অভূতপূর্ব উন্নয়নের এক অসম্পূর্ণ আখ্যান

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০১৯, ২১:০৫

চীনে কমিউনিস্ট শাসনের ৭০ বছর

তিয়ানজিন শহরে ঝাউ জিংজিয়া নামে এক ব্যক্তি কাগজ কেটে কেটে আধুনিক চীনের জনক মাও সেতুংয়ের ছবি চিত্রিত করছিলেন। এই অবসরপ্রাপ্ত তেল ইঞ্জিনিয়ার, পরবর্তীতে নিজের মধ্যে ব্লেড দিয়ে নকশা কাটার দক্ষতা আবিষ্কার করেন। তার সময় এখন কাটে প্রাচীন কাগজ কাটা পদ্ধতির মাধ্যমে চীনের কমিউনিস্ট ইতিহাসের বিভিন্ন গৌরবের ঘটনা এবং নেতাদের ছবি ফুটিয়ে তুলে। ‘আমার আর গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের সমান বয়স,’ বলছিলেন তিনি। ‘আমার মাতৃভূমি, দেশের জনগণ আর আমার দলের প্রতি রয়েছে এক গভীর অনুরাগ।’ ১৯৪৯ সালের পহেলা অক্টোবর, যে দিনটিতে মাও সেতুং চীনের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, তার কিছুদিন আগে জন্ম তার। ঝাও জিঙ্গজিয়ার মতো লোকদের জন্য, চীনের সাফল্য তার নেতাদের ভুলগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে। চীনের দারিদ্র্য, সংগ্রাম আর নাটকীয় সমৃদ্ধির ইতিহাসের অংশীদার হয়ে আছেন ঝাউ। তিনি বলেন, চেয়ারম্যান মাও কিছু ভুল হয়ত করেছেন কিন্তু সেটি তিনি একা করেননি। তাকে আমি হূদয়ের গভীর থেকে শ্রদ্ধা করি। তিনি আমাদের দেশকে মুক্ত করেছেন। সাধারণ কোনো মানুষ এমনটি করতে পারে না।’

চীনের ইতিহাস জুড়ে রয়েছে সমৃদ্ধি, অগ্রগতি এবং ত্যাগের গল্প। ঝাওয়ের কাগজ কাটা প্রতিকৃতির মতো, আমরা চীনের আধুনিক ইতিহাসের সময়কার ক্ষতগুলোয় আলাদাভাবে মনোনিবেশ করতে চাইছি না। শেষ পর্যন্ত ফলাফল কী হয়েছিল সেটাই গুরুত্বপূর্ণ এবং চীনের রূপান্তর ছিল আসলেই চমকপ্রদ।

১৯৪৯ সালের পহেলা অক্টোবর, চেয়ারম্যান মাও, তিয়ানমেন স্কয়ারে দাঁড়িয়ে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত, আধা সামন্তবাদী রাষ্ট্রকে একটি নতুন যুগে নিয়ে যাবার ঘোষণা দেন। সে সময় সামরিক কুচকাওয়াজে যুক্ত হতে পেরেছিল মাত্র ১৭টি বিমান। বিপরীতে এই সপ্তাহের প্যারেডে ছিল দূরপাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র, সুপারসনিক স্পাই ড্রোন—বলা যায় এগুলো উদীয়মান, শক্তিশালী ৪০ কোটি উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিজয়ের চিহ্ন। এটি একটি রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সাফল্যের বিবরণ—যদিও বেশির ভাগ অংশেই এটি সত্য—তবে অসম্পূর্ণ। চীনে বাইরে থেকে নতুন যারা আসেন, আকাশচুম্বি অট্টালিকা, হাইটেক মেগাসিটিগুলোর চাকচিক্যময় মহাসড়ক আর হাইস্পিড রেল নেটওয়ার্ক দেখে মুগ্ধ হয়ে যান।

সাম্প্রতিক সময়ে চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় জিনজিয়াংয়ের প্রায় দেড় মিলিয়ন মুসলিম- ইউঘুর, কাজাখ এবং অন্যদের ভিন্ন বিশ্বাস ও জাতিসত্তার জন্যে বন্দিশিবিরে রাখা হয়েছে। চীন জোর দিয়ে দাবি করছে যে তারা বৃত্তিমূলক বিদ্যালয়, যা অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ রোধে নতুন পথ খুলে দিচ্ছে। মৃত, কারাগারে বন্দি ও প্রান্তিক মানুষের গল্প, সাফল্যের কাহিনির তুলনায় অনেক বেশিই গোপন থাকে। তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা গেলে, চীনের সাম্প্রতিক ইতিহাসের বড়ো অংশ জুড়ে সেন্সরশিপ রয়েছে সেটা কেবল স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির বিনিময়ে পাওয়া নয়।

বেইজিংয়ের সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক গুও ইউহুয়া সেইসব অল্পসংখ্যক বিদ্বানদের অন্যতম, যিনি দেশটির বিগত সাত দশককে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছেন মৌখিক ইতিহাস সংগ্রহের মাধ্যমে। তার বই নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তিনি কার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন সেসব নজরদারিতে রয়েছে এবং তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো নিয়মিতই বন্ধ করে দেয়া হয়। ‘বেশ কয়েকটি প্রজন্ম ধরে মানুষ এমন এক ইতিহাস জেনেছে যা কি না মিথ্যা, নকল, মহিমান্বিত এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে হোয়াইট ওয়াশ করা হয়েছে।’ বিবিসিকে তিনি আরো বলছিলেন যে, কুচকাওয়াজের আগে বিদেশি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা না বলার ব্যাপারে তাকে সতর্ক করা হয়েছে।