কুর্নিশ হে শিক্ষাগুরু

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০১৯, ১৮:২১

আহসান জোবায়ের

 

বাদশাহ আলমগীর কিংবা আব্রাহাম লিংকন! যুগে যুগে মহান ব্যক্তিরা শিক্ষাগুরুর কুর্নিশ করে গেছেন। সকল সফল মানুষের জীবনেই একজন শিক্ষকের অনুপ্রেরণা থাকে। যাকে অনুসরণ করে একজন সফল ব্যক্তি তার সফলতার শেকড় তৈরি করে। আমরাও যদি অতীতে ফিরে তাকাই তাহলে স্কুলজীবনের কোনো শিক্ষকের চেহারা নিশ্চয়ই স্মৃতিতে ভেসে উঠবে। যার উপদেশ ও সহযোগিতা আমাদের নতুন করে কিছু ভাবতে শিখিয়েছে। আর তিনি যদি পিটার তাবিচির মতো শিক্ষক হন তাহলে তো কথাই নেই। যার একান্ত প্রচেষ্টায় বদলে দিচ্ছেন শিক্ষার্থীদের জীবন। তৈরি করে দিচ্ছেন সাফল্যের সুযোগ।

 

‘গ্লোবাল টিচার প্রাইজ’-এ ভূষিত হন পিটার তাবিচি

শিক্ষকতা পেশায় অসামান্য অবদান রাখছেন এমন একজনকে ২০১৫ সাল থেকে ‘গ্লোবাল টিচার প্রাইজ’-এ ভূষিত করে আসছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক চ্যারিটি ‘ভারকি ফাউন্ডেশন’। ২০১৯ সালে এজন্য ১৭৯টি দেশ থেকে ১০ হাজার জনকে মনোনীত করা হয়েছিল। সবাইকে পেছনে ফেলে পিটার তাবিচিই নির্বাচিত হয়েছেন সেরা শিক্ষক হিসেবে। পেয়েছেন ১০ লাখ ডলার মূল্যের পুরস্কার। সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে প্রথমবারের মতো উড়োজাহাজে চেপে তাকে যেতে হয় দুবাইতে। বাবা-চাচাসহ সহোদর সবাই শিক্ষক। পরিবারের মহান পেশাকেই জীবনের ব্রত করেছে পিটার।

পুরস্কার পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় তিনি জানান, তার ছাত্রদের অর্জনই তাকে এতদূর পৌঁছে দিয়েছে। এই পুরস্কার তাদেরও একটা সুযোগ করে দিয়েছে। সুযোগ করে দিয়েছে এটি বলার যে, তারা যেকোনোকিছু করতে পারে। তার স্বপ্ন, আফ্রিকার তরুণদের প্রতি আর নিম্ন প্রত্যাশা করা হবে না। আফ্রিকা বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, উদ্যোক্তার জন্ম দেবে, যাদের নাম একদিন বিশ্বের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়বে এবং এই গল্পের একটি বড় অংশজুড়েই থাকবে মেয়েরা।

 

 

সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের মাঝে অদম্য স্বপ্ন বুনে দিয়েছেন

গল্পটি কেরিকো মিক্সড ডে সেকেন্ডারি স্কুলের। কেনিয়ার নাকুরু কাউন্টির পোয়ানি নামের প্রত্যন্ত এক গ্রামে এর অবস্থান। যার নাম এখন শুধু আফ্রিকার দেশটিতেই নয়, ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের নানাপ্রান্তে। আর এই পরিচিতি এনে দিয়েছেন স্কুলটির গণিত ও পদার্থবিদ্যার শিক্ষক পিটার তাবিচি, যিনি দারিদ্র্য, ক্ষুধা আর সহিংসতা জয় করে শিক্ষার্থীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য লড়াইয়ের পথ দেখাচ্ছেন। পিটার তাবিচির এক তৃতীয়াংশ ছাত্রই এতিম কিংবা একক অভিভাবকের পরিবার থেকে আসা। তাদের ৯৫ ভাগই দারিদ্র্যের মধ্যম জীবনযাপন করেন। অনেককে স্কুলে আসতে হয় ৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে, বর্ষায় যা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। প্রত্যন্ত স্কুলটিতে মাত্র একটি কম্পিউটার। তাতে কোনো ইন্টারনেট সংযোগ নেই বললেই চলে। ল্যাবরেটরি বলেও তেমন কিছু নেই। কিন্তু তাতেও শিক্ষার্থীরা দমে যায়নি। ক্লাসে ঠিকমতো বসার সুযোগ হয় না। ৩৫ থেকে ৪০ জনের এক একটি শ্রেণিতে ৭০ থেকে ৮০ জনকে জায়গা দিতে হয়। কিন্তু তাতে কী! পিটার তাবিচি সুবিধাবঞ্চিত এই শিক্ষার্থীদের মধ্যেই অদম্য স্বপ্ন বুনে দিয়েছেন। গণিত আর বিজ্ঞানের অবারিত দুনিয়ার সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। তাদেরকে তিনি পিছিয়ে রাখতে চান না আধুনিক জ্ঞান আর প্রযুক্তিতেও। তার কথায়, ‘ভালো শিক্ষক হতে হলে আপনাকে সুজনশীল হতে হবে, সেইসঙ্গে প্রযুক্তিকে আলিঙ্গন করতে হবে। আপনাকে অবশ্যই শিক্ষকতার আধুনিক উপায়গুলোকে গ্রহণ করতে হবে। কাজ করতে হবে বেশি, কথা বলতে হবে কম।’ ছাত্রদের জানানোর জন্য বিশ্বের নিত্য-নতুন জ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত হতে হয় তাকে। এজন্য স্কুলে ইন্টারনেট না থাকলেও নিয়মিত সাইবার ক্যাফেতে গিয়ে সেই ক্ষুধা মেটান তিনি।

 

ক্লাসের বাইরেও বিজ্ঞান চর্চার প্লাটফর্ম

শুধু ক্লাসের পড়াশোনাতেই নয় তার বাইরেও শিক্ষার্থীদের জন্য বিজ্ঞান চর্চার প্লাটফর্ম তৈরি করেছেন পিটার। তার মতে, বিজ্ঞানই তার শিষ্যদের ভবিষ্যত্ দেখানোর পথে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এজন্য স্কুলে দুটি ক্লাবও গড়েছেন। একটি ট্যালেন্ট নারচারিং ক্লাব, অন্যটি সায়েন্স ক্লাব। ২০০৭ সালের নির্বাচনের পর কেনিয়ায় জাতিগত সংঘাত তৈরি হয়। সেটি পৌঁছে প্রত্যন্ত এই গ্রামেও। আদিবাসী বিভিন্ন গোষ্ঠী সেখানে একে অপরের সঙ্গে বিবাদমান। এই পরিস্থিতি থেকে নিজের ছাত্রদের দূরে রাখতেও উদ্যোগ নিয়েছেন পিটার। গড়ে তুলেছেন ‘পিস ক্লাব’। ৭টি গোষ্ঠী থেকে আসা তার শিক্ষার্থীদের মধ্যে দৃঢ় বন্ধন গড়ে তোলাই যার উদ্দেশ্য। গতবছর দেশটির বিজ্ঞান ও প্রকৌশল মেলায় শহরাঞ্চলের বাঘা বাঘা একাডেমিকে পেছনে ফেলে গণিত বিভাগের সেরা পুরস্কার তারা ছিনিয়ে নিয়েছে। এমন একটি যন্ত্র তারা উদ্ভাবন করেছে, যা শুধু বৃত্তের পরিমাপ সহজে বের করতেই সক্ষম নয়, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী আর বধিররাও সেটি ব্যবহার করতে পারে। মাত্র ৬ বছর আগে যাত্রা করা স্কুলটি কেনিয়ার ৫৬তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রকৌশল মেলায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে। শিক্ষার্থীদের গণিত দলটি এবার ইন্টেল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান ও প্রকৌশল মেলার জন্যও উত্তীর্ণ হয়েছে। আগামী মে মাসে তাদের দু’জন প্রতিনিধি যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার সেই আয়োজনে অংশ নেবে। এই স্কুলটি যুক্তরাজ্যের রয়্যাল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রি অ্যাওয়ার্ডও অর্জন করেছে।

 

শিক্ষার্থীরা জায়গা করে নিচ্ছে দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে

পিটারের এসব কার্যক্রমে সুফলও মিলছে হাতেনাতে। স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে ভালো করছে। স্কুলে শিক্ষার্থীদের বাজে আচরণের ঘটনা সপ্তাহে ৩০টি থেকে মাত্র ৩০টিতে নেমে এসেছে। আর তার পুরোনো শিক্ষার্থীরা স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জায়গা করে নিচ্ছে। এর কৃতিত্ব অবশ্য নিজেকে নন, শিষ্যদেরই দিচ্ছেন পিটার। তিনি বলেন, ‘আমি আমার ছাত্রদের নিয়ে ভীষণ গর্বিত। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি সামনে থেকে তাদের প্রতিশ্রুতি, মেধা, বুদ্ধি আর বিশ্বাস দেখতে পাই। পিটার মাসে যে বেতন পান তার ৮০ ভাগই খরচ করেন শিক্ষার্থী আর স্থানীয় মানুষের কল্যাণে। কেননা, শুধু ক্লাসে এলেই তো হবে না, শিশুরা যে পরিবেশে বাস করে তারও তো উন্নয়ন চাই।’ তার মতে, অভিভাবকদের শিক্ষার গুরুত্ব বোঝানোই অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এজন্য যেসব শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার সম্ভাবনা থাকে তাদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন তিনি। যেসব মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে বোঝান সেসব পরিবারকেও। সন্তানদের স্কুলে নিয়মিত পাঠাতে উদ্বুদ্ধ করেন। এই গ্রামটির অবস্থান এমন এক জায়গায় যেখানে দুর্ভিক্ষ নিয়মিত ঘটনা। তার হাত থেকে বাঁচাতে গ্রামবাসীকে ক্ষরা সহিষ্ণু শস্য উত্পাদনের ওপর প্রশিক্ষণও দেন তিনি।

পিটার তাবিচির এসব গল্প এখন সারাবিশ্বের মানুষের কাছেই ছড়িয়ে পড়েছে। গত কয়েকদিনে বিশ্বের প্রধান সব গণমাধ্যম তাকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিটার যা করেছেন তা অনেক ধনী দেশের জ্ঞানীদের কাছে স্বপ্নের মতো মনে হবে। আর এমন ব্যক্তি যদি বিশ্বের সেরা শিক্ষকের উপাধি পান তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।