম, স্যার।

উপ-উপাচার্য : ওয়ালাইকুম আস সালাম। আচ্ছা মা, একটা কথা বলত, আমার খুব শুনতে ইচ্ছা, তোমরা কয় টাকা দেওয়ার জন্য রেডি।

চাকরি প্রত্যাশীর স্ত্রী : স্যার, সত্যি কথা বলতে...

উপ-উপাচার্য : না না, সত্যি কথাই তো বলবা। উপরে আল্লাহ তায়ালা, নিচে আমি।

চাকরি প্রত্যাশীর স্ত্রী : অবশ্যই, অবশ্যই। স্যার, আপনি যেহেতু তার অবস্থা জানেন, আরেকটা বিষয় এখানে স্যার, সেটা হচ্ছে, আপনি হুদার... মানে, এমনিতে সে কতটা স্ট্রিক প্রিন্সিপালের..., আপনি বোধহয় এটাও জানেন স্যার, একটু রগচটা ছেলে।

উপ-উপাচার্য : আচ্ছা রাখো রাখো, এখান থেকে কথা বলা যাবে না।”

আবেদনকারী নুরুল হুদার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়টি নিয়ে বিরক্ত। এ নিয়ে আমি কোনো কথা বলব না।’ তবে নুরুল হুদার স্ত্রীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

দর-কষাকষির বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য চৌধুরী মোহাম্মদ জাকারিয়া বিষয়টি এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, ‘এসব সাজানো। এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না। আমি আজ থেকে ফোনে কোনো কথা বলব না।’

তবে এ বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন অনলাইন নিউজ পোর্টালে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর তিনি প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়ে একটি বিবৃতি দেন। নুরুল হুদার পরিচয় উল্লেখ করে সেখানে তিনি বলেন, ‘নুরুল হুদার ছাত্রজীবন থেকেই স্থানীয় অভিভাবক হিসেবে তার দেখভাল করছি। বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পারি, সে অসাধু কিছু ব্যক্তির কবলে পড়ে আর্থিক লেনদেনে জড়িয়ে পড়েছে। ফোনালাপটি অসাধুব্যক্তিদের সম্পর্কে একটি অধিকতর অনুসন্ধানী প্রয়াস ছিল। ফোনালাপটি এডিটিং করা হয়েছে যা উদ্দেশ্যপ্রণেদিত।’

গত ২০১৮ সালের ৮ জুলাই আইন বিভাগে তিনটি ‘সহকারী অধ্যাপক/প্রভাষক’ পদের জন্য প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বিপরীতে মোট ৪১ জন আবেদন করেন। তাদের মধ্যে ৯ জনের স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ে সিজিপিএ ৩.৫০ বা এর ঊর্ধ্বে ফল রয়েছে। অন্যদিকে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ৩৩ জন আবেদনকারী ফল ৩.৫০ বা এর ঊর্ধ্বে। ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসের ১৩ তারিখ নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ১৭ নভেম্বর সিন্ডিকেট সভায় নিয়োগ অনুমোদিত হয় এবং পরদিন  নিয়োগপ্রাপ্তরা বিভাগে যোগদান করেন।

এতে নুরুল হুদাও আবেদন করেন। তিনি ওই বিভাগের ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। স্নাতকে সিজিপিএ ৩.৬৫, স্নাতকোত্তরে ৩.৬০ এবং আইন অনুষদে সেরা হওয়ায় ২০১৭ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় স্বর্ণপদক এবং ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক অর্জন করেন। তার বাড়ি উপ-উপাচার্য জাকারিয়ার এলাকা লালমনিরহাটে। স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ে বিশেষ কৃতিত্বপূর্ণ ফল অর্জনের স্বীকৃতি স্বরূপ প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্ববিদ্যালয় স্বর্ণপদক পেলেও আইন বিভাগে প্রভাষক পদে তার নিয়োগ হয়নি।

এদিকে এ নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ‘সাজানো নাটক’ বলছেন খোদ নিয়োগ বোর্ডের সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্যরা। নিয়োগের নির্বাচনী বোর্ডের সদস্য ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহজাহান মণ্ডল বলেন, ‘আমি যখন নির্বাচনী বোর্ডে অংশ নিতে সেখানে যাই, তখন ঐ বিভাগের কয়েকজন শিক্ষক আমাকে সতর্ক করেছিলেন। এই নিয়োগে আর্থিক লেনদেন হতে পারে বলে তারা আমাকে জানিয়েছিলেন।’