কলকারখানার নিঃসৃত ধোঁয়া, ধূমপান নামের বিষের বাষপকুণ্ডলীতে দূষিত পৃথিবীর বাতাস। বেড়ে যাচ্ছে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের ক্যান্সার, স্ট্রোক ও হূদরোগসহ অসংখ্য প্রাণঘাতী রোগের প্রকোপ। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রোগীদের ১০ শতাংশ বায়ুদূষণজনিত নানা রোগে আক্রান্ত। সেইসঙ্গে পানিদূষণজনিত রোগে আক্রান্ত মোট দেশীয় রোগীর ১০ শতাংশ। কলকারখানার নিঃসৃত বিষাক্ত বর্জ্য আর পারমাণবিক প্রযুক্তির অভিশাপ তেজস্ক্রিয়তার দূষণে হুমকির মুখে নদীর পানি কিংবা মাটি। পৃথিবীর এক শ কোটি মানুষ নিরাপদ পানি পাওয়ার সুবিধা থেকে বঞ্চিত। প্রায় ২০০ কোটি মানুষের জন্য নেই স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশনব্যবস্থা।
সারা দেশে সক্রিয় পরিবেশ বিধ্বংসী প্রায় আট হাজার ইটের ভাটা। দূষিত হচ্ছে নদীগুলোর পানি। পানিতে অক্সিজেনের ঘাটতি। জলজ জীববৈচিত্র্যের বিপর্যয় তথা গণ-বিপর্যয় যেন অতি সন্নিহিত। প্রায় ৭৭ মিলিয়ন মানুষ আর্সেনিকদূষণের ঝুঁঁকিতে। বিষের দূষণে দুষ্ট খাদ্য সেবনে মানুষের লিভার ও কিডনির দীর্ঘমেয়াদি নানা সমস্যায় আক্রান্তের হার ক্রমাগত বেড়েই যাচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেই না। তেজষ্ক্রিয়তার অভিশাপে মানুষ সেখানে আজো আক্রান্ত হচ্ছে থাইরয়েড আর ফুসফুসের ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগে। গর্ভের শিশু জন্মায় বিকলাঙ্গ হয়ে। বেড়ে যাচ্ছে বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতার হার।
বাড়ছে অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন। উজাড় হচ্ছে ফসলের জমি, কাটা পড়ছে বন। বর্তমানে বাংলাদেশে মোট বনভূমির পরিমাণ প্রায় ২.৩ মিলিয়ন হেক্টর; যা সমগ্র দেশের মোট ভূমির ১৫.৫ শতাংশ। আর প্রতি বছর এই বনভূমি কমে যাওয়ার পরিমাণ ০.১৮ শতাংশ; যা আমাদের অস্তিত্ব ও পরিবেশের জন্য অশনি সংকেতই বটে। একদিকে বন উজাড়, অন্যদিকে মানুষের সীমাহীন ভোগ-বিলাসিতার কারণে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে বাড়ছে গ্রিন হাউজ গ্যাসের মাত্রা; যা বাড়ায় পৃথিবীর উষ্ণায়ন প্রক্রিয়া। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রায় তিন ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বেড়ে যাবে। এর মধ্যেই মেরু অঞ্চলের বরফ গলতে শুরু করেছে। ক্রমান্বয়ে বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। ধারণা করা হচ্ছে, এভাবে চলতে থাকলে আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ০.১ থেকে ০.৩ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যাবে। সমুদ্রগর্ভে নিমজ্জিত হবে উপকূলীয় অঞ্চলের ১৭.৫ শতাংশ ভূমি। মিঠা পানিতে ক্রমান্বয়ে লবণাক্ত পানি প্রবেশের ফলে লবণের দোষে দুষ্ট হবে চাষযোগ্য ভূমি। বেড়ে যাবে মশা-মাছির বংশবিস্তার। বেড়ে যাবে খরা, অতি বৃষ্টিপাত, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা প্রভৃতির প্রকোপ। আলোকদূষণে বিপর্যস্ত হবে আমাদের দৃষ্টি।
আমাদের দেশের কলকারখানাগুলোর ৫০ শতাংশই বর্জ্যই বিষাক্ত। পরিবেশগত মানসমপন্ন দূষিত বর্জ্য নিষ্কাশনের (যা ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট নামে পরিচিত) ব্যবস্থা নেই। ১০ শতাংশের ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত। যদিও পরিবেশ আইনে প্রতিটি কলকারখানার ক্ষেত্রে পরিবেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতকল্পে এ ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক। ৮০ শতাংশ ইটের ভাটাতেই পরিবেশবিনাশী নিচু উচ্চতার কোক চুল্লির ব্যবহার পরিবেশ আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এদিকেও পরিবেশ বিভাগের আশু দৃষ্টি দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। কলকারখানায় পণ্য উত্পাদনের ক্ষেত্রে অধিক পরিবেশ দূষণকারী প্রক্রিয়ার পরিবর্তে আমাদের অপেক্ষাকৃত কম পরিবেশনাশী পদ্ধতির উপর জোর দিতে হবে। কলকারখানা ও যানবাহনে জৈব-জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে আমাদের দৃষ্টি রাখতে হবে নানা নবায়নযোগ্য শক্তির উত্স—যেমন সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, পানিশক্তি, বায়োগ্যাস প্লান্ট প্রভৃতির দিকে। আমাদের জোর দিতে হবে একই জিনিসের পুনঃব্যবহার, পুনঃচক্রায়ন কিংবা বিকল্প ব্যবহারের দিকে।
পৃথিবীতে বার্ষিক নিঃসৃত প্রধান গ্রিন হাউজ গ্যাস কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মোট পরিমাণ প্রায় ১০ লাখ টন। যার ৮০ শতাংশই নিঃসৃত হয় চীন, আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারতসহ পৃথিবীর প্রধান উন্নয়নশীল ১০টি রাষ্ট্র থেকে। তার মানে এই যে, পৃথিবীর উষ্ণায়ন তথা গ্রিন হাউজ প্রতিক্রিয়ার জন্য দায়ী পৃথিবীর শিল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল বৃহত্ রাষ্ট্রগুলো। ভোগ তাদের, দায় সবার। কেননা পৃথিবীর উষ্ণায়ন কোনো দেশকে এককভাবে আক্রান্ত করে না। এটি একটি বৈশ্বিক প্রক্রিয়া।
ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি কলেজ, ঢাকা
