লিলি আপা ও রিকশাওয়ালা

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০১৯, ১৯:০৫

 আফরীন সুমু

 

লিলি আপার এক পরিচিত জন হাসপাতালে ভর্তি। আপা সেখানে যাবেন। আমার কোচিং নেই জেনে উনি আমাকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে এলেন। তেমন কোনো কাজ নেই, খালি আপার সঙ্গে রিকশায় করে যাব আর রোগীটা দেখে চলে আসব। তাই গড়িমসি করলাম না। হাসপাতালে খাবার দাবারের প্রাচুর্য থাকে। বাঙালি দিলদরিয়া জাতি, রোগী দেখতে গেলে ফলফলাদি নিতে কার্পণ্য করে না। তারা মুমূর্ষু রোগীকে দেখতে গেলেও সঙ্গে করে আপেল, কমলা, বেদানা, আঙুর এসব নিয়ে যায়। সুতরাং অন্যের সঙ্গে রোগী দেখতে গেলে লাভ ছাড়া লস নেই। আমি আপেল, কমলা, বেদানা, আঙুর এসব খাবার জন্য আপার সঙ্গে রওনা দিলাম।

আপা রিকশা ঠিক করবেন। বরাবরের মতোই রিকশাওয়ালারা ঘাড় কাত করে উদাস ভঙ্গিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। আপা শক্ত সামর্থ্য দেখে এক রিকশাওয়ালাকে ডাক দিলেন, ‘অ্যাই ভাই যাবেন?’ রিকশাওয়ালা অনাগ্রহী ভঙ্গিতে বললেন, ‘কই যাইবেন?’ আপা বললেন, ‘ঢাকা মেডিকেল।’ রিকশাওয়ালা আগের ভঙ্গি ধরে রেখেই বললেন, ‘যামু।’ আপা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কত?’ তিনি বললেন, ‘আপনে কত দিবেন?’ আপা বললেন, ‘আপনি কত হলে যাবেন, সেটা বলেন।’ রিকশাওয়ালা গা জ্বালানো হাসি দিয়ে বললেন, ‘শুনি না আপা আপনেরডা।’ আপা রেগেমেগে বললেন, ‘মাগনা যাব।’ বলেই হন হন করে অন্য রিকশার দিকে এগোলেন। এবার বেছে বের করলেন একজন বয়স্ক রিকশাওয়ালাকে। বয়স্করা একটু ধীরে চালালেও ভাব কম নেয়, শয়তানিও করে কম। আপা তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘অ্যাই চাচা যাবেন?’ চাচা আগ্রহী কণ্ঠে বললেন, ‘যামু, কই যাইবেন?’ আপা বলতেই চাচা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘উঠেন।’ আপা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কত দেব বলেন।’ চাচা বললেন, ‘ভাড়া যা হয় তাই দিয়েন।’ যা ভাড়া তাই দিয়েন কথার অর্থ আপার জানা আছে। আপা বললেন, ‘ষাট টাকা দেব কিন্তু।’  চাচা বললেন, ‘দিয়েন দশ-বিশ টাকা কমবেশি, ওঠেন।’ আপা বুঝলেন চাচা ঝানু লোক। আপা উঠছেন না। পাশ থেকে এক অতি আগ্রহী রিকশাওয়ালা ডাক দিলেন, ‘এই যে আপা, ষাইট টেকা আহেন।’ আপা চাচা মিয়াকে রেখে ঐ রিকশায় উঠলেন।

রিকশায় উঠে আপা রোগীর সম্পর্কে অল্প বিস্তর ধারণা দিতে শুরু করলেন। কেবল নামধাম বলেছেন এর মধ্যে রিকশা থেমে গেল। শব্দ হয়নি, তার মানে টায়ার ফাটেনি। রিকশাওয়ালা নেমে পেছনে চলে গেলেন। তার মানে চেইন পড়েছে। আমরা বিঘ্নিত মনোযোগ ফিরিয়ে নিয়ে আবার কথাবার্তা শুরু করলাম। কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই আবার একই কাণ্ড। কিছুদূর যেতে যেতে এই ঘটনা পৌনঃপুনিকভাবে চলতে লাগল। এতক্ষণে তার এককথায় ষাট টাকায় চলে আসার কারণ বোঝা গেল। আপা বিরক্ত গলায় বললেন, ‘আপনার যে এরকম ঘন ঘন চেইন পড়ে, এটা নিশ্চয়ই আপনি জানতেন। জেনেশুনে দূরের রাস্তায় এলেন কেন?’ রিকশাওয়ালা বললেন, ‘আফা, অপমান কইরা কতা কইয়েন না। চেইন আমার পড়ে না, রিশকার পড়ে।’  আপা বললেন, ‘যারই পড়ুক, আপনি এই রিকশা নিয়ে আসবেন কেন?’ রিকশাওয়ালা বলল, ‘আগে দেহি নাই, এই হপায়ই দেখলাম।’ আপা ও আমি দুজনেই বুঝলাম এটি একটি নির্জলা মিথ্যা কথা। আপা আর কিছু বললেন না। চেইন পড়তে পড়তে অনেকটা রাস্তা যাওয়ার পর আপা একটা চায়ের দোকানের সামনে রিকশা থামালেন। আমাকে বললেন, ‘আয় তো, বড্ড চা খেতে ইচ্ছে করছে।’ রিকশা থেকে নেমে আপা দু কাপ চায়ের অর্ডার দিলেন। আমি বললাম, ‘আপা রিকশা।’ আপা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘চুপচাপ, চা খা। একদম তাড়াহুড়ো করবি না।’ আমি বললাম, ‘আপা, হাসপাতালে দেরি হয়ে যাবে না?’ আপা মাথায় একটা চাটি মেরে বললেন, ‘তোকে না বললাম চা খেতে, এত কথা বলছিস কেন?’ আপার এই এক সমস্যা মুখের সাথে সমান তালে হাত চলে। আমি চুপচাপ চা খাচ্ছি। আপাও খুব ধীরে সুস্থে চায়ে চুমুক দিচ্ছেন। রিকশাওয়ালা বিরক্ত হয়ে হাঁক দিল, ‘ও আপা আর কতক্ষণ?’ আপা জবাব দিলেন না। আমরা ধীরে সুস্থে চা শেষ করে রিকশায় উঠলাম। তারপর চেইন ফেলতে ফেলতে হাসপাতাল গেটে পৌঁছলাম। এবার ভাড়া দেওয়ার পালা। আপা ষাট টাকা বের করে দিতেই রিকশাওয়ালা বলল, ‘এইডা আপনে কী দিলেন? ষাইট টাকায় তো হইব না।’ আপা ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘কেন?’ রিকশাওয়ালা বলল, ‘চা খাইছেন, কতক্ষণ খাড়া করায়া রাখছেন হিসাব আছে? বিশ টেকা বাড়ায়া দিবেন।’ আপা কোমরে হাত দিয়ে বললেন, ‘আচ্ছা, এই কথা? চা খেয়েছি বলে বাড়িয়ে দেব আর আপনি যে সারা রাস্তা চেইন ফেলতে ফেলতে এনেছেন তার কী হবে? আপনার কাছ থেকে উল্টো বিশ টাকা চাওয়ার আগে বিদায় হোন।’ আপা টাকাটা ধরিয়ে দিয়ে গট গট করে হেঁটে এলেন। রিকশাওয়ালা মানুষ চিনতে ভুল করেছে। আমি আপার পিছু পিছু ছুটলাম। আপেল, কমলা, আঙুর, বেদানা খাব।   g