চিত্রকর

আমার অগ্রজ রশিদ চৌধুরী

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৯:৪৭

 

রশিদ চৌধুরী—পুরো নাম রশিদ হোসেন চৌধুরী। জন্ম ফরিদপুর জেলার হারোয়া গ্রামে ১ এপ্রিল ১৯৩২। তাঁর অতি শৈশবকালেই আমাদের আদিবাস প্রমত্তা পদ্মা গ্রাস করে নেয়। পরে নিকটস্থ রতনদিয়া গ্রামে আমরা স্থানান্তরিত হই, যেটা বর্তমান রাজবাড়ি জেলার অন্তর্গত। পিতা ইউসুফ হোসেন চৌধুরী ছিলেন এক জমিদার পরিবারের সর্বশেষ প্রতিনিধি। পরিবারের পুরনো জৌলুস না থাকলেও সাঁইত্রিশ একর জমি জুড়ে ছিল বিশাল আটচালা বাড়ি। চারদিকে বড় বড় পুকুর। নয় ভাই চার বোনসহ আত্মীয়স্বজন ও কাজের লোকের বিরাট বহরের মধ্যেই কেটেছে রশিদ ভাইয়ের শৈশব-কৈশোর।

১৯৫৪ সালে আর্ট কলেজের পাঠ শেষ করে ১৯৫৬ সালে স্পেন সরকারের বৃত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য যান। স্পেনে তিনি সেন্ট্রাল স্কুল অব ফাইন আর্টস-এ ধ্রুপদী চালে প্রতিকৃতি ও মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর ভাস্কর্য নিয়ে অধ্যয়ন করেন। ১৯৫৮ সালে স্পেন থেকে দেশে ফিরে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে। দু’বছর পর আবার বৃত্তি পেয়ে বিদেশযাত্রা। এবার গন্তব্য শিল্পরসিকদের স্বর্গভূমি প্যারিস। সেখানে তিনি বিখ্যাত চারু বিদ্যালয় ‘একাডেমি অব জুলিয়াঁ’ থেকে ভাস্কর্য, ফ্রেসকো এবং ট্যাপেস্ট্রির (বয়নশিল্প) ওপর উচ্চতর ডিগ্রি নেন। এখানে অধ্যয়নকালেই তাঁর মনে এক নবচেতনার উন্মেষ ঘটে—প্রচলিত ধারা নয়, এমন একটি মাধ্যম চাই যে মাধ্যমে তিনি স্বদেশের নিসর্গ ও মানুষকে তুলে ধরতে পারেন। এ বিষয়ে তাঁর নিজের উপলব্ধি : ‘প্রচলিত তেল ও জলরঙে আমার মন ভরত না। এই যেমন পিয়ানো ও অর্গান অপূর্ব যন্ত্র হলেও এককভাবে সংগীতজগতে এদের ভূমিকা জোরালো নয়, ঠিক তেমনি শিল্পজগতেও প্রচলিত রীতির মধ্যে রয়েছে প্রতিবন্ধকতা। তাই আমি এমন একটি মাধ্যম খুঁজছিলাম যার মাধ্যমে দেশমাতৃকার নিসর্গ ও মানুষকে তুলে ধরতে পারি। আমার সন্ধান অবশেষে সার্থক হলো—ট্যাপেস্ট্রিতে পেলাম আমার ঠিকানা।’

চারুশিল্পের প্রায় সবকটি মাধ্যমেই তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ ছিল। এক্ষেত্রে তাঁকে একজন সব্যসাচী শিল্পী বললেও অত্যুক্তি হবে না। এবং সবগুলো মাধ্যমেই তিনি তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তবে এদেশে তিনি ট্যাপেস্ট্রি শিল্পী হিসেবেই বেশি পরিচিত। এদেশে তিনিই এই শিল্পমাধ্যমের পথিকৃত্। আবহমান কাল থেকে এদেশের জামদানি, মসলিন, নকশিকাঁথা ইত্যাদি এই জনপদের জনচিত্ত জয় করে বিশ্ব দরবারে এর আসন সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। সেই আবহমানতার সূত্র ধরেই রশিদ চৌধুরী নিয়ে এলেন ট্যাপেস্ট্রি।

এদেশের শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে রশিদ ভাইয়ের অবদান অপরিসীম। সাতচল্লিশ পরবর্তী সময়ে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের অভিভাবকত্বে এদেশে শিল্পচর্চার শুরু। শিল্পশিক্ষা গ্রহণের জন্য সবাইকে নির্ভর করতে হতো একমাত্র ঢাকার ওপর। চট্টগ্রাম ছিল অনেক পিছিয়ে। সেখানে চারুশিল্প শিক্ষার তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল না, পরিবেশও ছিল না। রশিদ চৌধুরীর উদ্যোগে এবং অক্লান্ত প্রচেষ্টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা বিভাগ আত্মপ্রকাশ করে। এখানেই তিনি থেমে থাকেননি, চট্টগ্রাম শহরে একটি আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠাও তাঁরই ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফসল। এক্ষেত্রে শিল্প-সংগঠক হিসেবেও তিনি একজন কীর্তিমান মানুষ।