বিশ্বজিত্ দাস
রাত ৩টা।
গুলশান। ঢাকা।
মাত্রই টিভিতে পরীমণির একটা মুভি দেখা শেষ করলেন বৃদ্ধ। স্ক্রিন অফ করলেন তিনি। বিছানা থেকে উঠে ঘরের আলো জ্বালালেন। একগ্লাস পানি খেলেন। আয়নার দিকে তাকাতেই থমকে গেলেন।
সত্যিই অনেক বুড়ো হয়ে গেছি! সাধে কী আর অফিসের সবাই তাকে ‘বুড়ো’ বলে ডাকে।
ফোনটা বেজে উঠল। লাল ফোন। জরুরি নিশ্চয়ই। এই ফোনের নম্বর আর বেশি লোকের কাছে নেই।
‘হ্যালো।’
‘রাহাত, আমাকে বাঁচাও ভাই।’ ওপাশ থেকে ইংরেজিতে আর্তনাদ করে উঠল কেউ। আমেরিকান টান আছে কথায়।
‘কে?’ মনে মনে বিরক্ত হলেন রাহাত খান। বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স সংক্ষেপে বিসিআইয়ের কর্ণধার।
‘রাহাত, আমাকে চিনতে পারছ না। আরে আমি বলছি, আমি।’
‘কী আশ্চর্য! নাম না বললে চিনব কিভাবে!!’
‘আরে আমি তোর টেম্পু। তোমার ন্যাংটাকালের ফ্রেন্ড। পৃথিবীর সবাই তাকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বলে জানে।’
‘ওহ! টেম্পু! কী খবর? হঠাত্ এত রাতে?’
‘আরে রাত তো তোমাদের দেশে। আমাদের এখানে তো এখন দিন।’
‘তাই তো। হঠাত্ জরুরি ফোন কেন?’
‘ভাই, আমি একটা বিপদে পড়েছি।’
‘কী বিপদ?’
‘ফোনে তো সেটা বলতেই পারছি না। সব কথা কিভাবে যেন ফাঁস হয়ে যাচ্ছে!’
‘তাহলে কিভাবে হেল্প করব।’
‘তুমি আমেরিকায় আমার কাছে বেড়াতে আসো। নয়তো নিজের সেরা কয়েকজন অ্যাজেন্টকে পাঠিয়ে দাও, যারা ফোনের তেলেসমাতি জানে।’
‘মানে। বুঝলাম না।’
‘আরে, পেপারে দেখনি, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সাথে কথা বলেছিলাম, কিভাবে যেন মিডিয়াতে সবাই জেনে যাচ্ছে। আমি এর রহস্য ভেদ করার জন্য তোমার অ্যাজেন্টদের চাইছি।’
‘হুঁ। আমার একজন অ্যাজেন্টকে পাঠাচ্ছি।’
‘একজন!’ আর্তনাদ করে উঠলেন ট্রাম্প।
‘যাকে পাঠাচ্ছি, সে একাই একশ। সে বেশ কয়েকজন আমেরিকার প্রেসিডেন্টের জীবন বাঁচিয়েছে। আনঅফিশিয়াল বলে তার নাম প্রচার হয়নি।’
‘বলো কী! সে কে? তার নাম কী?’
‘মাসুদ রানা।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, নামটা চেনা চেনা লাগছে। সে এখন কোথায়?’
‘নিউইয়র্কেই আছে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তরুণদের জন্য পুরস্কার পাচ্ছেন, সেখানে তিনি কয়েকজন তরুণকে রিপ্রেজেন্ট করার জন্য সাথে নিয়ে গেছেন। রানাকেও সাথে নিয়ে গেছেন।’
‘তুমি না বললে সে বেশ কয়েকজন প্রেসিডেন্টের জীবন বাঁচিয়েছে। তাহলে এতদিন তো তার বুড়ো হয়ে যাওয়ার কথা।’
দীর্ঘশ্বাস চাপলেন রাহাত খান।
‘রানা চিরতরুণ!’ ধীরে ধীরে বললেন তিনি।
‘শুধু আমিই বুড়ো!!’ মনে মনে বললেন নিজেকে।
দুই.
‘ইয়াং ম্যান, তুমি এত তরুণ আর হাস্যোজ্জ্বল থাক কিভাবে?’ ট্রাম্প হাসতে হাসতে বললেন।
মাসুদ রানা-বিসিআইয়ের দুর্ধর্ষ স্পাই, তার সামনে বসে আছে। কমপ্লিট পরিহিত।
হাসল ও।
‘বলুন স্যার, কী করতে পারি আপনার জন্য?’
‘আগে বল, তোমার সাথে কি মোবাইল আছে?’
‘হ্যাঁ।’ মাথা ঝাঁকাল রানা।
‘এবার আসল কথায় আসি। সম্প্রতি আমার আর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের গোপনীয় ফোনালাপ ফাঁস হয়ে গেছে। এর জন্য আমি অভিশংসনের মুখে পড়তে যাচ্ছি। তাই হোয়াইট হাউসের কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না। এমনকি আমার নিজস্ব মোবাইলটিকেও বিশ্বাস করতে পারছি না। পাছে না কেউ আড়ি পাতে।’
‘আমাকে কী করতে বলেন স্যার।’
‘এর পেছনে রহস্যটা কী বুঝতে পারছি না। যা বলি সেটাই ফাঁস হয়ে যাচ্ছে!’
‘এতে রহস্যের কিছু নেই স্যার। আপনার ব্যবহূত আইফোন তো চীনেরই তৈরি। আর চীনের সাথেই আপনি বাঁধিয়েছেন বাণিজ্যযুদ্ধ। কাজেই তারাই হয়তো এই তথ্য ফাঁস করেছে।’
‘হুমম। সেটা তো নাও হতে পারে।’
‘পারে। কিন্তু তাতে তো কিছু যায় আসে না। যা ফাঁস হওয়ার তো হয়েই গেছে।’
‘সেজন্যই তো তোমাকে ডেকে এনেছি মাই বয়।’ হাসলেন ট্রাম্প।
তারপর রানার দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললেন, ‘তোমার মোবাইলটা একটু দেওয়া যাবে।’
রানা অফিসিয়াল মোবাইলটা হোটেলেই রেখে এসেছে। সাথে নিয়েছে নিজের স্মার্ট ফোন। বিশ্বের সব বান্ধবীদের ছবি, নম্বর আর প্রোফাইল এর ভেতরেই রাখা আছে।
‘দাও।’ নিশ্চুপ রানার সামনে হাত পাতলেন প্রেসিডেন্ট।
মোবাইল বের করে কোনো মেসেজ এসেছে কি না দেখে নিল রানা।
‘এক্সকিউজ মি। তুমি একটু বস।’
মোবাইলটা হাতে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেলেন প্রেসিডেন্ট। চুপচাপ বসে রইল রানা। আজ রাতে ক্রিস্টিনাকে ডিনারের দাওয়াত দিয়েছে।
‘কোথায় খাওয়াবে?’ জানতে চেয়েছিল সে।
‘সেটা না হয় চমকই থাক। আমি তোমাকে পিক করব। কখন করব জানাব তোমাকে।’ বলেছিল রানা।
পুরো আধাঘণ্টা পরে ট্রাম্প বের হয়ে এলেন ওয়াশরুম থেকে।
‘মাই ডিয়ার, ফোনটা তো খুব সুন্দর। কোন দেশের এটা?’
‘মেড ইন বাংলাদেশ।’ নীরস কণ্ঠে বলল রানা।
‘মোদী আমাকে ভারতের তৈরি মোবাইল দিতে চেয়েছিলেন। আমি নিইনি। কারণ তুমি তো জানোই চীনের সাথে ওদের সম্পর্ক কেমন। এদিক দিয়ে বাংলাদেশের তৈরি মোবাইলই ব্যবহার করা ঠিক হবে বলে মনে হচ্ছে। তোমাদের সাথে চীনের সম্পর্কও ভালো। বাংলাদেশের শার্ট পরছি। ভাবছি এবার মোবাইল ব্যবহার করে দেখা যেতে পারে, কী বলো?’
মাথা ঝাঁকাল রানা। মোবাইল ফোন ফেরত দেওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
‘ওকে রানা। গুডবাই। আবার দেখা হবে।’ ট্রাম্প হাসিমুখে বললেন। হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়ালেন।
‘স্যার, মোবাইলটা?’
‘ও হ্যাঁ। মোবাইলটা। রাহাতকে বোলো মোবাইলটা আমার পছন্দ হয়েছে। তাই রেখে দিলাম। তোমাকে একটা ভালো মোবাইল কিনে দিতে বলবে। স্কুলে থাকতে আমাকে টেম্পু বলে খেপাতো। কিন্তু তার খেসারত দিক কিছুটা, কী বলো?’ g
