বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের অধ্যক্ষ ও একুশে পদকপ্রাপ্ত পণ্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের আর নেই। শুক্রবার মধ্যরাতে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। তিনি দেশে ও বিদেশে অসংখ্য শিষ্য-প্রশিষ্য, ভক্ত ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধেও অসাধারণ সাহসী ভূমিকা রাখেন শ্রীমত্ সত্যপ্রিয় মহাথের। যুদ্ধ চলাকালে তিনি এলাকার সহস াধিক অসহায় ও নির্যাতিত মানুষকে ঐতিহ্যপূর্ণ পুরাতন কাঠের সীমা বিহারে আশ য় দেন। এ নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বাগিবতণ্ডা হয় এ বৌদ্ধ ভিক্ষুর। সত্যপ্রিয় মহাথের ১৯৩০ সালের ১০ জুন কক্সবাজারের রামু উপজেলার ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের পশ্চিম মেরংলোয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা প্রয়াত হরকুমার বড়ুয়া ও মাতা প্রেমময়ী বড়ুয়া।
গত ৩ সেপ্টেম্বর সাবেক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া ও প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী রামু সীমা বিহারে গেলে বৌদ্ধ নেতৃবৃন্দ পণ্ডিত সত্যপ্রিয়কে সরকারি উদ্যোগে উন্নত চিকিত্সাসেবা প্রদানের দাবি জানান। এ পরিপ্রেক্ষিতে পরদিন ৪ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের রামুতে পৌঁছে সরকারি উদ্যোগে তাকে চিকিত্সাসেবা প্রদানের জন্য ঢাকা নেওয়ার উদ্যোগ নেন। পরে ১৫ সেপ্টেম্বর সত্যপ্রিয় মহাথেরকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়।
প্রবীণ এ বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু ২০১৫ সালে সমাজসেবায় একুশে পদক পান। তার প্রকৃত নাম বিধু ভূষণ বড়ুয়া। রামু সীমা বিহারের অধ্যক্ষ শ্রীমত্ সত্যপ্রিয় মহাথের ১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আরেক বৌদ্ধ মহাপুরুষ বিনয়াচার্য আর্যবংশ মহাথেরর কাছে প্রব্রজ্যা গ্রহণ (গৃহজীবন ত্যাগ) করে সমাজ ও মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত হন। এর ছয় মাস পরই পবিত্র মাঘী পূর্ণিমার দিনে তিনি উপ-সম্পদা (ভিক্ষুত্ব) গ্রহণ করেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা মহাথের ১৯৫৫ সালে মিয়ানমারের ধর্মদূত পালি কলেজে অগ্রমহাপণ্ডিত উ. বিশুদ্ধায়ু মহাথের ও প্রজ্ঞালোক মহাথেরর কাছে পালি ভাষা ও বিনয় শিক্ষা লাভ করেন। তিনি বহু ভাষায় পারদর্শী। বুদ্ধ ধর্মের পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ পালি ভাষার মূল ত্রিপিটকের বিভিন্ন অধ্যায় থেকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেন তিনি। দেশের সবচেয়ে কলঙ্কময় অধ্যায় ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে কক্সবাজারে রামু, উখিয়া, টেকনাফ ও পটিয়ার লাখেরায় ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক হামলার পর গৌতম বুদ্ধের সাম্য-মৈত্রী ও অহিংসার বাণীকে সর্বময় ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে সত্যপ্রিয়র।
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি গতকাল এক বিবৃতিতে সত্যপ্রিয়র মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। বিবৃতিতে মন্ত্রী তার পবিত্র আত্মার শান্তি কামনা এবং তার শোক-সন্তপ্ত পরিবার-পরিজন, ভক্ত-শিষ্য-অনুরাগী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। এদিকে, সত্যপ্রিয়র প্রয়াণে বাংলাদেশ বুদ্ধিস্ট ফেডারেশন গভীর শোক প্রকাশ করেছে।
