কী অদ্ভুত ব্যাপার, আমি এতক্ষণ রিমির মা রিমির মা করে যাচ্ছি। তার নাম লিখছি না কেন?
আমরা তখন কেবল চাকরিতে মানে মাস্টারিতে ঢুকেছি। অধিকাংশই অবিবাহিত। বিবাহিতদের দু-একজন বউবাচ্চা আছে এটা স্বীকারই করতে চায় না।
একজনকেই পেয়েছি গলা উঁচিয়ে বউয়ের কথা বলে। কথা বলার সময় তার যে অভিব্যক্তি, দেখে মনে হয়, সুন্দর একজন নারীকে জড়িয়ে ধরে আমাদের লেকচার দিচ্ছে; তার চোখে-মুখে উচ্ছ্বাস সম্ভবত শরীরেও শিহরণ। আমরাও ভাবি, শিগগির বিয়েটা করে ফেলতে হবে।
অভিজ্ঞ দেহবিশারদের মতো নসিহত করে, যৌবন ধরে রাখা যায় না, স্টক করা যায় না, সময় যৌবনকে নিঃশেষ করে দেয়।
একদিন বলল, নীতুর শরীরে অদ্ভুত পাগল করা একটা গন্ধ।
ফিজিক্সের ওয়াসিউদ্দিন জিজ্ঞেস করে, গন্ধটা কোথায় থেকে বের হয়!
ওয়াসিউদ্দিনের মাত্রাজ্ঞান কম, এটা ভেবে আমরা প্রসঙ্গ পাল্টাই, অন্য কথা বলি : পদ ধরে রাখার জন্য প্রিন্সিপাল সাহেব সরকারি দলের পাণ্ডাদের তোয়াজ করে চলেন এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
কিন্তু নীতুর স্বামী আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে। নীতু সম্পর্কে আমাদের আরো জ্ঞান দেয়।
আমরা নীতুর স্বামীর মতামতকে খাটো করে দেখি না। নীতুর স্বামী ইকোনমিকেসও ডাবল ফার্স্টক্লাস, ফুল প্রফেসর হয়ে রিটায়ার করেছে, ওয়াসিউদ্দিন অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর। আমি অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসরের ওপর উঠতে পারিনি, কারণ আমি এমফিল, পিএইচডি কিছুই করিনি, আমার কোনো পাবলিকেশন নেই।
দুটো বড়ো রাজনৈতিক দলের এমনকি ওয়ার্ড পর্যায়ের কোনো নেতার সাথেও আমার পরিচয় নেই। আমাদের রিটায়ারমেন্টের পর আরো এক যুগ পেরিয়ে গেছে। আমাদের ব্যাচের মোট ছত্রিশ জন বিভিন্ন কলেজে যোগ দিয়েছিলাম। এর মধ্যে পিএইচডি করতে বিদেশ গিয়ে ফিরে না আসা তিনজনসহ বিভিন্ন কারণে চাকরিচ্যুত হয় সাতজন। বাকি ঊনত্রিশ জনের মধ্যে খুন হয় একজন, সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় একজন, স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে পাঁচজনের। বাকি বাইশ জনের তিনজন আমেরিকায়, একজন কানাডায় নাতি-নাতনির চাইল্ড মাইন্ডিং করছে, একজন অস্ট্রেলিয়াতে। বাকি সতের জনের তিনজন স্থায়ীভাবে শয্যাশায়ী, যেকোনো দিন চলে যাবে।
বাকি চৌদ্দ জনের মধ্যে আমি তেরো জনের নাম এক নিঃশ্বাসে বলে যেতে পারি; কিন্তু নীতুর স্বামী, আমাদের সে আমলের নারী-অ্যানাটমি বিশেষজ্ঞ, তার নাম কিছুতেই মনে করতে পারছি না।
রিমির তখন এগারো বছর। তার মানে রিমিও বত্রিশ ছাড়িয়ে গেছে। রিমি ডাক্তার। প্রাইভেট মেডিকেল থেকে পাস করলেও পড়াশোনায় ফাঁকি দেয়নি। কার্ডিওলজিতে এমডি করেছে। এখন পোস্টিং এনআইসিভিডিতে— ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজেস।
রিমির মা ফ্যানের সাথে ঝুলেছিল। একটা চিরকুটও রেখে গেছে—আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। রিমিকে দেখে রেখো।
আমি তো একই রুমে তার সাথে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি। এর মধ্যে এত বড় একটা কাণ্ড ঘটে গেল, আমি টের পাব না!
আমার শ্বশুর যথারীতি আমার বিরুদ্ধে হত্যামামলা দায়ের করেন। আমি গ্রেফতার হই, চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত হই।
স্বামী-স্ত্রীর খুঁটিনাটি বিরোধ ও তর্কবিতর্ক ছাড়া আমাদের সম্পর্কের এমন কোনো অবনতি হয়নি যে, তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।
রিমি চিত্কার করে বলেছে, আমার বাবা মাকে মারেনি।
আমাকে আঁকড়ে ধরেছে, পুলিশের হাতে কামড় দিয়েছে।
পুলিশ সিলিং ফ্যানের সাথে ফাঁস লাগানো কালো ওড়না এবং টুকটাক আরো কিছু আলামত হিসেবে জব্দ করেছে। আমাকে বলেছে, একই রুমে আপনি ঘুমিয়ে থাকবেন আর আপনার স্ত্রী ফ্যানে ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে পড়বে, এটা অবিশ্বাস্য।
রিমির মায়ের সুইসাইডাল টেনডেন্সি-আত্মহত্যার প্রবণতা ছিল, জামিনের পক্ষে এমন কোনো তথ্য আমার উকিল প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি, আবার তার সাথে আমার সম্পর্কের টানাপড়েন চলছিল, কিংবা আমার বা তার বিবাহ-বহির্ভূত কোনো সম্পর্কের কারণে পথের কাঁটা সরাতে কিংবা ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে খুন করেছি, ফাঁসিতে ঝুলিয়েছি, কিংবা ফাঁসিতে লটকে পড়ার প্ররোচনা দিয়েছি, এমন কোনো তথ্য তদন্তকারী কর্মকর্তা দাখিল করতে পারেনি।
শেষ পর্যন্ত হাইকোর্ট থেকে আমার জামিন হয়। আমার পক্ষের ব্যারিস্টার বলেন, মাই লর্ড, ধরে নিলাম আমার মক্কেলের বিরুদ্ধে আনা সবগুলো অভিযোগই সত্য, আপনি হতভাগ্য মেয়েটির কথা ভাবুন, তার মা প্রয়াত, বাবা কারাগারে। তাকে লালনের দায়িত্ব আপনি কাকে দেবেন? লাম্পট্যভরা এই সমাজে আপনি তার বাবা ছাড়া আর কাকে বিশ্বাস করবেন? যদি রাষ্ট্র মেয়েটির দায়িত্ব নেয় মাই লর্ড, আমার কোনো আপত্তি নেই, আমার মক্কেলকে যতদিন ইচ্ছে কারাগারে রাখুন। আর তা যদি না হয় এরকম পরিস্থিতিতে আপনি আপনার নিজের মেয়ের জন্য যা চাইবেন এই মেয়েটির জন্যও তা-ই করুন।
আমার জামিন হয়ে যায়। রিমি আমাকে আঁকড়ে ধরে বাবা বাবা বলে কাঁদতে থাকে।
এর মধ্যে রিমির নানার মৃত্যু হয়। হার্ট অ্যাটাক। সেদিন কোর্টে হাজিরা ছিল। জামিনপ্রাপ্ত একমাত্র আসামি আমিও ছিলাম। তিনিও এসেছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, রিমি কেমন আছে?
ভালো বাবা, আবার বইপত্র নিয়ে বসতে শুরু করেছে। আপনি দোয়া করবেন।
আমি এখন রিমির কথা ভাবি—স্বামীর সংসারে এসে রিমি হয়তো নিতান্তই তার ব্যক্তিগত কোনো কারণে আত্মহত্যা করল। এর সাথে স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি কারোরই কোনো সংস্রব নেই। কিন্তু আমি তো হত্যামামলা তাদের বিরুদ্ধেই করব, কাউকেই ছাড় দেব না।
রিমির নানা ভুল করেননি। দায় তো আমাকে নিতেই হবে। বাড়ি ফিরে তার হার্ট অ্যাটাক করল এবং পরবর্তী বারো ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যুবরণ করলেন।
আমি শারীরিকভাবে আক্রান্ত হতে পারি এই ঝুঁকি নিয়েই তার জানাজায় অংশ নিই, এমনকি দাফনের সময়ও আজিমপুর গোরস্তানে হাজির ছিলাম। আমার উপস্থিতি কাউকে তেমন ক্ষুব্ধ কিংবা বিচলিত করেছে বলে মনে হয়নি, আমি সুস্থ শরীরেই ফিরে আসি। এমনকি রিমিকে নিয়ে তার কুলখানিতেও উপস্থিত হই।
রিমির নানী, মামা, খালা ও অন্য আত্মীয়রা তার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে। আমার স্ত্রী সে বাড়ির বড়ো মেয়ে, আর নাতি-নাতনিদের মধ্যে রিমিই সবার বড়ো।
কুলখানির পরদিনই আমার শ্বশুরের আইনজীবী আমার জামিন বাতিলের জন্য আদালতে আর্জি পেশ করলেন। বললেন, জামিনে মুক্ত হয়েই কন্যার খুনি কন্যার পিতাকে হত্যার হুমকি দিয়ে যাচ্ছিল। আতঙ্কে তার হার্ট ফেল করেছে, এই ঘাতকের হাতে শ্বশুরবাড়ির যে কেউ নিহত হতে পারে। তাদের নিরাপত্তার জন্য আসামিকে গ্রেফতার করা প্রয়োজন।
বিজ্ঞ আদালত উভয়পক্ষের শুনানির জন্য দিন ধার্য করলেন। কিন্তু পরবর্তী কোনো তারিখেই বাদীপক্ষের কোনো তদবির না থাকায় একসময় মামলাটিতে ধুলোবালি জমে গেল।
২.
কী অদ্ভুত ব্যাপার, আমি এতক্ষণ রিমির মা রিমির মা করে যাচ্ছি। তার নাম লিখছি না কেন?
আমাদের তেরো বছরের সংসার। তারপর কেটে গেছে একুশ বছর। রিমিকে নিয়ে আমার ভালোই কেটেছে, নতুন সংসার পাততে হয়নি।
আমি রিমির মায়ের নামটা মনে করতে পারছি না।
কিন্তু অপ্রয়োজনীয় শতাধিক নাম একটার পর একটা মনে পড়ছে। আমার প্রাইমারি স্কুলে যে দফতরি ঘণ্টা পেটাত এতদিনে নিশ্চয়ই মরে ভূত হয়ে আছে। তাকে আমার কোনো প্রয়োজন নেই। তার নাম যা ইচ্ছে তা-ই হোক, আমার কিচ্ছু এসে যায় না। কিন্তু তার নামটা আমার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে, হানিফ খাস্তগির।
কী করিলে কী হয়—এই নামের একটি চটি বই পঁয়তাল্লিশ বছর আগে ঢাকা-জয়দেবপুর বাসে বিক্রি হচ্ছিল। আমি কেবল প্রচ্ছদটা দেখছি, একটি পাতাও উল্টে দেখিনি। সেই বইয়ের লেখকের নাম সোলায়মান খোয়াজপুরী।
লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলমান নারী গ্র্যাজুয়েট, নাম শায়েস্তা একরামুল্লাহ। তার কন্যা ব্যারিস্টার সালমা একরামুল্লাহ প্রফেসর রেহমান সোবহানের স্ত্রী ছিলেন, তার অপর কন্যা সারওয়াত জর্ডানের প্রিন্স তালালকে বিয়ে করে হয়ে গেলেন প্রিন্সেস সারওয়াত। কিন্তু এসব নাম আমার মনে রেখে কী লাভ?
ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর বোনের নাম বিজয়লক্ষী পণ্ডিত আর পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন মিস ফাতিমা জিন্নাহ। ক্লাস সেভেন থেকে এইটে উঠার পরীক্ষায় যে দুটি মেয়ে একটি ছেলে ফেল করেছিল তারা হচ্ছে চম্পা রানী হালদার, সৈয়দা কানিজ মাওলা এবং শাহাবুদ্দিন খান।
আমাদের ভাইস চ্যান্সেলরের স্ত্রীর নাম দিলরুবা, পাড়ার যে নাপিতের কাছে আমি চুল কাটাতাম, বুড়ো সেই মানুষটার নাম ভগবান শীল। আমি একবার তার ডিকটেশন নিয়ে শ্রীমতি আরতি বালার কাছে একটি চিঠি লিখে দিয়েছিলাম। ভগবান শীলের স্ত্রীর নাম আরতি বালা।
কিন্তু রিমির মায়ের নামটা মনে পড়ছে না। আমি গত দু-তিন দিন গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থেকে নামটা মনে করার চেষ্টা করছি, আমার মনে পড়ছে জ্যাকুলিন ওনাসিস, কাদম্বরী দেবী, ডাক্তার জোহরা কাজী এসব নাম।
আমাকে একটা ফরম ফিলআপ করতে হবে। সেখানে একটা শূন্যস্থানে তার নামটা বসাতে হবে। দিনভর কাগজপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করেছি, পুরনো ডায়েরির পাতা উল্টেছি, নামটা উদ্ধার করতে পারিনি। কিছু চিঠিপত্রও ঘেঁটেছি, পাইনি।
তবে এটা বেশ মনে পড়ছে যখন নামটা প্রথম শুনি, বেশ ভালো লেগেছিল, তিন অক্ষরের নামটি—কিন্তু কোন তিনটি অক্ষর? শুরুর অক্ষরটি কি ‘স’ না ‘ম’? ‘ক’ না ‘ল’? ‘প’ না ‘জ’? নাকি প্রথমটি স্বরবর্ণ থেকে উঠে এসেছে? ‘অ’ না ‘ই’?
বিয়ের এক যুগ পর কাবিনের তেমন গুরুত্ব নেই জেনেও আমি এ-থ্রি সাইজের নীলচে কাগজটা লেমিনেট করিয়ে রেখেছিলাম। কখনো যদি কাজে লাগে।
অবশ্যই আমার এখনই কাজে লাগবে। রিমির মায়ের নাম কাবিনে লেখা আছে। কাবিনে আমার সই আছে, তারও আছে। আমার সই দেখে কারো সাধ্য নেই আমার নাম কী তা উদ্ধার করা। কিন্তু তার বেলায় একেবারেই ভিন্ন। হাতে লেখা প্র্যাকটিস করার সময় যেমন স্পষ্ট ও একই মাপের অক্ষরে লিখতে হয় ও ঠিক সেভাবেই নাম সই করে।
আমি আলমারি তন্নতন্ন করে খুঁজি। যে ফোল্ডারে লেমিনেটেড কাবিন রেখেছিলাম, ফোল্ডার ঠিকই আছে; কিন্তু কাবিনটা নেই। স্টিলের একটি ওয়্যারড্রবে আমার এবং রিমির মায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজের সবগুলো সার্টিফিকেট আছে। সে স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে লোকগীতি শাখায় হাসন রাজার গান গেয়ে ফার্স্ট প্রাইজ পেয়েছে। একটা ফ্লাক্স এবং একটা সার্টিফিকেট। গানটা বিয়ের পর আমাকেও শুনিয়েছে।
কানাই তুমি খেইড় খেলাও কেনে
রঙে রঙিলা কানাই, কানাই তুমি খেইড় খেলাও কেনে
এই কথাটা হাসন রাজার উঠে মনে মনে
ফার্স্ট প্রাইজ কী ছিল মনে করতে পারছি না; কিন্তু সার্টিফিকেট আমি নিজে দেখেছি। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় দুর্দান্ত কয়জন লোকগীতি শিল্পীর মুখোমুখি ওকে হতে হয়। তৃতীয় পুরস্কার পায়, ব্রোঞ্জ মেডেল আর সার্টিফিকেট। তখন গেয়েছে—
আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপ রে
আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপ রে
আরে দিলের চোখে চাইয়া দেখ বন্ধুয়ার স্বরূপ রে
এই গানও আমাকে শুনিয়েছে।
বিয়ের আগে ও পরে লেখা আমার কয়েকটি চিঠি খুঁজে পেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠি। নিশ্চয়ই নামটা আছে।
আমি ঘোরের মধ্যে আমার সবগুলো চিঠি পড়ি। প্রত্যেকটি চিঠিতে আমি সম্বোধন করেছি ‘আমার পাখি’।
কিন্তু পাখি তো ওর নাম নয়। আমার ভালোবাসার নাম পাখি।
আমি রাতের পর রাত তন্ন তন্ন করে সব কাগজপত্র ঘেঁটেছি, নামটা কোথাও নেই। আমার বত্রিশ বছরের পুরনো ডায়েরির পাতা উল্টে হঠাত্ পেয়ে গেলাম—‘আজ পাখি আর আমি আদিম যুগের মানুষ সেজে যা করেছি এটা লেখা যাবে না। যদি সত্যিই লিখি আর ভবিষ্যতে যদি কখনো আমাদের ছেলেমেয়েদের চোখে পড়ে, লজ্জায় আমাদের দুজনেরই মাথা কাটা যাবে।’
কিন্তু এখানে তো নাম নেই।
মানুষ বুড়ো হলে ভুলে যায় এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু তাই বলে নিজের স্ত্রীর নাম!
এক স্বামী বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তার চাবি, চশমা, মানিব্যাগ এবং মোবাইল ফোন কোথায় রেখেছে মনে করতে পারত না। প্রতিদিনই এসবের একটা না একটা খুঁজে দিতে দিতে বিরক্ত হয়ে তার স্ত্রী বলেছে, চোখের সামনে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় সবগুলো রাখলেই পারো। স্ত্রীর পরামর্শ তার ভালো লেগেছে এবং সবগুলো চোখের সামনে কেলভিনেটর ফ্রিজের মধ্যে রাখল। কিন্তু পরদিন বেরোনোর সময় এগুলো কোথায় রেখেছে কোনোভাবেই মনে করতে পারল না। ফলে স্ত্রীর আরো বকা খেল। তার পরদিন হঠাত্ তার স্ত্রী চেঁচিয়ে উঠল, ফ্রিজের ভেতর ফোন বাজে কেন? খুলে দেখল চশমা, চাবি, মানিব্যাগ ও মোবাইল ফোন ফ্রিজের ভেতর পেছন দিকটাতে শাকসবজির পেছনে লুকিয়ে রাখা।
তার স্ত্রী চেঁচিয়ে উঠল, ফ্রিজের ভেতর চশমা, মানিব্যাগ, চাবি, মোবাইল ফোন কেন রেখেছ?
স্বামী বলল, আমি কি পাগল হয়েছি যে এসব ফ্রিজে রাখতে যাব।
স্ত্রী থ হয়ে তাকিয়ে রইল।
নীতুর স্বামী, আমার সহকর্মী ও বন্ধু ইকোনমিকেসর ফুল প্রফেসর—তার নামটা রিমির মায়ের গানের কথা মনে করতে গিয়ে মনে পড়ে গেল, তার নাম হাসন রাজা নয়, খাদেম হোসেন রাজা।
রিমিকে ফোনে জিজ্ঞেস করতে পারি, ‘তোর মায়ের নামটা যেন কী?’ রিমি অবাক হবে। এমনকি এটাও ভাবতে পারে, যে পুরুষ নিজের স্ত্রীর নাম মনে রাখতে পারে না, তার পক্ষে স্ত্রীকে খুন করাও সম্ভব। তার মানে, আমিই রিমির মাকে ঝুলিয়েছি!
রিমির মাকে চিনত এমন বেশ কয়জনের ফোন নম্বর আছে, তাদের ফোন করে জিজ্ঞেস করব নাকি?
সকালে কাকে করব কাকে করব করতে করতে ফোনের স্ক্রিনে রিমির নামটি ভেসে উঠতে বাটন টিপি। রিমি হ্যালো বলতেই আমি জিজ্ঞেস করি,
আচ্ছা রিমি, তুই কি বলতে পারবি পাখিটার নাম কী?
মানে আমি যে পখিটার কথা বলছি কী নাম যেন?
রিমি জিজ্ঞেস করে, তুমি কোন পাখিটার কথা বলছ?
আমি বলতে পারলে কি আর তোকে জিজ্ঞেস করি?
পাখিটা দেখতে কেমন বাবা? কালো হলে কাক কিংবা কোকিল। হলুদ হলে শালিক, সবুজ হলে টিয়া।
আমি ধমক দিই, তুই আমাকে পাখি চিনাচ্ছিস?
রিমি বলে, বাবা তোমার শরীরটা ঠিক আছে তো? প্রেসার, সুগার? রাতে ঘুম কেমন হয়েছে?
আমি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠি, প্রেসার, সুগার আর ঘুম হওয়া না হওয়ার সাথে পাখির সম্পর্ক না।
আমি কবি শামসুর রাহমানকে ফোন করি। তিনি রিমির মাকে পছন্দ করতেন এবং তাকে একটি কবিতা উত্সর্গ করেছেন। তিনি নিজেও অসুস্থ, এর মধ্যেই আমি জিজ্ঞেস করলাম, রাহমান ভাই, রিমির মাকে কি কখনো আপনার মনে পড়ে?
কিন্তু তিনি বললেন, অভিমানিনী।
তিনি বললেন, আসলে সে রাতে কী হয়েছিল একদিন শুনিয়ে যাবেন।
আমি জিজ্ঞেস করি, কোন রাতে?
তিনি বললেন, যে রাতে একজন জলজ্যান্ত নারী গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ফাঁস দিলেন আর আপনি একই ঘরে নাক ডেকে ঘুমালেন।
তার সাথে আরো কিছুক্ষণ কথা বলি, তার মুখ থেকে রিমির মায়ের নামটা শোনার আমার সব চেষ্টা ব্যর্থ হলো।
আমি জিজ্ঞেস করি, ওই কবিতাটা আপনার কোন কাব্যগ্রন্থে?
প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করে কোনো জবাব না পেয়ে আমি বারবার হ্যালো হ্যালো বলতে থাকি।
৩.
পরদিন সকালে আমি আজিমপুর গোরস্তানে যাই। একুশ বছর আগের ডেথ রেজিস্ট্রার বের করার জন্য পীড়াপীড়ি করি, কিছু ঘুষও দিই। কিছুক্ষণ পর আমাকে জানায়, পাঁচ বছর আগের রেকর্ডও নেই। আমি বত্রিশ বছর আগের কাজী অফিস খুঁজতে বের হই, ওখানে তো পাবই। কিন্তু অফিসটি নেই, ওখানে একটি অ্যায়ারকন্ডিশনড সুপার মার্কেট।
সুপার মার্কেটের একমাত্র বইয়ের দোকানটিতে ঢুকি। আমার আকাঙ্ক্ষিত বইটি পেয়েও যাই। বইয়ের প্রচ্ছদে একটি সুন্দর মেয়ের ছবি, ওপরে লেখা : ‘মেয়েদের সুন্দর নাম।’ রিমির মায়ের নামটাও সুন্দর। এই বইয়ে নামটা থাকবেই, এক রাত আমি একটি একটি করে নাম শব্দ করে পড়ে যাব। নিশ্চয়ই রিমির মায়ের নামটা বের করে ফেলতে পারব।
আমি বইয়ের পাতা উল্টে নামগুলো দেখছি।
ফোন বাজে।
রিমি জিজ্ঞেস করে, বাবা তুমি খেয়েছ?
আমি জিজ্ঞেস করি, তুই কি তোর মায়ের গাওয়া কোনো গান শোনাতে পারবি?
রিমি বলে, বাবা, এক সপ্তাহের মধ্যে আমাকে এফসিপিএস পার্ট টু পরীক্ষায় বসতে হবে। আর তুমি গান গাইতে বলছ?
তাহলে আমিই গাই, তুই শোন :
পাখিটি ছাড়িল কে
হলুদিয়া পাখি সোনারই বরণ
পাখিটি ছাড়িল কে?
রিমি বলল, বাবা তুমি ঘুমের ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়। আমি কাল সকালে তোমাকে দেখতে আসছি। তোমার এই পাখি অবসেশন কোত্থেকে এল জানতে হবে।
৪.
রিমি সকালে এসে বাবাকে পেল না।
বাবার খোঁজ পেতে আরো আটচল্লিশ ঘণ্টা লেগে গেল। সেদিনই মধ্যরাতে ঢাকা শহরের কোনো একটি ‘কী পয়েন্ট ইনস্টলেশন’-এর কাছে সন্দেহজনক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করার পর একটি এলিট ফোর্সের হাতে রিমির বাবা গ্রেফতার হন। তিনি কে জিজ্ঞেস করলে, মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়ি, উশকোখুশকো চুল, ষাটোর্ধ্ব এই মানুষটি গেয়ে উঠলেন :
তুমি মোর পাও নাই পরিচয়
তুমি যারে জান সে যে কেহ নয়, কেহ নয়।
অমনি তারা বৃদ্ধের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, বলল, চিনতে পেরেছি। জিজ্ঞেস করল, নাম কি আফসার উদ্দিন?
তিনি বললেন, আলবত্ আফসার উদ্দিন।
সেদিনের ব্রেকিং, নিউজ টিভির স্ক্রলে : পলাতক জঙ্গিনেতা আফসার উদ্দিন গ্রেফতার। কিন্তু খবরে তার চেহারা দেখাল না। পরের দিনের খবর :আফসার উদ্দিনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ধার। সেদিন কাগজে ছবি বের হলো। টিভিতে চেহারা দেখাল। তার পরদিন মার খাওয়া রক্তাক্ত ও বিধ্বস্ত বাবাকে যখন রিমি খুঁজে বের করল, তার পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হচ্ছিল না।
রিমি এলিট বাহিনীর ক্যাম্প প্রধানকে বলল, এই মানুষটি আমার বাবা। তার নাম আফসার উদ্দিন নয়।
তিনি নিজে বলেছেন, তার নাম আফসার উদ্দিন।
রিমি চিত্কার করে বলে, ইম্পসিবল। আমার বাবার নাম হুমায়ুন আহমেদ। তার লেখা অর্গানিক কেমেস্ট্রি কলেজে পাঠ্য। বইয়ের সেকেন্ড ফ্ল্যাপে তার ছবি আছে, মিলিয়ে দেখতে পারেন।
আমরা তো একজন হুমায়ূন আহমেদের নামই জানি, কী সব বইটই লিখেন।
রিমি বলে, জি, তিনি পলিমার কেমেস্ট্রিতে পিএইচডি। তিনি বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক। আমার বাবা শুধু টেক্সট বই লিখেছেন, বাংলা ভার্সনও আছে :জৈব রসায়ন।
রিমিকে তার বাবার মুখোমুখি করা হলে রিমি বলল, বাবা তুমি আফসার উদ্দিন নও।
রিমির বাবা জিজ্ঞেস করল, আপনি কে? আমি তো আফসার উদ্দিন হিসেবেই স্টেটমেন্ট দিয়েছি। এখন আর নাম বদলানো যাবে না।
রিমি থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বাবা কি তাকেও চিনতে পারছে না?
রিমি জিজ্ঞেস করল, তোমার চশমা, মোবাইল ফোন, চাবি এসব কোথায়?
তিনি মুচকি হেসে বললেন, রিমির মা অনেকদিন আগে সবগুলো একজায়গায় রাখতে বলেছিল। আমি চশমা, মানিব্যাগ, চাবি আর মোবাইল ফোন ডিপ ফ্রিজে রেখে এসেছি, স্পষ্ট মনে আছে। আচ্ছা রিমির মায়ের নামটা কী আপনার জানা আছে?
