লাঠি লজেন্স

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০১৯, ১৯:৩৩

প্রায় বছর জুড়েই বিনুদের বাড়ির চারদিকে জলে থৈ থৈ করে। নদীর বুকে জাগা চরে, গোলপাতার ছাউনি দেওয়া কুঁড়েঘরে তাদের বাস। বিনুর বাবা সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করে, আর বিনুর মা নদীতে মাছের পোনা ধরে। মাঝে মধ্যে সঙ্গে বিনুও থাকে। বিনুর বাবা তাকে আদর করে বলে, বিনু মা, তোকে একদিন সুন্দরবন দেখাতে নিয়ে যাব। বিনু বলে, না না, আমার ভয় করে! আমি যাব না বাবা। বাবা হেসে বলে, ভয় পেলে কী হয় মা! আমরা হলাম নদী-বনের মানুষ। বিনু বাঘকে ভীষণ ভয়। মায়ের কাছে গল্প শুনেছে, মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বিনুর দাদুকে বাঘে খেয়েছে। সেই থেকে বিনুর মনে ভয় বাসা বেঁধেছে। 

নদীর চরে কাশবন ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে। বিনুদের বাড়ি থেকে কাশবন দেখা যায়। বিনু সুযোগ পেলেই সমবয়সীদের সঙ্গে কাশবনে লুকোচুরি খেলে। সাদা সাদা কাশফুল ভারি ভালো লাগে তার। বিনুদের বাড়িতে একটা শিউলি ফুলগাছও আছে। রোজ ভোরে বিনু মুঠোভরে শিউলি ফুল কুড়ায়। বিনু জানে, কাশ আর শিউলি ফুল ফুটলেই দুর্গাপুজোর সময় হয়। বিনুর মামাবাড়ির পাশে ধুমধাম করে দুর্গাপুজো হয়। দিনরাত ঢাকঢোল আর কাঁসর বাজে। এবারও শখ মামাবাড়ি যাবার; কিন্তু মা বলেছে, এবার বাবার হাতে টাকাপয়সা নেই। তাই পুজোয় যাওয়া হবে না। শুনে, বিনুর খুব মন খারাপ হয়। সে মায়ের সঙ্গে পোনা সংগ্রহ করতে করতে বলে, মা, বাবা পুজোয় নতুন জামা কিনে দেবে তো? মা বিনুর কথার কোনো উত্তর দেয় না। বিনুর খুব মন খারাপ হয়। বাড়ি ফিরে সে বাবাকে বলে, বাবা, আমি তোমার সঙ্গে বনে যাব? বাবা অবাক হয়ে বলে, বিনু মা, তুমি তো বলেছিলে তোমার বাঘ দেখে ভয় করে। বিনু অভিমান করে বলে, না করবে না। মনে মনে বলে, বাঘে আমায় খেয়ে নিক!

নদীর ওপারের গাঁয়ে বিনুর মামার বাড়ি। গেল বছর মামা বিনুকে দশমীর মেলা থেকে অনেকগুলো লাঠি লজেন্স কিনে দিয়েছিল। রঙিন রঙিন সব লজেন্স। বিনু অনেকদিন রেখে সেগুলো খেয়েছিল। বিনুর বাবা মাসে একবার নদীর ওপারের হাটে গিয়ে কাজের জিনিসগুলো কিনে আনে। সেখানে নৌকায় যেতে অনেকটা সময় লাগে। বিনুদের চরে কোনো স্কুল নেই। গতবছর পুজোর সময় মামা বলেছিল, বিনুকে তাদের গাঁয়ের স্কুলে ভর্তি করে দেবে। রোজই বিনু নৌকা দেখে। কাছাকাছি কোনো নৌকা এলেই তার মনে হয়, এই বুঝি মামা এল। রোজ নদীর বুকে সূর্য ডুবে যায়। মামা আসে না! বিনু মায়ের কাছে বায়না করে বলে, মাগো চলো না, মামাবাড়ি যাই। মা বলে, পুজো আসুক তারপর দেখা যাবে। বিনু জানে, মা না যাওয়ার জন্যই এমনটা বলছে। খুব ইচ্ছে করে লাঠি লজেন্স খেতে। বিনুদের ঘরে দেবী দুর্গার একটা ফটো আছে। যাতে মা সকালসন্ধে পুজো দেয়। বিনু সেই ছবির সামনে গিয়ে বলে, মা বলেছে, তুমি সবার মা। তুমি সবার ইচ্ছে পূরণ করো। তাহলে আমার ইচ্ছে কেন পূরণ করো না। আমার তো শুধু দুটো ইচ্ছে—স্কুলে পড়া আর লাঠি লজেন্স খাওয়া। ছবি কোনো কথা বলে না। খুব অভিমান হয় বিনুর! সে মন খারাপ করে কাশবনে গিয়ে বসে থাকে। বসে থাকতে থাকতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে। রাত হয়। বিনু ঘরে ফেরে না। মা অস্থির হয়ে ওঠে। আলো জ্বালিয়ে চরের মানুষেরা বিনুকে কাশবনে খুঁজে পায়। সকলেই জেনে যায় বিনুর মন খারাপের কারণ।

বিনুদের চরগ্রামে এবার দুর্গাপুজো হবে। আনন্দ ধরে না তাদের। এতদিন চরগ্রামে শুধু বনদেবীর পুজো হতো। গ্রামের মানুষের সামর্থ্যও নেই। কিন্তু এবার ছোট্ট বিনুর আশা পূরণ হবে। পোনা ব্যবসায়ী রহিম মিয়া বিনুর মায়ের হাতে বেশকিছু টাকা দিয়ে বলে, ছোট্ট আম্মা বিনুর চাওয়াই যদি আমরা পূরণ করতে না পারি, তবে মানুষ হলাম কিসে! মাকে ভরসা দিয়ে বলে, বিনুরা এখন থেকে স্কুলেও যেতে পারবে।

বিনুদের চরগ্রামের কাশবনের ধারে বসেছে দশমীর মেলা। সকলের চোখেমুখে খুশির ঝিলিক। নতুন পোশাক পরে করিম, আমেনা, মিনু, রনি, বিনুসহ চরের সকল শিশু মজা করে লাঠি লজেন্স খায়।