নদীমাতৃক বাংলাদেশের জীবনপ্রবাহ একসময় অনেকটাই নদীকেন্দ্রিক ছিল। এই দেশের ভূপ্রকৃতি, মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি এককথায় গোটা জীবনপ্রবাহ গড়িয়া উঠিয়াছিল নদনদীকে ঘিরিয়া। কিন্তু বর্তমানে পূর্বতন সেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়াছে। মানবসৃষ্ট অপকর্মের কারণে বিলুপ্ত হইয়াছে অনেক নদনদী, যেসব নদী টিকিয়া আছে তাহাদের অবস্থাও সঙ্গিন। একসময় দেশে নদনদীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২০০ কিন্তু এখন ২৩০টির মতো টিকিয়া আছে। যদিও বাস্তবে সবগুলো সচল নাই। নদীগুলোর এই দুর্দশার জন্য অনেক কিছুই দায়ী : ক্রমবর্ধমান নগরায়ণ, শিল্পায়ন, নদীদখল ইত্যাদি ইহার মধ্যে। বিশেষ করিয়া রাজধানী ঢাকার আশপাশের নদীগুলো শিল্পায়নের কালো থাবায় পড়িয়াছে। নদীগুলো শিল্পবর্জ্যে দূষিত হইতে হইতে এখন প্রাণহীন, পানি হইয়া পড়িয়াছে ব্যবহারের অনুপযোগী। ‘এশিয়ান ওয়াটার ডেভেলপমেন্ট আউটলুক-২০১৬’-এর তথ্য অনুযায়ী, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের ৪৮টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দূষিত বাংলাদেশের নদীর পানি। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, দূষণের ভয়াবহ শিকার শহরের পার্শ্ববর্তী নদীগুলি। ইহার ব্যতিক্রম নহে গাজীপুরের নদী ও খালগুলি। শহরের ইটিপিবিহীন কারখানাগুলির বর্জ্য সরাসরি পড়িতেছে নদীতে। এইসব কারখানার বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর বারবার অভিযান পরিচালনা করিয়াও তাহাদেরকে ইটিপি ব্যবহারে বাধ্য করিতে পারিতেছে না। নদী দূষণের কারণে শুষ্ক মৌসুমে গাজীপুরের নদনদী ও খাল-বিলের পানি কুচকুচে কালো রং ধারণ করে, এমনকি এখন এই বৃষ্টির মৌসুমেও পানির রং কালোই থাকিতেছে। গাজীপুর পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গিয়াছে, গাজীপুরে বেশ কিছু কারখানা রহিয়াছে যেইগুলিতে ইটিপি থাকার প্রয়োজনীয়তা সত্ত্বেও তাহা নাই। এই ধরনের অন্তত ৩৫টি কারখানাকে চিহ্নিত করা হইয়াছে। এইসব কারখানাকে এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রমের মাধ্যমে একাধিকবার জরিমানা আদায় করা হইয়াছে। আবার ইটিপি থাকিলেও খরচ বাঁচানোর জন্য ব্যবহার করিতেছে না অনেকে। কারখানাগুলি তাহাদের দূষিত পানি ইটিপি ব্যবহার না করিয়া বাইপাসের মাধ্যমে নদী ও জলাশয়ে ফেলিতেছে।
ইহা কেবল গাজীপুরের কারখানাগুলোর অবস্থা নহে বরং সার্বিকভাবে শিল্পকারখানাগুলোর অবস্থাই এইরূপ। বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ (বিসিএএস) কর্তৃক পরিচালিত একটি শিল্প জরিপ মতে, প্রায় ৪০ শতাংশ শিল্প কারখানায় ইটিপি রহিয়াছে। ১০ শতাংশ শিল্পের মধ্যে, ইটিপি নির্মাণাধীন রহিয়াছে এবং প্রায় ৫০ শতাংশ শিল্পের কোনো ইটিপি নাই। তাই আমাদের শিল্পের কী পরিমাণ বর্জ্য নদীর বুকে নিক্ষিপ্ত হইতেছে তাহা অনুমেয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের এক সমীক্ষায় দেখা গিয়াছে, প্রতিদিন রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোতে সাড়ে ৪ হাজার টন বর্জ্য ও ৫৭ লাখ গ্যালন দূষিত পানি গিয়া পড়িতেছে! চট্টগ্রামের কর্ণফুলীর তীরে, পদ্মায় মাওয়া ঘাটের পাশে, মেঘনার তীরে দ্রুত শিল্পায়ন হইতেছে। এইসব শিল্পকারখানার বেশির ভাগই বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা করিতেছে না বলিয়া প্রতিবেদনে উঠিয়া আসিয়াছে। নদী দূষণের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ইহা সার্বিকভাবে পরিবেশ দূষণের সঙ্গে সঙ্গে প্রাণিজগতের জীবনচক্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সকলকে নদীদূষণ রোধে কার্যকর ভূমিকা লইতে হইবে। শতভাগ শিল্পকারখানায় যাহাতে ইটিপি থাকে এবং উহা ব্যবহার করা হয় তাহা নিশ্চিত করিতে হইবে।
