বাণিজ্যিক ফুলচাষে এগিয়ে এসেছেন যশোরের নারীরা। ঘরের কাজের পাশাপাশি এখন তারা নিজেদের উদ্যোক্তা হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করছেন। আত্মপ্রত্যয়ী এ নারীরা দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি অভাবের সংসারে সচ্ছলতাও ফিরিয়ে এনেছেন। তাদের এ অগ্রযাত্রায় বন্ধুরপথে রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা।
১৯৯৫ সালে ঈসমাইল হোসেনের সঙ্গে বিয়ের সুবাদে ‘ফুলের সাম্রাজ্য’ যশোরের গদখালির পানিসারা গ্রামে বধূ হয়ে আসেন হাফিজা খাতুন হ্যাপি। কিন্তু ফুলের সাম্রাজ্যের বাসিন্দা হলেও সুখের কোনো ছোঁয়াই ছিল না স্বামী ঈসমাইলের সংসারে। বরং অভাব-অনটনই ছিল এ পরিবারের নিত্যদিনের সঙ্গী। তবে এই অভাব হতাশার ছাপ ফেলতে পারেনি নববধূ হাফিজার মনে। নতুন সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ফুলচাষে নেমে পড়েন ৮ম শ্রেণি পাশ হাফিজা খাতুন হ্যাপি। ২০০১ সালে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ১০ কাঠা জমিতে ফুলচাষ শুরু করেন তিনি। তারপর থেকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। বর্তমানে ১০ বিঘা জমিতে ফুলচাষ করছেন। হয়েছেন প্রায় কোটি টাকার সম্পদের মালিক। দেশের বিভিন্ন স্থানের ফুলচাষিরা এখান থেকে চারা ক্রয় করে নিয়ে যান। এছাড়াও তার রয়েছে কমলালেবুর বাগান। সেখান থেকে যে আয় হয় তা দিয়ে সংসার খরচ ও দুই ছেলের লেখাপড়া চলছে। তৈরি হয়েছে পাকাবাড়ি। শুধু হাফিজা খাতুন হ্যাপি নয়; ফুলচাষে হাজেরা খাতুন, মৌসুমি আক্তার, পারভিন সুলতানারা স্বাবলম্বী।
১৯৮৩ সালে যশোরে বাণিজ্যিকভাবে শুরু হয় ফুলচাষ। বিশেষ করে ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী, পানিসারা ইউনিয়নসহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে বাণিজ্যিকভাবে উত্পাদিত হচ্ছে রজনীগন্ধা, গোলাপ, জারবেরা, গাঁদা, গ্লাডিউলাস, জিপসি, রডস্টিক, কেলেনডোলা, চন্দ্রমল্লিকাসহ ১১ ধরনের ফুল। শুরু থেকেই পুরুষের সঙ্গে এ কাজে সহায়তা করে আসছেন নারীরা। এ অবস্থায় ২০০৭ সাল থেকে নারীরা উদ্যোক্তা হিসেবে ফুলচাষ শুরু করেন। এ কাজ করেই ইতিমধ্যে ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছেন এ অঞ্চলের অনেক নারী।
ফুলচাষি হাজেরা খাতুন বলেন, আগে আমাদের তিনবেলা ঠিকমতো খাবার জুটত না। এই ফুলচাষ থেকে এখন আমার দুই ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া করাচ্ছি। একটি ঘরও করেছি।
গদখালী উত্সব এগ্রো মহিলা সমবায় সমিতির সভানেত্রী নাসরিন নাহার আশা বলেন, আত্মপ্রত্যয়ী নারীদের দেখাদেখি অনেকেই এগিয়ে আসছেন। বর্তমানে এসব এলাকার ৪৫ জন নারী সরাসরি উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। শুধু চাষ নয়; এখানে ফুলতোলা, গাঁথা, ফুলের প্যাকেজিং করা, ফুলের বীজ সংরক্ষণসহ সবকিছুই নারীরা করছেন। তিনি বলেন, ফুল একটি লাভজনক চাষ। বাড়িতে গৃহস্থলি কাজের পাশাপাশি নারীরা এই কাজ করে বাড়তি আয় করে থাকেন। এ অগ্রযাত্রার বন্ধুরপথ মসৃণ করতে উন্নত প্রশিক্ষণ ও সহজশর্তে ঋণ প্রয়োজন বলে জানান নাসরিন নাহার আশা।
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দীপঙ্কর দাস বলেন, চলতি বছর ঝিকরগাছার গদখালী এলাকায় ৬৩২ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের ফুলচাষ হয়েছে। বর্তমানে ছয় হাজার মানুষ ফুলচাষের সঙ্গে জড়িত। যার মধ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় অর্ধেকই নারী। আর বর্তমানে চার শতাধিক নারী সরাসরি ফুলচাষের সঙ্গে জড়িত। ফুলচাষে জড়িত নারীদের উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের সহায়তা করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
