নাম বিনতা রানী সেন। বাড়ি সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা উপজেলায়। বাবা ব্যবসায়ী সঞ্চিত চন্দ্র সেন। মা মৃত গীতা রানী সেন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে জ্যেষ্ঠ বিনতা। সবার অনুপ্রেরণায় আজ তিনি এই অবস্থানে।
বাবার অনুপ্রেরণায় তিনি ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হন ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। মেডিক্যালে ভর্তি হতে পারেননি তাতে কি! যেখানে ভর্তি হয়েছেন সেখান থেকেই সফলতার সর্বোচ্চটুকু আদায় করে নিবেন এমনি আত্ম প্রত্যয়ী হয়ে ওঠেন বিনতা। অনার্সে হন বিভাগে তৃতীয় আর মাস্টার্সে প্রথম। এখন তিনি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।
নিজের পড়াই শুধু চালিয়ে যাননি। টিউশন করে নিজের পড়ার পাশাপাশি ছোট ভাইবোনদেরও পড়ার খরচ চালিয়েছেন। ছয় জনের সব কয়জনকেই পড়িয়েছেন। এখনো তাদের নিয়েই আছেন। মা মৃত্যুবরণ করাতে দায়িত্বটা এখন আরো বেশি করেই পালন করতে হচ্ছে। ভঙ্গুর হূদয় নিয়ে শত বেদনা সহ্য করে অনেকগুলো দায়িত্ব মাথায় নিয়ে ছোট ভাইবোনদেরকে মা হারানোর ব্যথা লাঘব করার চেষ্টা করছেন।
পড়াশুনা শেষে প্রভাষক হিসেবে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) অর্থনীতি বিভাগে যোগ দিয়েছিলেন এই অসম্ভব আত্ম প্রত্যয়ী। কষ্ট যার নিয়তিতেই সে কি তারে ছাড়তে চায়! তিনি নোবিপ্রবিতে এসে সাজানো গোছানো স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি বিভাগে এসে যোগ দিতে পারেননি। সদ্য যোগ দেওয়া নতুন বিভাগের নতুন শিক্ষার্থীদের ভালবাসাই নাকি তাকে আটকে রেখেছে। কেমন ভালবাসে তারা? জানতে চাইলে অর্থনীতি প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘আমাদের প্রিয় শ্রদ্ধেয় বিনতা ম্যাম সম্পর্কে এক কথায় কিছু বলতে গেলে, তিনি আমাদের ইন্সপাইরেশন। বন্ধুসুলভ মমতায় শুধুই পাঠদান না, তার কাছ থেকে সবসময় আমরা পেয়েছি যে কোনো সমস্যায় সর্বোচ্চ সাহায্য। আমাদের প্রত্যেকের প্রতি আলাদা নজর পেয়েছি শ্রদ্ধেয় ম্যামের। প্রথম ব্যাচ হওয়াতে ম্যামকে আমরা দেখেছি নোবিপ্রবি অর্থনীতি বিভাগের সেই যাত্রা হতেই। বিভাগের আজকের এই শৌর্য বিত্তের পিছনে ম্যামের ত্যাগ তিতিক্ষা আর আন্তরিকতার চাক্ষুস সাক্ষী আমরা। চেয়ারম্যান হিসেবেও ম্যাম ছিলেন সফল।’
শিক্ষকতা মহান পেশা বলেই অনেকে এ পেশাকে পছন্দ করে থাকেন। বিনতাও হয়ত সেজন্যই শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন; কিন্তু এতে রয়েছে সীমাহীন কষ্ট। অসহ্য কষ্ট থাকা সত্ত্বেও শিক্ষকতা নিয়েই থাকা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এই পেশার জন্যই মনে হয় আমার সৃষ্টি। আমি পড়াতে পারব। কারণ ইউনিভার্সিটি লাইফে আমি আমার সবগুলো ক্লাসমেইটকে পড়িয়েছি। এমন কোনোটা ছিল না যে আমার কাছে আসেনি। আমি ওখান থেকেই শিখাচ্ছি। আর শিক্ষকতার প্রতি আগ্রহ ওখান থেকেই। পরিবারের অর্থনৈতিক সমস্যা থাকায় প্রচুর টিউশনও করেছি। তাই ধৈর্যধারণ আর কষ্ট সহ্যকরণ রক্তের সাথে মিশে গেছে।’
নিজের পড়াশুনার শত অভিঙ্ঘতা রোমান্থন করতে গিয়ে নিজের বিভাগের শিক্ষার্থীদের কথা বলতে ভুলেননি। শিক্ষার্থীদের পড়ার ধরন, সিজিপিএসহ তাদের বিভিন্ন গুণাগুণ আর সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়েও বলেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি চাই শিক্ষার্থীদের পড়াশুনার জন্য একটি মিডিয়া তৈরি হোক। এক্ষেত্রে আমাদের রয়্যাল ইকোনমিক ক্লাব (আরইসি) দায়িত্বটি নিতে পারে। ক্লাসের ভাল শিক্ষার্থীরা অন্যদেরকে সহযোগিতা করার জন্য নির্দিষ্ট সময় বের করে নিবে। তারা যেগুলো বুঝবে না সেগুলো শিক্ষকদের কাছ থেকে বুঝে নিয়ে ওদেরকে বুঝিয়ে দেবে।’
