রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘পুণ্যে-পাপে দুঃখে-সুখে পতনে-উত্থানে, মানুষ হইতে দাও তোমার সন্তানে।’ এই পঙিক্তর মর্মার্থ খুবই সোজা—সন্তান ভুল করবেই। সন্তান কিংবা সন্তানতুল্যদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে তাদের ভুলক্রটিকে ভর্ত্সনা-তিরস্কার না করে বরং সঠিক বিষয়টি বুঝিয়ে দেওয়াই নিয়ম। অল্পবয়সী কিশোর-কিশোরীদের পাপ-পুণ্যের হিসেব পাল্লায় মাপার আগে তাদের পাপ ও পুণ্যের পথটি চিনিয়ে দেওয়াই গুরুজনদের প্রধান কর্তব্য।
বলছি সমপ্রতি ঢাকার ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের ছাত্রী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনাটি। যে ঘটনা আমাদের সকলকেই আলোড়িত করেছে। পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়ার কারণে তাকে টিসি দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। তার সহপাঠীরা বলছে, শিক্ষকদের ‘নির্মম আচরণ’-এ মর্মাহত অরিত্রী আত্মহত্যা করেছে। এই ঘটনাটি শিক্ষকসমাজের জন্য যেমন একটি স্পষ্টবার্তা বহন করে, তেমনি টিনেজ বয়সীদেরও এ থেকে শিক্ষা নেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষার পরিবেশকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে দিল। দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকদের দ্বারা এমন আচরণ নিত্যই ঘটে। এখন হয়তো একজন অরিত্রীর আত্মহত্যার কারণে বিষয়টি সামনে এসেছে। কিন্তু প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শ্রেণিতে শিক্ষকদের দ্বারা এমন অপ্রত্যাশিত আচরণের শিকার এদেশের বহু কিশোর শিক্ষার্থী। তবে পাইকারি হারে সব শিক্ষকের সম্পর্কে এমন কথা বলার সুযোগ নেই|
ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষকদের কাছে সন্তানতুল্য। আর সন্তান ভুল করলে তা শুধরে দেওয়ার দায়িত্ব পিতমাতৃৃতুল্য শিক্ষকদেরই। এর বিপরীতে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে শিক্ষকের ‘নির্দয় আচরণ’—এই ব্যাপারটি একদম-ই যায় না। শিক্ষকেরা আচরণে, প্রজ্ঞায়, বিচক্ষণতায়, ধৈর্যশক্তিতে ও ন্যায়নিষ্ঠার মানদণ্ডে শিক্ষার্থীদের কাছে হবেন অনুকরণীয় আদর্শ। যে সময়টাতে মানুষ আস্তে আস্তে ভুল করতে করতে সঠিক পথটি চিনতে শেখে, সেটাই নবম-দশম শ্রেণি। এ বয়সে প্রতিটি শিক্ষার্থীর প্রয়োজন বন্ধুসুলভ শিক্ষকের স্নেহের সান্নিধ্য। এর ব্যতিক্রম হলেই মনের রং ফ্যাকাশে হতে শুরু করে। এমনকি স্কুলজীবন থেকে আনন্দ হারিয়ে ফেলে লেখাপড়াতেও অনীহা আসাটা অস্বাভাবিক নয়। শিক্ষার্থীদের কাউন্সিলিংয়ের বিকল্প নেই। ‘এটা ভুল করারই বয়স, ভয় নেই, এ ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েই তোমাকে এগোতে হবে’—ছাড়পত্র দেওয়ার পরিবর্তে এমন কথাগুলোই কৈশোর-মনে সাহস যোগাত। আমাদের শিক্ষকদের আচরণ এমনই হওয়া উচিত। এভাবেই অরিত্রীরা একদিন ভুলগুলোর লাগাম টেনে ধরতে শিখে ফেলবে। আর বিপরীতে ভুলগুলোকে মাত্রাতিরিক্ত তিরস্কারের ফলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বারবার ঘটবে।
প্রযুক্তির অপব্যবহাররোধে বাবা-মাকেও সচেতন হতে হবে। অল্প বয়সে সন্তানের হাতে মোবাইল ফোন তুলে দেওয়া কতটুকু নিরাপদ তা ভেবে দেখতে হবে। টিনেজ বয়সীদের মনে রাখা উচিত, আত্মহত্যা কখনো প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না। বরং নিজের কাছে নিজে হেরে যাওয়া। এমন মৃত্যুতে বীরত্বের পরিচয় নেই। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এমন অমানবিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার পরিবেশ যেন শিক্ষার্থীবান্ধব হয়ে ওঠে সে কথাও ভাবতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিশ্চিত করতে হবে সৌহার্দ্যপূর্ণ ছাত্র-শিক্ষকদের সহাবস্থান।
বন্ধুসুলভ একটি শিক্ষকসমাজ আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-গুলোতে অনেক বেশি প্রয়োজন। শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের দৃষ্টিভঙ্গির একটু পরিবর্তনই পারে ছাত্রবান্ধব শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে। মনে পড়ছে কবি কাজী কাদের নওয়াজের ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতার বিখ্যাত সেই চরণ—
‘আজ হতে চির উন্নত হলো শিক্ষাগুরুর শির
সত্যিই তুমি মহান উদার বাদশাহ আলমগীর।’
শিক্ষকের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে আমাদের শিক্ষার্থীদের এই কবিতা থেকে শেখার আছে অনেক কিছুই। এই শিক্ষাটাও শিক্ষার্থীদের বুকে ধারণ করা সময়েরই দাবি।
নরসিংদী সরকারি কলেজ
