বিশেষজ্ঞদের অভিমত
মাস জুড়ে নানা কর্মসূচি
মোরশেদা ইয়াসমিন পিউ
গাইবান্ধা জেলার উত্তর শ্রীপুর গ্রামের বাসিন্দা রেনু বেগম। মাদ্রাসা শিক্ষক রেনুর বাবা মেয়েকে সাবালিকা হওয়ার পরেই বিয়ে দিয়ে দেন। তখন রেনুর বয়স সবে ১২ কিংবা ১৩ বছর। দু’বছরের ব্যবধানে দুটি সন্তানের জন্ম দেন রেনু। রেনুর স্বামীও চলে যান বিদেশে। এর মধ্যে দুই সন্তানকে নিয়ে কিশোরী মায়ের ব্যস্ততায় নিজের শরীরের খোঁজ নেওয়ার ফুরসত ছিল না। হটাত্ ডান স্তনে প্রচণ্ড ব্যথা জানান দিয়ে শরীরে জ্বর আসে। কিন্তু তার শাশুড়ি গরম সেঁক দিয়ে তাকে শান্ত করান। চিকিত্সকের কাছ থেকে জ্বরের ওষুধ আনিয়ে খাওয়ান, কিন্তু স্তনের ব্যথার বিষয়টি গা করেন না এবং চিকিত্সককেও জানান না। একপর্যায়ে তারা অপেক্ষায় থাকেন স্বামী বিদেশ থেকে এসে রেনুকে শহরে নারী চিকিত্সক দেখাবেন। স্বামীকে ছাড়া পুরুষ চিকিত্সকের কাছে স্তনের সমস্যা নিয়ে যাওয়া যাবে না। এর কয়েক মাস পরে স্বামী শহীদুল দেশে ফিরে রেনুকে শহরে একজন নারী চিকিত্সকের কাছে নিয়ে যান, তখন চিকিত্ক জানান, রেনু স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত।
কেবল রেনু নন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ ধরনের কুসংস্কার ও লজ্জায় দেরিতে চিকিত্সকের শরণাপন্ন হওয়ার কারণে অনেকে আক্রান্ত হচ্ছেন স্তন ক্যানসারে। অসচেতনতা ও সময়মতো চিকিত্সকের শরণাপন্ন না হওয়ার কারণে স্তন ক্যানসারে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে। যার সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের জানা নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লজ্জা বা অসচেতনতার কারণে মূলত নারীরা এসব ক্যানসারের পরীক্ষা করাতে চান না। এতে করে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ক্যানসার আক্রান্তরা অনেক পরে গিয়ে জানতে পারেন যে, তার ক্যানসার আছে। ততদিনে চিকিত্সকের তেমন কিছুই করার থাকে না। তাই প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম।
ক্যানসারের চিকিত্সা খুবই ব্যয়বহুল এবং প্রতি বছর অনেক নারী এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃতুবরণ করছে। তবে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করলে ক্যানসারের প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়। তারা বলছেন, খাদ্যাভাস পরিবর্তন, কায়িক শ্রম ও কিছু নিয়ম মেনে চললে ক্যানসারে ঝুঁকি প্রতিরোধ করা সম্ভব। দেশে যত মানুষ মারা যায় তার ষষ্ঠ মৃত্যুর কারণ ক্যানসার। তারা বলছেন, সুষ্ঠু জীবনযাপনের অভাবে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে স্তন ক্যানসারে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। যাদের মধ্যে ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশই তরুণী। উন্নত দেশগুলোতে ৩০ বছর পর, এমনকি ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকির মাত্রা বাড়লেও আমাদের দেশে তরুণীদের মধ্যেও স্তন ক্যানসার বেড়ে চলছে। এসব রোগীর বেশির ভাগই অসচেতন গ্রামাঞ্চলের।
অসংক্রামক ও দীর্ঘস্থায়ী মারাত্মক রোগ ক্যানসার। শুরুতে এই রোগের চিকিত্সা না হলে তার পরিণতি হয় মৃত্যু। তবে শুরুতে এই রোগ শনাক্ত হলে সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হওয়া যায়। সে কারণে ক্যানসার রোগ প্রতিরোধে প্রথম প্রয়োজন সচেতনতা।
আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা গ্লোবক্যান-এর পরিসংখ্যান মতে, দেশে প্রতি বছর স্তন ক্যানসারে ১৭ হাজার ৭৮১ জন নারী আক্রান্ত হয় এবং ৮ হাজার ৩৯৬ জনের মৃত্যু হয়। তবে দেশে প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। স্তন ক্যানসারের চিকিত্সায় নিয়োজিত ও গবেষণারত চিকিত্সকের পরিসংখ্যান মতে, সারা বিশ্বে প্রতি বছর ৩৬ হাজার স্তন ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হয়। যার মধ্যে টিনএজদের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৫ হাজার। তবে সঠিক পরিসংখ্যান না থাকায় ধারণার ওপর কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চ অ্যান্ড হসপিটালের সহযোগী অধ্যাপক হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বলেন, নারীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে শুরু হয়েছে ক্যানসার সচেতনতা মাস। এ উপলক্ষ্যে অক্টোবর মাস জুড়ে ক্যানসার সচেতনতায় চলবে নানা কর্মসূচি। ৭/৯, লালমাটিয়া, বি-ব্লকে, মাস জুড়ে স্তন ক্যানসার স্ত্রিনিং চলবে, বিকাল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত।
