মানসম্মত মত্স্যখাদ্য আমদানিতে সহায়ক নীতিমালার তাগিদ

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০১৯, ২২:৩৫

দেশে মত্স্য সম্পদের উত্পাদন বৃদ্ধিতে নিরাপদ ও মানসম্পন্ন মত্স্য খাদ্য উত্পাদনের ব্যবস্থা এখনো অপ্রতুল। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে চিংড়িসহ মত্স্য সম্পদ রপ্তানির স্বার্থে মানসম্পন্ন খাদ্য আমদানি প্রয়োজন। কিন্তু এক্ষেত্রে সরকারের সহায়ক নীতিমালার অভাব রয়েছে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়েরও ঘাটতি রয়েছে। বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে হঠাত্ করে কোনো নীতিমালা জারি এই খাতে সংকটের সৃষ্টি করে। এতে আমদানিকারকের পাশাপাশি প্রান্তিক চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফলে উত্পাদনব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় রপ্তানি বাণিজ্যও ক্ষতির মুখে পড়ে। এ সমস্যা থেকে উত্তরণে সরকারের আমদানি সহায়ক নীতিমালা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন এ খাতের উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা।

গতকাল শনিবার দৈনিক ইত্তেফাক কার্যালয়ের মজিদা বেগম মিলনায়তনে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় তারা এই মতামত দেন।  দৈনিক ইত্তেফাক ও বাপকা (বাংলাদেশ অ্যাকোয়া প্রোডাক্ট কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশন) আয়োজিত ঐ আলোচনায় প্রধান অতিথি ছিলেন মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব রইছউল আলম মণ্ডল। ইত্তেফাকের ইকোনমিক এডিটর জামাল উদ্দীনের সঞ্চালনায় এতে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের বিশেষজ্ঞ, আমদানিকারকেরা তাদের মতামত তুলে ধরেন। এ সময় মত্স্য খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাংবাদিক রেজাউল হক কৌশিক।

বক্তারা বলেন, দেশে মত্স্য খাদ্য এখনো মানসম্পন্ন পর্যায়ে উন্নীত হয়নি। এজন্য চিংড়িসহ রপ্তানিমুখী মত্স্য খাতের জন্য মানসম্পন্ন খাদ্য আমদানি করতে হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার সুযোগে কয়েক মাস আগে বন্দরে আমদানিকৃত বিশাল পরিমাণ মত্স্য খাদ্য আটকে দেওয়া হয়েছে। এসব মত্স্য খাদ্য গত চার মাসেও বন্দর থেকে ছাড় হচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় বাজারে মত্স্য খাতের সংকট দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় মানহীন মত্স্য খাদ্য চড়া দরে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন চাষিরা। এতে উত্পাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ফলে চিংড়িসহ হিমায়িত মাছের উত্পাদনে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা।

গত ৪ আগস্ট মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে বলা হয়েছে, আমদানিতব্য মত্স্য খাদ্যে সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক, পেস্টিসাইড, ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য থাকতে পারবে না। একই সঙ্গে ক্ষতিকারক ক্রোমিয়াম, ট্যানারি উপজাত ও মেলামাইনমুক্ত হতে হবে। পণ্যটি শূকর ও প্রাণিজ উপজাতমুক্ত হতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রাণিজ উপজাত উপস্থিতির পরীক্ষা করতে হবে। মূলত সমস্যার শুরু এখান থেকেই।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মত্স্যসচিব রইছউল আলম মণ্ডল বলেন, যারা এই আদেশের আগেই ঋণপত্র (এলসি) খুলেছে, তাদের পণ্য ছেড়ে দেওয়া উচিত। বাজারে এখনো প্রচুর মিট অ্যান্ড বোন মিল রয়ে গেছে। তবে আমদানিকৃত খাদ্য আটকে থাকায় উদ্যোক্তাদের ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, আমদানি নীতিতে নেই বলে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এটি পর্যালোচনায় কমিটি করা হয়েছে। তিনি এ খাতের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য মঞ্জুর মোর্শেদ আহমেদ বলেন, মত্স্য খাদ্যের একটি মানসম্পন্ন নীতিমালা হওয়া দরকার। আমদানির পর বন্দরে আটকে রাখা যৌক্তিক নয়। তবে কোনো পরিপত্র জারি হলে এর ভিত্তিতে কাজ করাও আমাদের দায়িত্ব।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, আমদানিকৃত এসব খাদ্য ব্যবহার করা না গেলে তা নষ্ট হয়ে যাবে। এরই মধ্যে অনেক সময় পার হয়ে গেছে। এতে করে আমদানিকারকের  লোকসান গুণতে হচ্ছে। বাপকার সভাপতি মোহাম্মদ তারেক সরকার বলেন, আমদানিকৃত এসব খাদ্য মানসম্পন্ন হওয়ায় তা দিয়ে উত্পাদিত মাছ ইউরোপে রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু হঠাত্ করে বলা হলো শূকরের চর্বি আছে। আর বন্দরে কোটি কোটি টাকার আমদানিকৃত খাদ্য আটকে গেল। আগে থেকে বলা হলে আমরা আমদানি করতাম না। এ কারণে আমরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছি।

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. শেখ আহমাদ আল নাহিদ বলেন, আমদানিকৃত মত্স্য খাদ্য পরীক্ষায় প্রাণিজ উপজাত কত মাত্রা পর্যন্ত থাকা যাবে তা উল্লেখ না থাকায় ল্যাবে পরীক্ষায় খুব সামান্য পরিমাণ থাকা সত্ত্বেও বন্দরে শুল্ক বিভাগ আটকে দিচ্ছে। যা সংকট বাড়িয়ে দিয়েছে। এমএক এএসপিএফ হ্যাচারির মালিক মাঈনউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমদানি হওয়া মত্স্য খাদ্যের সমমানের পণ্য এখানে উত্পাদন হয় না। চিংড়ি চাষে প্রাথমিক খাদ্য হিসেবে এগুলো আমদানি করতে হয়। এতে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কিছু থাকলে তা রপ্তানিকারক দেশ আটকে দিত।

চিংড়ি খাদ্য আমদানিকারক ও ফিসটেক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আতাউল করিম ভূঁইয়া বলেন, পিএসআই ব্যবস্থায় গেলে আজকের এ সংকট তৈরি হতো না। জাতীয় স্বার্থে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নীতিমালা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।

সলিডারিটেড বাংলাদেশের টিম লিডার মঈনউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমদানি বন্ধের সুযোগে দেশে পেঁয়াজের বাজারের মতো হঠাত্ করে মত্স্য খাদ্যের দাম বেড়ে গেছে। ইউরোপ ও আমেরিকার মতো দেশের সনদ থাকার পর আমদানি নিষিদ্ধ হওয়া উচিত নয়।

মত্স্য অধিদপ্তরের সাবেক উপপরিচালক কবির আহমেদ বলেন, আমদানিকৃত মত্স্য খাদ্যে শূকরের উপজাত দেওয়া বাস্তবে সম্ভব হয় না। কেননা এতে প্রতি কেজি খাদ্যের দাম পড়বে ৫০০ টাকা। বাপকার সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম বলেন, সরকারের এক পরিপত্র আমাদের জন্য ‘কাল’ হয়েছে।

মত্স্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. জিল্লুর রহমান বলেন, মত্স্য খাদ্য আমদানি নীতিমালা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এটি নিয়ে আরো পরামর্শক সভা হবে। এর ভিত্তিতে নীতিমালা সংশোধন করা হবে।

বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিইও মো. শাহাদত আলী বলেন, চিংড়ির ‘ভেনামি’ জাত আসার পর থেকে বিশ্ববাজারে দরপতন হয়েছে।