অসংখ্য বিরোধী মতাদর্শী গত ১০ বছরে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোতে অনুপ্রবেশ করেছে। তাদের তালিকা গোয়েন্দাদের হাতে রয়েছে। চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের টার্গেট এসব অনুপ্রবেশকারীরাই। এদিকে, সম্প্রতি গ্রেফতার তিন অনুপ্রবেশকারী জিজ্ঞাসাবাদে টাকা ভাগাভাগির চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। অনুপ্রবেশকারীদের ব্যাপারে সরকারের হাইকমান্ড খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। হাইকমান্ড ইতিমধ্যে তাদের ব্যাপারে কঠোর মনোভাব ব্যক্ত করেছেন।
নানা কৌশলে এধরনের কিছু লোক ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোতে ঢুকে পড়েছে। তবে তারা চিন্তাচেতনা ও আদর্শে বিএনপি মতাদর্শী। বিএনপির জন্মলগ্ন থেকেই দলটিতে তারা রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। এখন ক্ষমতাসীনদের পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন করে সংঘবদ্ধ হচ্ছেন তারা। এসব অনুপ্রবেশকারীরা কিভাবে আসল, এখন কি করছে, কার মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলে পদ পেয়েছে-সব কিছু খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জানা গেছে, একসময় যারা ফ্রিডম পার্টি, বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ২০০৯ সালের পর তারা দল বদল করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে যোগদান শুরু করেন। এরা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা, এমপি-মন্ত্রী ও স্থানীয় নেতার হাতে ফুলের মালা দিয়ে ‘লীগ’ নেতা যুক্ত করেন নামের সঙ্গে। আবার সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পদ-পদবিও বাগিয়ে নেন কেউ কেউ। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর সরকারি দলে ভিন্ন দলের নেতা-কর্মীর যোগদান বেড়ে যায়। বিশেষ করে ঠিকাদার, চাঁদাবাজসহ এখন সবাই ‘লীগ’-এর সঙ্গী। কেউ সরাসরি দলের পদ-পদবিতে, কেউ কারও ছত্রচ্ছায়ায়। আর এসব অনুপ্রবেশকারীর মাশুল দিতে হচ্ছে আওয়ামী লীগকে।
১৯৯১ সালে ব্রাদার্স ক্লাবে শুরু হয় অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসা। পরবর্তীতে আরামবাগের ওয়ান্ডার্স ক্লাব এবং মোহামেডানে চালু হয় ক্যাসিনো। এই তিন স্থানে ক্যাসিনো পরিচালনা করতেন বিএনপির তিন নেতা। তাদের নামের আদ্যঅক্ষর হলো ‘স’ ‘ফ’ ও ‘আ’।
সম্প্রতি অভিযানে আটক হন যুবলীগ ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, যুবলীগ নামধারী এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম ও কৃষক লীগের নেতা শফিকুল আলম ফিরোজ। তারা তিন জনই দলে অনুপ্রবেশকারী। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার বিমানবন্দরে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইট থেকে অনলাইন ক্যাসিনোর বাংলাদেশ প্রধান সেলিম প্রধানকে গ্রেফতার করে র্যাব। তিনি ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতার ছত্রছায়ায় ক্যাসিনোসহ অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে আসছেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ক্যাসিনো সৃষ্টির বিস্তারিত তথ্য এবং এর টাকার ভাগ কেথায় কোথায় দেওয়া হয় তার বিস্তারিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে প্রকাশ করেছেন। ফ্রিডম পার্টির মানিক ও রাসুর হাত ধরে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। খালেদ ছিলেন বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। ২০১২ সালে যুবলীগের মহানগরী কমিটিতে ঢুকে পড়েন তিনি। এরপরের ঘটনা সবার জানা। একই অবস্থা বিপুল অর্থসহ আটক জি কে শামীমের ক্ষেত্রেও। বিএনপি আমলে গণপূর্ত ভবনের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন তত্কালীন যুবদল নেতা শামীম। তিনি যুবদলের সহ-সম্পাদক ছিলেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। জামায়াত নেতার অপকর্মের দায় আওয়ামী লীগের ঘাড়েই পড়েছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন অনুসন্ধান ও তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ করে অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা চূড়ান্ত করেছে। সেই তালিকা অনুযায়ী প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেফতারের অভিযান শুরু হয়। অনুসন্ধানে ক্যাসিনোসহ নানা অবৈধ অর্থ উপাজন করে বিদেশে পাচার করা এবং এর সঙ্গে জড়িত গডফাদারের নামও গোয়েন্দাদের হাতে রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা জানান, তারা শুধু আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের পদ ভাগিয়ে নিয়ে শুধু নেমপ্লেট হিসেবে ব্যবহার করছে। তাদের মূল দল বিএনপি ও যুবদল। টাকার ভাগ বিএনপির কোন কোন নেতাকে কিভাবে দিচ্ছেন, লন্ডনে কিভাবে পাঠাচ্ছেন, সব তথ্য গোয়েন্দাদের কাছে প্রকাশ করেছেন। সরকারি দলের নেমপ্লেট হলো শুধু তাদের অবৈধ বাণিজ্য টিকিয়ে রাখার কৌশলমাত্র। জিজ্ঞাসাবাদে তারা এ তথ্যও বলে দেন। গ্রেফতারকৃত খালেদ, লোকমান ও ফিরোজকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
