প্রাসঙ্গিক দেবী দুর্গা

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০১৯, ২১:৩৩

প্রাচীনকালে, তখন বিজ্ঞানের উন্নত প্রযুক্তি তো দূরের কথা; মনের ভাব লিখে প্রকাশ করার মতো কাগজ-কলমও ছিল না। মুনি-ঋষিরা মুখে মুখে তত্ত্ব আলোচনা করতেন এবং অন্যরা শুনে শুনে তা রপ্ত করতেন। কঠিন বিষয় হলে পাহাড়ে-গুহাগাত্রে ছবি এঁকে বা খোদাই করে সমাজজীবনে চলার পথনির্দেশ দেওয়া হতো। এরকমই একটি চিত্র ধরা যাক ‘দুর্গতিনাশিনী দুর্গাদেবী’। তিনি মামুলি দেবী প্রতিমা নন। এ যেন তখনকার দিনের রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোর একটি নকশা বা প্ল্যান, বর্তমানে যাকে আমরা সংবিধান বলি।             একটা দেশকে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তথা সরকার পরিচালনা ও সুশাসনের জন্য মূলত পাঁচটি বিষয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতে হয়। তা হলো—১. জনগণ, ২. জনগণের প্রতিনিধি, ৩. শিক্ষা ৪. অর্থ ও ৫. প্রতিরক্ষা। এই পাঁচ বিষয়ের ওপর ব্যাখ্যা দুর্গাদেবীর নকশায় নিখুঁতভাবে সন্নিবেশিত আছে।

প্রথম ধাপ :দুর্গার দশ হাত জনগণের প্রতীক। দশজন বলতে আমরা আমজনতাকে বোঝাই। দশ হাতে দশ অস্ত্র—অর্থাত্ জনগণ নিজেদের দেশমাতৃকাকে রক্ষাকল্পে হাতের কাছে যা পায় তাই নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে লড়াই করবে অসুরের বিরুদ্ধে। অসুর বলতে আলাদা কোনো জাতের শক্তিশালী প্রাণী বা মানুষ নয়। এই সমাজে প্রচুর অসুর বাস করছে, যাদের মধ্যে মানবতা, বিবেক-বিবেচনা নেই।

দ্বিতীয় ধাপ—জনগণের প্রতিনিধি—গণদেবতা অর্থাত্ গণেশ। তার মূল লক্ষ্য হলো জনগণকে এক সুরে আবদ্ধ রাখা। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে, সমাজের কল্যাণে জনগণের ঐক্যবদ্ধ সহযোগিতার বিশেষ প্রয়োজন। সে কারণেই গণেশের মস্তকে একটা শুঁড় (সুর) সন্নিবেশিত হয়েছে। লাখ লাখ মানুষের অভাব-অভিযোগ, দাবি ইত্যাদির কথা গণেশকে শুনতে হবে। আমাদের কানে এত মানুষের কথা বাজলে কান ঝালাপালা করবে, বিরক্তি ও অধৈর্য আসবে। কিন্তু জনপ্রতিনিধি হলে সবার কথা ধৈর্যসহকারে শুনতে হবে। তার জন্য গণেশের কান দুটি কুুলার  মতো বিশাল। কথা শোনার ধৈর্য না থাকলে মনের উদারতা বা প্রসারতা জন্মায় না। গণেশ জনগণের কথা এক কানে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে দিতে পারেন না। পেটে কথা জমা রাখার ফলে তার পেট বা উদর ঝুলে পড়ার উপক্রম হয়েছে—ওটা ভুঁড়ি বাড়া নয়। তাই তার আরেক নাম লম্বোদর।

গণেশের কাজে সহযোগিতার জন্য তার বাহন করা হয়েছে ইঁদুরকে। কাজ হলো গৃহস্থের অতিরিক্ত শস্য বা ধন সংগ্রহ করা। যে জমিতে ভালো শস্য হয়, সেখানেই ইঁদুর লাগে এবং কিছু ফসল কেটে মাটির নিচে জমা রাখে। একশ্রেণির গরিব মানুষ সেই গর্ত খুঁড়ে ওই ফসল নিয়ে যায়। অতিরিক্ত শস্য গরিবের কল্যাণে ব্যয়িত হলো। বর্তমান রাষ্ট্র-সমাজে আয়কর বিভাগের (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) প্রতীক হলো ইঁদুর।

তৃতীয় ধাপ—শিক্ষা। রাষ্ট্র পরিচালনায় শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের সমস্ত লোকের আদর্শ শিক্ষার প্রয়োজন আছে বইকি। অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোকে বিকশিত করেন বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী  সরস্বতী। শিক্ষার আলো না থাকলে জনগণ ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় বুঝবে কী করে? এখনকার শিক্ষা দপ্তর, শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষাসূচি, শিক্ষকসমাজ সরস্বতীর ভূমিকায় আছে। পুঁথিগত বিদ্যার সঙ্গে সংগীত-কলা যাবতীয় শিক্ষার প্রয়োজন। সে কারণে সরস্বতীর মূর্তি ‘বীণা পুস্তক রঞ্জিত হস্ত’ সমন্বিত। আদর্শ শিক্ষায় শিক্ষিত হলে মানুষ সরল, শান্ত, সৌম্যকান্তিবিশিষ্ট হবে। সমস্ত মানুষ সদ্গুণবিশিষ্ট হলে দেশে অন্যায়কারী অসত্ লোক থাকবে না। সরস্বতীর শ্বেতবর্ণ তারই প্রতীক।

চতুর্থ ধাপ—অর্থ বা ধন। দুর্গার সঙ্গে আছেন অর্থ বা ধনের অধিষ্ঠাত্রী দেবী লক্ষ্মী। দেশের কাজ পরিচালনায় প্রতি পদক্ষেপে অর্থের প্রয়োজন আছে। দেশের উন্নয়ন, কর্মচারীদের বেতন প্রভৃতি খাতে বিশাল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়। সারাবছরের  আয়-ব্যয় হিসাব করে অর্থের জোগান দেয় অর্থ দপ্তর। অর্থসচিব ও অর্থমন্ত্রী। তাদের প্রতীক লক্ষ্মী। লক্ষ্মীর বাহন করা হয়েছে প্যাঁচাকে। প্যাঁচার সুতীক্ষ দৃষ্টি অন্ধকারেও শিকার ধরতে সহায়ক। কালোবাজারি, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা অন্ধকারের মতো কালো পথে কুকর্মগুলো করে থাকে। এসব কাজে কড়া নজরদারি করার জন্য প্যাঁচার দক্ষ নজরদারির ভূমিকায় আছেন অডিটর জেনারেল।

পঞ্চম ধাপ—প্রতিরক্ষা। দুর্গাকে সহযোগিতা করার জন্য দেব সেনাপতি কার্তিক পাশে আছেন। বাইরের শত্রুর হাত থেকে দুর্গাকে, অর্থাত্ দেশমাতাকে রক্ষার জন্য সেনাধ্যক্ষ হিসেবে অস্ত্রশস্ত্রসহ সর্বদা প্রস্তুত। তেমনি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে দেশকে রক্ষা করার নিমিত্তে পুলিশ, মিলিটারি, নৌসেনা, বায়ুসেনা ইত্যাদির মতো বাহিনীর দরকার হয়েছে—এসবের প্রতীক হলেন কার্তিক। কার্তিকের বাহন ময়ূর। ময়ূর হলো সর্বভুক। মারাত্মক মারাত্মক বিষ হজমের ক্ষমতা আছে তার। সেরকমই প্রতিরক্ষায় যাদের ভূমিকা পালন করতে হয়, তাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই ঝুঁকিপূর্ণ।

দুর্গাদেবীর সঙ্গে যেমন লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ ও কার্তিক নিজে নিজে দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে দেশমাতৃকাকে সহযোগিতা করেছেন, তেমনি বর্তমান শাসনব্যবস্থায় সবাই সঠিক ভূমিকা পালন করলে দেশে মহিষাসুরের মতো অসুরবিনাশ সম্ভব হবে। তবেই সার্বিক মঙ্গল, সার্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে।

n লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক