কেউ রাতারাতি কোটিপতি অনেকেই রাস্তার ফকির

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০১৯, ২১:০২

রাজশাহীতে জুয়ার আসর

স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী

রাজশাহীতেও বসে জমজমাট জুয়ার আসর। এতে জড়িতদের অল্প সংখ্যক রাতারাতি কোটিপতি হলেও অনেকেই সর্বস্ব হারিয়ে এখন রাস্তার ফকির। নিঃস্বের তালিকায় নানা শ্রেণি-পেশা ও বয়সের শত শত মানুষ। কেউ ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়ায়, কেউ জুয়ার টাকার জন্য বিভিন্ন সংস্থার ঋণের জালে আবদ্ধ। কেউ ঋণের টাকার জন্য ভিটেবাড়ি বিক্রি করে পথে নেমেছে। অন্যদিকে জুয়া পরিচালনা করে কেউ হয়েছে কোটিপতি। এক সময়ে তাদের দিন চলত অর্ধাহারে-অনাহারে। এখন তারা আলিশান বাড়ি, গাড়িসহ বিপুল জমির মালিক বলে জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বড়ো ধরনের ক্রিকেট টুর্নামেন্ট শুরু হলে রাজশাহী শহরের লক্ষ্মীপুর, শালবাগান মোড়, উপশহর, কাশিয়াডাঙ্গা মোড়, সপুরা মোড়, পাঠানপাড়া ও কোর্টবাজার এলাকায় বসে জমজমাট জুয়ার আসর। এছাড়া বিশ্বকাপ ক্রিকেট, বিশ্বকাপ ফুটবল থেকে যে কোনো বড়ো আসর পৃথিবীর যেখানেই বসুক, রাজশাহীর জুয়াড়িরাও মেতে ওঠে জুয়ায়। অন্যদিকে নগরীর অর্ধশতাধিক পয়েন্টে চলে তাসের মাধ্যমে জমজমাট জুয়া। এসব জুয়ার আসর নিয়ন্ত্রণ করে সরকার দলীয় স্থানীয় নেতাকর্মীরা। স্থানীয় একজন মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন নেতা ও জনপ্রতিনিধিও জুয়ায় জড়িত বলে জানা যায়। এছাড়া দীর্ঘদিন থেকে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশে কর্মরত অনেকে বিভিন্নভাবে জুয়ায় মদত দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, জুয়ার আসর নিয়ন্ত্রণ করে রাতারাতি কোটিপতি হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সপুরা, কোর্ট এলাকা, দাসপুকুর, লক্ষ্মীপুর এলাকার বেশ কয়েকজন রয়েছে। লাখোপতি বনে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কাদিরগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, পাঠানপাড়া, উপশহর, আলুপট্টি এলাকার অনেকে রয়েছে। সূত্রমতে, এদের নিয়ন্ত্রণেই রাজশাহীতে চলে জুয়া।

সূত্র জানায়, সাধারণত মোবাইলে  মেসেজ বা কল দিয়ে জুয়ায় বাজি ধরা হয়। কেউ সরাসরি বাজিতে অংশ নেয়। শহর যুবলীগের এক সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক জুয়ার ১৭ লাখ টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে এখন নিঃস্ব। এ কারণে তিনি হারিয়েছেন সংগঠনের পদও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শহর যুবলীগের আরেক নেতা বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, তার জন্য বিভিন্ন পাড়ায় প্রতিদিন সালিশ করতে হতো। পরে তাকে বহিষ্কার করেছেন। এখনো সে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।

নগরীর তেরোখাদিয়ার বাসিন্দা সুমন (৩৫) (ছদ্মনাম) এক সময় আরডিএ মার্কেটে ক্রোকারিজের ব্যবসা করতেন। প্রায় ১২ বছরের ব্যবসায় মাসে গড়ে ৫০ হাজার টাকার আয়ে তার সংসারে সচ্ছলতা ফিরেছিল। কিন্তু বন্ধুদের পাল্লায় জুয়ায় জড়িয়ে এখন তিনি নিঃস্ব। সুমন বলেন, বছর দেড়েক আগে দুটি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট চলার সময় জুয়ায় জড়িয়ে পড়েন। বাজিতে হেরে ক্রোকারিজের ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে হয়। তারপরও জুয়াড়িদের কাছে ঋণ দাঁড়ায় ১৭ লাখ টাকা। পরে বাবার ভিটা বিক্রি করে ১৩ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। এখনো তার চার লাখ টাকার ঋণ রয়েছে। টাকার জন্য জুয়াড়িরা প্রায়ই তার ভাড়া বাসায় আসে। তেরোখাদিয়ার আজিবুর (ছদ্মনাম) বলেন, তিনিও একসময় সবজির ব্যবসা করে সংসার চালাতেন। কিন্তু জুয়ায় জড়িয়ে এখন নিঃস্ব। তার মতো যুবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও বয়সের শত শত মানুষ পথে বসেছে। এখনো তিনি সাত লাখ টাকার দায়ে পালিয়ে বেড়ান।

রাজশাহীতে জুয়া নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে পুলিশের টনক নড়ে। অভিযানে জড়িতরা ধরাও পড়ে। জুয়াড়িরা কারাগারে থাকায় কিছুদিন ভালো যায়। কিন্তু তারা জামিনে বেরিয়ে আবার প্রকাশ্যে জুয়ার আসর বসায়। ফলে পরিস্থিতি আগের অবস্থায় চলে যায়। সূত্র জানায়, গত বছর একদিনের পুলিশী অভিযানে ১৩টি জুয়ার আসর থেকে ৪০ জন আটক হয়েছিল। ঐ সময় মহানগর আওয়ামী লীগের এক সহসভাপতির নিয়ন্ত্রণাধীন জুয়ার আসর থেকে ১৩ জনকে আটক করেছিল পুলিশ। কিন্তু জড়িতরা সেই আগের জায়গায় ফিরেছে বলে জানা গেছে।

জানতে চাইলে একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘জুয়ার আসর এমন কী অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে সময়মতো কড়া ব্যবস্থা  নেবে। প্রশাসনকে সেভাবেই নির্দেশনা দেওয়া আছে।’

মহানগর পুলিশের মুখপাত্র গোলাম রুহুল কুদ্দুস বলেন, সব ধরনের জুয়াসহ অসামাজিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আরএমপি সবসময় অভিযান চালায়। অভিযোগ পেলে জড়িতদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে।