আনোয়ারা বেগম (১৪) এর বন্ধুরা যখন আসন্ন জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত ছিলো, তখন আনোয়ারাও ব্যস্ত ছিলো তার নিজের বউ সাজা নিয়ে। আনোয়ারার বাবা সাহাব মিয়া আনোয়ারার বিয়ের ফর্দ ঠিক করেছে, বিয়ের কেনাকাটা শেষ করেছে, ডেকোরেশানের লোকজনের সাথে কথা বলেছে এবং স্বজনদের দাওয়াত দেওয়ার পর্বটাও গুছিয়ে এনেছে। ৩০ সেপ্টেম্বর আনোয়ারার বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার এসিল্যান্ড পদ্মাসন সিংহের ব্যতিক্রমী উদ্যোগে বাল্যবিয়ের সব আয়োজন ভেস্তে যায়। আনোয়ারা তার বন্ধুদের সাথে জেএসসি দেওয়ার সুযোগ পায়।
এসিল্যান্ড পদ্মাসন সিংহ উপজেলার চুনতি মেহেরুন্নেছা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাশেদুল হকের মাধ্যমে জানতে পারেন, উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের দক্ষিণ সাতগড় এলাকার পাটিয়াল পাড়ার সাহাব মিয়া তার আষ্টম শ্রেণির পড়ুয়া মেয়ে আনোয়ারা বেগমের বিয়ের তোড়জোড় শুরু করেছে। আনোয়ারা চুনতি মেহেরুন্নেছা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে জেএসসি পরীক্ষার ফরম ফিলাপও করে। বিষয়টি এসিল্যান্ড জানার পর আনোয়ারার বাবা সাহাব মিয়াকে ডেকে পাঠান এবং বাল্যবিয়ের কুফল নিয়ে কথা বলে মোটিভেট করেন। মেয়ের বয়স আঠারো বছর পূর্ণ নাহওয়া পর্যন্ত সাহাব মিয়া বিয়ে দেবে না এসিল্যান্ডের কাছে অঙ্গীকার করেন। পরের দিন সাহাব মিয়া মেয়েকে নিয়ে বিদ্যালয়ে যান এবং নিজের ভুল স্বীকার করে মেয়ের বাল্যবিবাহ ঠিক করার জন্য অনুশোচনা করেন। সাহাব মিয়ার এই বোধদয় জানতে পেরে ১ অক্টোবর মঙ্গলবার এসিল্যান্ড মেয়ের বাবাকে ফুল দিয়ে সংবর্ধিত করেন।
এ ব্যাপারে মেহেরুন্নেছা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাশেদুল হক জানান, আনোয়ারা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকায় হোম ভিজিট করে জানতে পারি তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। প্রথমে আনোয়ারার বাবাকে বুঝাতে চেষ্টা করি কিন্তু কিছুতেই তিনি বিয়ে ভেঙে দিতে রাজি হচ্ছিলেন না। পরে এসিল্যান্ড স্যারকে বিষয়টি অবহিত করলে সাহাব মিয়া মেয়েকে নিয়ে বিদ্যালয়ে আসেন এবং নিজের ভুল বুঝতে পারার কথা অকপটে স্বীকার করেন। এসিল্যান্ড স্যার যেভাবে আনোয়ারার বাবাকে সংবর্ধিত করলেন সত্যি আমরা মুগ্ধ হয়েছি। আগেও বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে কাজ করেছি কিন্তু এভাবে কেউ ফুল দিয়ে উৎসাহিত করেনি।
বাল্যবিয়ের খপ্পর থেকে ফিরে আসা আনোয়ারা বেগম বলেন, বাল্যবিয়ে থেকে রেহাই পাওয়ায় আমি অত্যন্ত খুশি। আমি আবার জেএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করেছি। পড়ালেখার জন্য বাবা আমাকে উৎসাহ দিচ্ছেন।
আনোয়ারার বাবা সাহাব মিয়া জানান, না বুঝে আমার মেয়ের বাল্যবিয়ের সব আয়োজন করেছিলাম। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট স্যার বাল্যবিয়ের কুফল আমাকে ভিডিও দিয়ে বুঝালে বুঝতে পারি আমার মেয়ের কত বড় ক্ষতি করতে যাচ্ছিলাম। বাড়ি গিয়ে ছেলে পক্ষকে না করে দেই। মেয়েকে আবার পড়াশুনা করতে উৎসাহ দেই। এসিল্যান্ড সাহেব আমাকে ফুল এভাবে উৎসাহিত করায় ভাল লেগেছে বলে তিনি জানান।
এসিল্যান্ড পদ্মাসন সিংহ জানান, আনোয়ারা বেগমের বাবা সাহাব মিয়াকে বাল্যবিয়ে ভেঙে দেয়ার অনুরোধ করলে তিনি বিয়ের জন্য অনেক টাকা খরচ হয়েছে বলে জানান। পরে তাকে বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে বুঝাই এবং বাল্যবিয়ের কুফল নিয়ে ইউটিউবে থাকা বিভিন্ন ভিডিও দেখাই। তখন তিনি মেয়ের বাল্যবিয়ে ভেঙে দেয়ার অঙ্গীকার করেন। ফলোআপ করতে গিয়ে জানতে পারি তিনি মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যান এবং মেয়ের পড়াশুনার ব্যাপারে শিক্ষদের সহযোগিতা চান। বিষয়টি জেনে আপ্লুত হই এবং মেয়ের বাবাকে ফুল দিয়ে উৎসাহিত করি। বাল্যবিয়ে থামাতে হলে প্রত্যেক বাবাকে সচেতন করতে হবে এবং আমি আনোয়ারা বেগমের বাবাকে অন্যান্য বাবাদের সচেতন করার কাজে লাগাতে চাই বলে তিনি জানান।
