আনুশে হোসেন
ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিলে অনেক নাটক মঞ্চায়িত হচ্ছে, যা কিনা কয়েক গন্ডা বলিউড ছবির জন্য রসদ জোগাড় করতে পারে।
রাজনীতি যা-ই হোক, আমেরিকার রাজধানীতে এমন কিছু বস্তাপচা ঘটনার জন্ম নিচ্ছে, যা কেউ উপেক্ষা করতে পারবে না। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি যে একটা সংকটের মধ্যে রয়েছে, তা বুঝতে আপনাকে শুধু মুহুর্মুহু আসা ব্রেকিং নিউজের দিকে চোখ রাখতে হবে।
এই সপ্তাহে নতুন মোড় নেওয়া ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইন্সপেক্টর জেনারেল কংগ্রেসের কমিটির কাছে অভিশংসন তদন্তের ব্যাপারে ব্যাখ্যা করবেন, যা কিনা ট্রাম্পের রাষ্ট্রপতিত্বকে গভীর সংকটে ফেলে দিয়েছে। ইন্সপেক্টর জেনারেলের এই বিষয়টি এসেছে ২৫ জুলাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের কুখ্যাত সেই আলাপচারিতার ব্যাপারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও স্বীকার করার পর। পূর্বে পম্পেও বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছিলেন। ট্রাম্প ও ইউক্রেন প্রেসিডেন্টের আলাপচারিতা নিয়েই অভিশংসনের প্রশ্নটি এসেছে। মাত্র এক সপ্তাহ আগে হাউজের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি অভিশংসনের বিষয়ে ঘোষণা দেন যে ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে চাপ দিয়েছেন তার ২০২০ সালের ডেমোক্রেটিক প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেনের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতে। কিন্তু ওয়াশিংটনের এই নাটকের দিক পরিবর্তন হয়ে গিয়ে ট্রাম্পের রাষ্ট্রপতিত্বের ওপরই পড়েছে। চারপাশ দিয়ে ট্রাম্প যেন অবরুদ্ধ হয়ে পড়ছেন। দ্রুত ঘটে যাওয়া ঘটনাবলির সর্বশেষ পরিস্থিতিতে দেখা যায়, তদন্তের জন্য ডেমোক্র্যাটরা তাদের সাংবিধানিক ক্ষমতাকে দ্রুত কাজে লাগাতে চাইছেন।
হাউজ ইন্টেলিজেন্স কমিটির ডেমোক্রেটিক দলের কংগ্রেসম্যান মাইক কুইগলি বলেছেন, ‘ট্রাম্প যা করেছেন, সেটি একটি চরম অপরাধ। আমার ধারণা, আমার জীবদ্দশায় দেখা কোনো প্রেসিডেন্টের এটাই সবচেয়ে বড়ো অপরাধ সংঘটন।’ ডেমোক্র্যাটদের উত্তাপটা বোঝা যায় গত বুধবার। একই কাজ তারা করতে ব্যর্থ হয়েছিল মুয়েলারের তদন্তের ফলাফলের পর। ২০১৬ সালের নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের ব্যাপারে দুই বছর তদন্তের পর মুয়েলার রিপোর্টটি দিয়েছিলেন। যদিও স্পেশাল প্রসিকিউটর মুয়েলার ট্রাম্পের দ্বারা বিচারকাজে বাধা প্রদানের ১০টি প্রমাণ পেয়েছিলেন, কিন্তু আমেরিকার জনগণ সেই সব ব্যাপার তেমন গায়ে মাখেনি, যা ট্রাম্পের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। কিন্তু ইউক্রেন কেলেঙ্কারির বিষয়টি ভিন্ন। রিপাবলিকান দলের যারা প্রেসিডেন্টকে সমর্থন দিয়ে আসছিলেন, তারাও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এতে প্রতীয়মান হয় যে অমেরিকার প্রেসিডেন্সি কেলেঙ্কারি, মিথ্যাচার, দুর্নীতির দ্বারা চিত্রায়িত হয়েছে, যা প্রকাশ্যে আমেরিকার কোনো সরকারের দ্বারা সংঘটিত হতে বিশ্ব কখনো দেখেনি।
ট্রাম্প তার একটি টুইটে বলেছেন, ‘আমি যতই দেখছি, ততই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছি যে যা ঘটছে তাকে অভিশংসন প্রচেষ্টা না বলে বরং অভ্যুত্থান বলা যায়।’
ট্রাম্প যখন নিজের তৈরি রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি ঢেকে নিজেকে ভিকটিম হিসেবে দেখাতে চাইছেন, তখন অভিশংসনের অর্থ কী, তা একটু ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। অনেক লোক, এমনকি আমেরিকানরাও মনে করেন, অভিশংসন মানে হলো ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে ক্ষমতাচ্যুত করা। কিন্তু সেটা ঠিক নয়। অভিশংসন হলো একটি প্রক্রিয়া, যা হাউজের নিম্নকক্ষের সদস্যরা সরকারের কোনো বেসামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনেন। যতক্ষণ পর্যন্ত ট্রায়াল সম্পন্ন না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত ঐ অভিশংসিত ব্যক্তি তার দায়িত্বে বহাল থাকবেন। যদি কারো বিরুদ্ধে অভিশংসন আনা হয়, তাহলে তাকে অবশ্যই আইনপ্রণেতাদের মুখোমুখি হতে হবে। ঐ রায়ের ওপর নির্ভর করবে তার দায়িত্বে থাকা না-থাকা।
সুতরাং, অভিশংসন মূলত একটি লিগ্যাল প্রসেস। এই প্রসেসের মধ্য দিয়ে দেখতে হবে তাকে তার পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার মতো যথেষ্ট প্রমাণাদি আছে কি না।
ট্রাম্প থাকবেন কি থাকবেন না, তা নিয়ে আপনি যা-ই ভাবুন, বর্তমান অরাজকতা তার সরকারকে নাস্তানাবুদ করে ফেলেছে। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার, আমেরিকার গণতন্ত্র কখনো এতটা অস্থিতিশীল হয়নি। সারা বিশ্ব এখন তাকিয়ে দেখছে, যা আপনার চোখের সামনে চিরদিনের জন্য বদলে যাচ্ছে।
[ইংরেজি থেকে অনূদিত]
n লেখক : যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি সাংবাদিক, নারী অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ
