মঙ্গলে বাতাসের ফিসফিসানি কী বলিতে চাহে?

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:০২

মঙ্গলে বাতাস আছে! সম্প্রতি মঙ্গলযান ‘ইনসাইট’ মঙ্গলের বাতাসের শব্দ রেকর্ড করিয়া পাঠাইয়াছে পৃথিবীতে। লালগ্রহের মাটিতে পা রাখিবার মাত্র ১০ দিনের মধ্যেই ইনসাইট শুনিতে পাইয়াছে মঙ্গলের বাতাসের শব্দ। প্রশ্ন হইল, মঙ্গলের বাতাস থাকায় বিস্ময়ের কী আছে? বিজ্ঞানীরা বলিতেছেন, ইহা সবিশেষ বিস্ময়ের। কারণ বাতাস আর পানির সঙ্গে রহিয়াছে প্রাণের অস্তিত্বের গভীরতম সম্পর্ক। মঙ্গলে পানি ছিল এককালে, ইহা ইতিপূর্বে স্পষ্ট হইয়াছে। কিন্তু বাতাসের কথা স্পষ্টভাবে জানা ছিল না। জানা গিয়াছে, মঙ্গলের পিঠে বহমান বাতাসের শব্দ শুনিতেছে মঙ্গলযান ইনসাইট পহেলা ডিসেম্বর হইতে। ওই দিন, অর্থাত্ পহেলা ডিসেম্বর মঙ্গলের বুকে বহিতে থাকা বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১০ হইতে ১৫ মাইল। পৃথিবীর তুলনায় এই গতিবেগ কিছুটা কম বটে।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে এই প্রথম মঙ্গল গ্রহের বাতাসের শব্দ শুনিতে পাওয়াটা হেলাফেলার নহে। সেই শব্দ শুনিলে মনে হইতে পারে খানিক দূরে সমুদ্র গর্জন করিতেছে। শব্দটি ‘পার্থিব’ নহে বটে। এবং সেই ‘অপার্থিব’ অনুভূতিটিও বেশ জীবন্ত। প্রকৃতার্থে, পৃথিবীর নিকটতম প্রতিবেশী গ্রহ মঙ্গল মানুষের জন্য অত্যন্ত আশাজাগানিয়া একটি গ্রহ। পৃথিবীর বাহিরে মনুষ্য উপনিবেশ সৃষ্টির সম্ভাবনায় সবচাইতে আগাইয়া রহিয়াছে মঙ্গল গ্রহ। এইজন্য সেই ১৯৬০ সাল হইতে তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র মঙ্গলপানে নভোযান পাঠাইয়াছে বারংবার। যদিও মঙ্গলাভিযান খুব সহজ নহে। মঙ্গলের উদ্দেশে পরিচালিত এখন অবধি ৫৬টি অভিযানের মধ্যে সমপূর্ণ ও আংশিক সাফল্য আসিয়াছে মাত্র ২৭ বার। অন্যদিকে, নাসার এইবারের মঙ্গলযান ‘ইনসাইট’ মঙ্গলজুড়িয়া ঘুরিবে না কিংবা মঙ্গলের কক্ষপথে বসিয়া নজরদারিও করিবে না। ‘ইনসাইট’ একটি ‘জিওফিজিক্যাল স্টেশন’। অর্থাত্ ইহা মঙ্গলের অভ্যন্তরের রহস্যভেদ করিবার চেষ্টা চালাইবে। বুঝিবার চেষ্টা করিবে কীভাবে একদা জলের অস্তিত্ব থাকা মঙ্গল এমন শুষ্ক পাথুরে লালগ্রহে পরিণত হইল।

বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং বলিয়াছিলেন যে, মানবসভ্যতাকে টিকিয়া থাকিতে হইলে পৃথিবীর বাহিরে নূতন উপনিবেশ গড়িতেই হইবে। মানুষের অদম্য মানসিকতাই তাহাকে শেষাবধি নূতন জগতে লইয়া যাইবে। মহাশূন্যে বিভিন্ন অভিযান এই অদম্য দুঃসাহসেরই অংশ। মানুষ তাহার সভ্যতার বিস্তার করিতে ছড়াইয়া পড়িয়াছে এক মহাদেশ হইতে অন্য মহাদেশে। মানুষ অদম্য কৌতূহলে তরী ভাসাইয়াছে মহাসমুদ্রে, আবিষ্কার করিয়াছে নূতন নূতন ভূখণ্ড, স্থাপন করিয়াছে নূতন উপনিবেশ। এখন নজর ফেলিয়াছে নিকট গ্রহের দিকে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, মঙ্গলের সাফল্য মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও ইহার সহিত জড়াইয়া রহিয়াছে অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তির বিকাশ এবং তাহা ব্যয়বহুলও বটে। সেই কারণে এইসকল অভিযানও পরিচালনা করিতেছে উন্নত রাষ্ট্রসমূহ। এইক্ষেত্রে স্মর্তব্য যে, যেই উদ্দেশ্যে উন্নত রাষ্ট্রসমূহ উপনিবেশ সৃষ্টি করিতে চাহে, সেই উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য মঙ্গলাভিযানের ক্ষেত্রে ভিন্ন নহে। তবুও বলিতে হয়, মঙ্গলের এই বাতাসের শব্দের বিশেষ অর্থ রহিয়াছে। আগামী বিশ্বের মানুষ তাহার মর্ম বুঝিবে নিশ্চয়ই।