শারদীয়া দুর্গোত্সবের আজ মহাসপ্তমী। মাত্র কয়েক দিন পূর্বে বর্ষা শেষের নিম্নচাপে সৃষ্ট স্যাঁতসেঁতে আর্দ্রতা কাটিতে শুরু করিয়াছে মাত্র। আকাশ জুড়িয়া পেঁজাতুলা শুভ্র মেঘের দল বহন করিতেছে শারদীয় বার্তা। বাতাসে শরতের ঘ্রাণ। সেই ঘ্রাণ ছড়াইয়া পড়িতেছে আবহমান বাংলার চরাচরে। আর এমনই শিউলিশুভ্র সময়ে ফি বত্সর উদ্যাপিত হইয়া আসিতেছে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড়ো ধর্মীয় উত্সব শারদীয় দুর্গাপূজা। শরতের এই উত্সবের নেপথ্যে রহিয়াছে দশরথপুত্র শ্রীরামচন্দ্রের অবদান। কৃত্তিবাসের রামায়ণ হইতে জানা যায়, সীতা উদ্ধারের জন্য শ্রীরামচন্দ্র কালিদহ সাগর হইতে ১০১টি নীলপদ্ম সংগ্রহ করিয়া সাগরকূলে বসিয়া শরত্কালে সর্বপ্রথম শক্তি তথা দুর্গোত্সবের (অকালবোধন) আয়োজন করেন। বসন্তকালে দেবী দুর্গার বাসন্তী পূজার নিয়ম থাকিলেও শরতে রামচন্দ্রের অকালবোধনের আয়োজনই পরবর্তীকালে জনপ্রিয়তা লাভ করে। হিন্দু শাস্ত্রানুসারে দেবী দুর্গার বাহন সিংহ। কিন্তু পৌরাণিক মতে, দেবী দুর্গা প্রতি বত্সর কৈলাস হইতে বাপের বাড়ি মর্ত্যলোকে আগমনের সময়ে চারটি আলাদা বাহন (অশ্ব, হস্তী, নৌকা এবং দোলা) ব্যবহার করিয়া থাকেন। স্বামীর বাড়ি ফিরিয়াও যান আলাদা আলাদা বাহনে। এইবার দেবী দুর্গা মর্ত্যে আসিয়াছেন ঘোটক তথা ঘোড়ায় চড়িয়া। পুরাণমতে, ঘোড়ায় আগমন অবশ্য শুভ নহে। চারিদিকে সমস্ত কিছু ওলটপালট হইবার আশঙ্কা ব্যক্ত করে এই আগমন। দেবী দুর্গা বিদায়ও লইবেন ঘোটকে। দেবী দুর্গার ঘোটকে আগমন ও বিদায় হিসাবে পুরাণ ইঙ্গিত দেয় প্রাকৃতিক বিপর্যয়, যুদ্ধ, সামাজিক অশান্তির। অবশ্য সাম্প্রতিককালে এই বিষয়াদি সারা বিশ্বেরই নিত্যচিত্রের রূপ ধারণ করিয়াছে। পুরাণমতে, দেবী দুর্গাও মর্ত্যে আসিয়া অশুভ শক্তির বিনাশের মাধ্যমে শুভশক্তিকে প্রতিস্থাপন করেন। জীবের দুর্গতি নাশ করেন বলিয়াও তাহাকে দুর্গা বলা হয়। দেবতাদের শক্তিতে শক্তিময়ী এবং বিভিন্ন অস্ত্রে সজ্জিতা হইয়া এই দেবী যুদ্ধে মহিষাসুরকে বধ করেন। দেবী দুর্গা দশভুজা, ইন্দ্রিয় সংযমের প্রতীক তাহার দশ হাত দশ দিক রক্ষায় শক্তিসম্পন্না। দুর্গা ত্রিনয়না—অগ্নি, সূর্য ও চন্দ্রের প্রতীক ব্রহ্ম, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের শক্তিসম্পন্না। রামের সেই সময়ের যুদ্ধ যেমন অশুভ শক্তির প্রতিভূ অসুরের বিরুদ্ধে, ঠিক তেমনই দুর্গত দেবতাদের সপক্ষেও। ব্যক্তি মানুষের মধ্যে, সমাজের মধ্যে অসুররূপী যে পশুত্ব রহিয়াছে, তাহা হইতে মনুষ্যত্বে উত্তরণের যে চিন্তা সমাজ-জীবনে প্রবহমান, সেই চিন্তারও প্রতিফলন ঘটিতে দেখা যায় দুর্গাপূজার মধ্যে। সেই কারণে দুর্গা দেবী হইতেছেন শুভ শক্তির আরাধ্য দেবী।
দুর্গাপূজার মাধ্যমে জগতের শুভশক্তিরই আরাধনা করিয়া থাকেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। তাহাদের নিকট পূজা মানে হইল—নিবেদন অর্থাত্ প্রশংসা বা শ্রদ্ধা জানানো। দিকে দিকে সুর-অসুরের যে যুদ্ধ চলিতেছে, সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তাহারই প্রতীকী বিজয়ের প্রকাশ দেখিতে পান এই দুর্গোত্সবে।
সকল সনাতন ধর্মাবলম্বীর জন্য রইল দুর্গোত্সবের প্রীতি শুভেচ্ছা।
