কয়লার আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি বাড়বে বিদ্যুতের দামও

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০১৯, ২১:৫৪

১৫ অক্টোবর উত্পাদনে যাচ্ছে পায়রা বিদ্যুেকন্দ্র

মাহবুব রনি

দেশের নির্মাণাধীন বড়ো বিদ্যুেকন্দ্রগুলোর মধ্যে সবার আগে উত্পাদন শুরু করতে যাচ্ছে পায়রা তাপবিদ্যুত্ কেন্দ্র। তবে কেন্দ্রের উত্স জ্বালানি কয়লা পরিবহনে নৌপথে প্রয়োজনীয় নাব্য না থাকায় বেড়ে যাচ্ছে উত্পাদন খরচ। ফলে অপেক্ষাকৃত কম খরচে বিদ্যুত্ উত্পাদনের পরিকল্পনা হোঁচট খাবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দক্ষিণের জেলা পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ধানখালীতে নির্মিত হচ্ছে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুত্ কেন্দ্রটি। চলতি বছরের ডিসেম্বরে ৬৬০ মেগাওয়াটের দুই ইউনিটের প্রথমটি এবং আগামী ২০২০ সালের শেষ নাগাদ দ্বিতীয়টি বাণিজ্যিক উত্পাদন শুরু করবে। আর প্রথম ইউনিটে পরীক্ষামূলক উত্পাদন শুরু হবে আগামী ১৫ অক্টোবর। বিদেশ থেকে সমুদ্রপথে কয়লা আমদানির মাধ্যমে বিদ্যুত্ উত্পাদন করবে কেন্দ্রটির পরিচালনায় থাকা বাংলাদেশ-চীন পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিসিপিসিএল)। কিন্তু বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে কয়লা খালাসস্থল পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরে যাওয়ার পথে রাবনাবাদ চ্যানেলে প্রয়োজনীয় গভীরতা না থাকায় এখন বিকল্প উপায় গ্রহণ করা হয়েছে। আর তাতে আমদানি পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে কয়েক গুণ, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বিদ্যুত্ উত্পাদন খরচে।

কেন্দ্রটির অন্যতম মালিক সরকারি কোম্পানি এনডব্লিউপিজিসিএলের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুেকন্দ্রের কয়লা পরিবহনের জন্য বাণিজ্যিক বিবেচনায় কার্গো জাহাজগুলোতে ১ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন কয়লা পরিবহন করা প্রয়োজন। এর জন্য রাবনাবাদ চ্যানেলের গভীরতা অন্তত ১৮ ফুট থাকা জরুরি। কিন্তু ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ চ্যানেলটির ৩৫ কিলোমিটার এলাকায় সেই পরিমাণ নাব্য নেই। পায়রা বন্দরের আশপাশে এখন নদীর গভীরতা ৪ থেকে ৫ মিটার। এ অবস্থায় ২০ হাজার মেট্রিক টন কয়লা নিয়ে গত ১৯ সেপ্টেম্বর বিদ্যুেকন্দ্রের জেটিতে ভিড়েছে একটি জাহাজ। বর্তমানে নদীতে যে নাব্য আছে, সামনে শীতকালে তা-ও থাকবে না। এ অবস্থায় বিদেশ থেকে আসা জাহাজ গভীর সমুদ্রে নোঙর করে তা ছোটো ছোটো জাহাজে করে কেন্দ্রে আনতে হবে। অথবা বড়ো কার্গোগুলোতে অপেক্ষাকৃত অল্প পরিমাণ কয়লা নিয়ে তা কোম্পানির জেটিতে খালাস করতে হবে। বিকল্প এ দুটি উপায়ই অতিরিক্ত খরচের খাত তৈরি করবে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গত ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে পটুয়াখালীর পায়রা তাপবিদ্যুত্ কেন্দ্রের জেটিতে প্রথমবারের মতো কয়লাবাহী জাহাজ এমভি জিন হাইটং-৮ নোঙর করে। ইন্দোনেশিয়ার বালিকপানান বন্দর থেকে ২০ হাজার মেট্রিক টন কয়লা নিয়ে বাংলাদেশে আসে এটি। তখন বিসিপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ এম খোরশেদুল আলম জানান, ৭০ হাজার মেট্রিক টন কয়লা পরিবহনে সক্ষম জাহাজ পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরের কাছে নির্মিত ঐ জেটিতে ভেড়ে। বন্দরের চ্যানেলের পর্যাপ্ত গভীরতা না থাকায় অপেক্ষাকৃত অগভীরে স্থাপিত কোম্পানির জেটিতে জাহাজটি ভেড়ানো হয়। চ্যানেলে যত দ্রুত প্রয়োজনীয় গভীরতা পাওয়া যাবে, তত দ্রুতই একবারে বেশি পরিমাণ কয়লা আমদানি করা যাবে।

সূত্র জানায়, প্রথম ইউনিটটির পরীক্ষামূলক উত্পাদন শুরুর জন্য আনা প্রথম চালানের প্রতি টন কয়লার পরিবহন খরচ ২৭ মার্কিন ডলারের বেশি। অথচ ৭০ টন আনা গেলে টনপ্রতি এই খরচ ১৮ ডলারে দাঁড়াত। সব মিলিয়ে পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত বছরে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার গচ্চা দিতে হবে। এর ফলে বিদ্যুত্ উত্পাদনের খরচ বাড়বে। পায়রা বিদ্যুেকন্দ্রে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন খরচ ৫ টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছিল। তবে আমদানিতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তা এখন ৭ টাকায় পৌঁছাবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইন্দোনেশিয়ার পিটি বায়ান রিসোর্সেস টিবিকে পায়রা বিদ্যুেকন্দ্রে কয়লা সরবরাহ করবে। বিদ্যুত্ উত্পাদনে বছরে ৪০ লাখ টন কয়লা আমদানি করবে বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি। চুক্তি অনুযায়ী প্রতি টন কয়লার দাম পড়বে ৭০ ডলার। সঙ্গে যুক্ত হবে পরিবহন খরচ ১৮ ডলার। এখন পরিবহন খরচ বাড়ায় সার্বিক খরচ বেড়ে গেছে।

এ প্রসঙ্গে বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক শাহ আবদুল মওলা বলেন, সমুদ্রবন্দর প্রস্তুত না হওয়ায় পরিবহন ও আমদানি খরচ বেড়ে গেছে। বিদ্যুেকন্দ্র যেহেতু উত্পাদন শুরু করতে প্রস্তুত হয়েছে, তাই তা বসিয়ে না রেখে খরচ কিছুটা বেড়ে গেলেও উত্পাদন শুরুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

নৌ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ২০২১ সাল নাগাদ পটুয়াখালীতে পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। দুই বছরের মধ্যে নদীর নাব্য বৃদ্ধি করা হবে। এই সময়ের মধ্যে বিদ্যুেকন্দ্র কর্তৃপক্ষকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কয়লা আমদানি ও পরিবহন করতে হবে।