ফুলমতীকে সবাই খুব পছন্দ করত। বিশাল চওড়া কপালে সিঁদুর এঁকে ও যখন পথ চলত তখন পথচারীরা মাথা নুইয়ে প্রণাম করত। ফুলমতীও শুঁড় দুলিয়ে প্রণাম গ্রহণ করত। হর্ষধ্বনি বেরিয়ে আসত পথচারীদের মুখ দিয়ে। প্রণামের ঘটা পড়ত পুজোর মৌসুমে। বিশেষ করে দুর্গা আর কালী পুজোয়। শুধুতো রাজার সাথে সম্পর্ক না, সম্পর্ক দেবতা গণেশের সাথেও। পাহাড়িদের মধ্যে হিন্দুই প্রধান। তাই ফুলমতীর খাতিরও ছিল বেশি। রাজার হাতি বলে কথা!
এসডিও মি. নিবলেটের কাছে ফুলমতী অসাধারণ। ব্রিটেনের মহারানির দূরসম্পর্কের আত্মীয় তিনি। দূর হলেও সম্পর্ক তো একটা আছে। সেই বংশের ছেলেকে আসতে হলো ভারতবর্ষে। ভারতবর্ষের কোনো একটি ভালো জায়গা হলে তবু কথা ছিল, আসতে হলো পূর্ববঙ্গের খাগড়াছড়ি নামে এক মহকুমায়। যেখানে সমতল ভূমি বলতে গেলে নেই। যেখানকার অধিকাংশ মানুষ পাহাড়ি। নিবলেট অবশ্য ভেবে পান না এই জীবগুলোকে মানুষ অর্থাত্ ‘হিউম্যান বিইং’ কেন বলা হয়। বঙ্গদেশ শুনে আগেই বেঁকে বসেছিলেন মিসেস নিবলেট। ওখানে যেমন মশা, তেমনি ম্যালেরিয়া আর জলদস্যু। খাগড়াছড়ির কথা শোনার পর জানিয়ে দিলেন লন্ডন ছাড়বেন না। নিবলেট বরং ওখানে যাক। বছরে একবার ক্রিস্টমাসের ছুটিতে যেন বেড়িয়ে যায়। আর যেন চেষ্টা করে দ্রুত বঙ্গদেশ ছেড়ে চলে আসতে।
সেরকম ইচ্ছে নিয়েই এসেছিলেন নিবলেট। কিন্তু সব যেন ওলাটপালট হয়ে গেল। ব্রিটেনে রাজা আছে সে তো নিবলেটের জানাই, কিন্তু জানত না খাগড়াছড়ির পাথুরে পাহাড় আর আরণ্যক পরিবেশেও একজন রাজা আছে। আর সে রাজাকে পাহাড়িরা দেবতা মনে করে। এ রাজা আর কেউ না, এসডিও। খাগড়াছড়ি পৌঁছাবার পর দলে দলে মানুষ তাকে দেখতে এল। কারো হাতে এক সের চাল, কারো হাতে ছোট একটা মুরগি, কারো হাতে এক প্যাকেট সিগারেট আর দিয়াশলাই। কিছু না কিছু হাতে আছেই। খালি হাতে কেউ আসেনি। রাজদর্শনে এসেছে তারা। এ রাজা তাদের দেবতা। দেবতাকে খালি হাতে দেখা যায় না। দেবতার আসম্মান হয়, যে দেখে তার অকল্যাণ হয়। নিবলেট চেয়েছিলেন ওদের ফিরিয়ে দিতে। বাংলোর স্টাফদের বলেছিলেনও সে কথা। কিন্তু ওরা সরেনি। নড়েনি। রাজাকে সন্তুষ্ট না করে ওরা যাবে না। রাজা তাদের জিনিস গ্রহণ করেনি এর মানে রাজা অপ্রসন্ন। রাজাকে প্রসন্ন করে তবে তারা এ জায়গা ছাড়বে। প্রয়োজনে দিনের পর দিন বসে থাকবে, কিন্তু রাজার অর্ঘ তাকে না দিয়ে যাবে না। পরিস্থিতি বুঝে শেষপর্যন্ত নরম হলেন নিবলেট। তার নির্দেশে অর্ডারলি জিনিসগুলো বাংলোর ভেতরে নিয়ে গেল। পাহাড়িদের সেকি উল্লাস! রাজার জয়ধ্বনি করতে করতে চলে গেল তারা। যাবার আগে কেউ কেউ অর্ডারলি মংলুর কাছে জানতে চাইল, ‘রাজার বিয়া কোথায়?’ বিয়া মানে বউ। মংলু জানাল, বিয়া সাতসমুদ্দুর তেরো নদীর ওপারে। মন খারাপ করল পাহাড়িরা রাজার বিয়াকে দেখতে না পেয়ে। অনুরোধের সুরে বলে গেল রাজা যেন বিয়া নিয়ে আসে। রানি ছাড়া কি রাজাকে মানায়!
এসব দেখে শুনে নিবলেট অবাক। তার চেনাজানা গণ্ডির মধ্যে এমন মানুষ নেই। সরলতার কি যেন এক অদৃশ্য জাদু আছে। সবচেয়ে কঠিন মানুষটিও বোধকরি সে জাদুর জালে জড়িয়ে যায়। নিবলেটের ক্ষেত্রে সেটাই ঘটল। কথা ছিল এখানে যোগদানের পরই ফিরে যাবার চেষ্টায় নামবেন। কিন্তু চেষ্টা তো দূরে থাক, তার অসন্তুষ্টির কথা মুখ দিয়ে উচ্চারণ পর্যন্ত করলেন না।
নিবলেটকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করল ফুলমতী। রাজার বাহন। পাহাড়ি এলাকায় এছাড়া উপায়ই বা কী। রাস্তাঘাট নেই যে গাড়িঘোড়ায় চড়বেন। তবে হাতিতে চড়লে নিজেকে সত্যিকার রাজা রাজা মনে হয়—গাড়ি ঘোড়ায় যা হয় না। এ ব্যাপারটা বড় আনন্দ দিত নিবলেটকে। মনে হতো তিনি সারা পৃথিবীর রাজা। তবে মাঝে মাঝে যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা গজেন্দ্রগমনে পথ চলত ফুলমতী, অসহ্য হয়ে উঠতেন নিবলেট। হাতির পিঠে কাহাতক বসে থাকা যায়! চাবুক চড় চাপড়ে কাজ হতো না। নিবলেট মাহুতকে বলতেন, পেছনে আগুন দিতে। কাজ হতো তাতেই। আগুনের আভাস পেয়ে ছুটতে শুরু করত ফুলমতী। আর সবচেয়ে অসহ্য লাগত যখন ফুলমতী রাস্তার ধারের কোনো নোংরা জায়গা থেকে পানি তুলত আর একটু পর পর হোসপাইপ দিয়ে ছিটানোর মতো করে ছিটিয়ে সারা শরীর ভিজিয়ে দিত নোংরা পানিতে। সাধারণত গরমের দিনে এ ঘটনা বেশি ঘটত।
খাগড়াছড়ি পৌঁছাবার পর প্রথমদিন ফুলমতীকে মি. নিবলেটের সামনে হাজির করে মাথা নুইয়ে কুর্নিশ করল মাহুত। হর্ষধ্বনি তুলে শুঁড় নামিয়ে কুর্নিশ করল ফুলমতী। দোভাষী জানাল ওর নাম ফুলমতী। সারাদিন বাংলোতে থাকে। রাতে বাংলো থেকে সামান্য দূর পাহাড়ের পাদদেশে ওর থাকার ব্যবস্থা। সেখানে কলাগাছ, বাঁশের পাতা খায়। হাতির খাবার বলে কথা! প্রচুর খাবারের দরকার হয়। নিবলেট জানতে চাইলেন, এ খাবার কীভাবে জোগাড় হয়। দোভাষী জানাল, সরকারি বরাদ্দ দিন দুই টাকা। তাতে কিছুই হয় না। তবে ফুলমতীর খাবারের অভাব হয় না। পাহাড়িরা তাকে দেবতা মনে করে, ভালোবাসে। তারাই কলাগাছ বাঁশের পাতা দিয়ে যায়। তাছাড়া পাহাড়ি এলাকায় গাছপালার অভাব নেই।
ফুলমতীর প্রধান কাজ এসডিও সাহেবকে বহন করা। তবে মাঝে মঝে ঠেকা বেঠেকায় অন্য কাজও করতে হয়। হয়তো কখনো ডাক নিয়ে যেতে হয়। একবার তো এক লোহার সিন্দুক পড়ে গিয়েছিল পানিতে। সব চেষ্টা ব্যর্থ হবার পর ফুলমতী শুঁড় দিয়ে সে সিন্দুক তুলে দিয়েছিল।
দিনে দিনে ফুলমতী নিবলেটের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠল। ফুলমতীর বুদ্ধির প্রাখর্য্য দেখে মাঝে মাঝে চমকে উঠতেন নিবলেট। একবার পাহাড় থেকে বিশাল এক পাথর ফুলমতীর পায়ের ওপর গড়িয়ে পড়ল। মারাত্মক আহত হলো ফুলমতী। নিবলেট ফুলমতীকে দেখতে গেলেন। মাহুতকে জিজ্ঞাসা করলেন, কোথায় ব্যথা পেয়েছে ফুলমতী? মাহুত কিছু বলার আগেই ফুলমতী নিজের পা তুলে দেখাল। আনন্দে অভিভূত হলেন নিবলেট। ওর পিঠে হাত বোলালেন। হর্ষধ্বনি করে উঠল ফুলমতী। শুঁড় বেঁকিয়ে নিবলেটের পিঠে আদরের স্পর্শ বোলাল। গভীর ঝোপঝাড় দিয়ে পথ চলার সময় ফুলমতী শুঁড় দিয়ে গাছপালা উঁচু করে ধরে রাখত যাতে নিবলেটের গায়ে না লাগে। বাঁশের সাঁকো বা পানির ওপরের সংকীর্ণ পথ দিয়ে চলার সময় আস্তে পা ফেলে আগে পরীক্ষা করে নিত ভার বহন করতে পারবে কি না। কখনো সন্দেহ হলে পা না ফেলে সরাসরি নেমে যেত পানিতে। বিন্দুমাত্র ঝুঁকি নিত না। নিবলেট কতবার যে ভিজে একসার হয়েছেন তার লেখাজোখা নেই। নিবলেটের ব্যাপারে বড় সতর্ক ছিল ফুলমতী। সুউচ্চ পাহাড়ের ওপর দিয়ে পথচলার আগে ফুলমতী শুঁড় বেঁকিয়ে বারবার দেখে নিত পিঠের সাথে শক্ত করে নিবলেটকে বাঁধা হয়েছে কি না। পছন্দ না হলে বিরক্তি প্রকাশ করত। কখনো কখনো আট-দশবার বাঁধন খুলে আবার বাঁধতে হয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত সন্তুষ্ট না হতো নিবলেটকে নিয়ে পথে নামত না ফুলমতী।
কোথা দিয়ে যে গড়িয়ে গেল একটি বছর, বুঝতে পারলেন না নিবলেট। ক্রিস্টমাস। লন্ডনে যাবার যে খুব ইচ্ছে ছিল তাও নয়। কিন্তু কি দেশি কি বিদেশি সবাই কমবেশি সামাজিকতার জালে বন্দি। নিবলেটকে বিদায় জানাল ফুলমতী। শুঁড় ঝুঁকিয়ে সালাম করল। নিবলেট ওর পিঠে আদরের স্পর্শ বোলালেন। অবাক হয়ে দেখলেন, ফুলমতীর দুই চোখ গড়িয়ে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা পানি।
ছুটি ফুরোবার আগেই ফিরে আসার তোড়জোড় শুরু করলেন নিবলেট। মিসেস অবাক হয়ে বললেন—
:হোয়াই আর ইউ সো হারি। ইজ দেয়ার এনি থিং স্পেশাল হুইচ মেক ইউ ক্রেজি?
:ইয়েস দেয়ার ইজ ফুলমতী। আই লাইক হার, আই লাভ হার টু।
তাকিয়ে রইলেন ডেইসি। এ তো আর বাঙালি মেয়ে নয় যে কেঁদে কেটে একাকার হবে। ধীরে ধীরে বললেন,
:ফুলমতী। গুড নেম। ইজ সি এ ট্রাইবাল গার্ল, ইজ সি মোর বিউটিফুল দ্যান মি?
:ইয়েস, অফকোর্স। বাট সি হ্যাজ আইভোরি টিথ, জায়গান্টিক বডি অ্যান্ড লং ট্রাঙ্ক।
হেসে উঠলেন ডেইসি।
:ওহ ডিয়ার, ইউ আর সো নটি।
এরপর বায়না ধরে বসলেন তাকে হাতির দাঁত এনে দিতে হবে। তিনি হাতির দাঁতের গয়না বানাবেন। নিবলেট বোঝাতে চেষ্টা করলেন হাতির দাঁত জোগাড় করা সহজ নয়। মরা হাতি পাওয়া যায় বটে তবে তার দাঁত আগেই উধাও হয়ে যায়। ডেইসির এক কথা, দূরে যাবার দরকার কি, হাতের কাছে তো হাতি একটা রয়েছেই। ওটাকে মেরে ফেললেই হয়ে যায়। নিজের হাতি, ওটার দাঁত কেউ খুলে নিতে পারবে না। নিবলেট হ্যাঁ না কিছুই বলেন না। অধৈর্য ডেইসি শেষ পর্যন্ত বললেন, গিয়েই হাতিটাকে মেরে ফেলবে। তারপর দাঁত খসিয়ে খবর পাঠাবে। লেট হলে আমি নিজেই চলে আসব।
ফিরতি পথে দেখা বন্ধু শাহের সাথে। ইরানের শাহের ছোটভাই এ শাহের সাথে নিবলেট লেখাপড়া করেছেন অক্সফোর্ডে। খাগড়াছড়ির গল্প শুনে শাহ মোহিত। তার শিকারের বড় শখ। শিকারের এমন মোক্ষম সুযোগ আর পাওয়া যাবে না। বিশেষ করে নিবলেট ওখান থেকে বদলি হয়ে এলে পুরোটাই বরবাদ। এ সুযোগ ছাড়া যায় না। যেচে নিবলেটের অতিথি হলেন শাহ ।
শিকারে যাবার আগে অবশ্য মাহুত বারবার সাবধান করে দিয়েছিল, শাহ যেন একসাথে বেশি গুলি না করেন। হাতির কান খুব বড়। সে ছোট শব্দও জোরে শুনতে পায়। একবারে বেশি শব্দ শুনলে সে ভয় পেয়ে যায়। তাই গুলি করতে হবে রয়ে সয়ে। মাহুত বলেছিল ঠিকই কিন্তু নির্দেশ মেনে চলতে পারেনি শাহ। পাহাড়ের ঢালুতে বুনোহাতির ঝাঁক দেখে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুড়তে শুরু করেছিল। আচমকা আক্রান্ত হয়ে দিগিবদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছিল হাতির ঝাঁক। বিকট শব্দ তুলে ছুটতে শুরু করেছিল তারা। আর এতসব শব্দে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল ফুলমতী। উন্মাদের মতো ছুটতে শুরু করেছিল। ছোটার এক পর্যায়ে দড়ি ছিঁড়ে ফুলমতীর পায়ের নিচে পড়ে চেপ্টা হয়ে গিয়েছিলেন নিবলেট।
নিবলেটের শেষকৃত্যানুষ্ঠান দাঁড়িয়ে দঁড়িয়ে দেখেছিল ফুলমতী। গভীর হাহাকার তুলে নিজের বুকে আঘাত করছিল বারবার। কিন্তু তার সেই হাহাকারের ভাষা বুঝতে পারেনি কেউ।
এরপর মাসখানেক বেঁচে ছিল ফুলমতী। এই এক মাসে মুখে কিছুই তোলেনি সে। শুধু অবিরল ধারায় গড়িয়ে পড়েছে অশ্রু। ফুলমতীর মৃত্যুর পর মাহুত কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, রাজাবাবু মরে যাবার দুঃখে না খেয়ে খেয়ে আত্মঘাতী হলো ফুলমতী। যে ছিল তার রাজা, সেই কি না মারা গেল পায়ের নিচে পড়ে—একথাই সারাক্ষণ ভাবত ফুলমতী।
ফুলমতী মারা যাবার পর পর ডেইসি এসেছিল। কিন্তু সে ফুলমতীরর দাঁত খুলে নিতে পেরেছিল কি না জানা যায়নি।
