দীপংকর গৌতম
কন্যা এসেছে বাপের বাড়ি। ঘর ভরা সে আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে অলিতে গলিতে। ঢাকের বাজনা জানান দিচ্ছে, মহাশক্তির আবির্ভাবে বধ হবে অসুর। সেই আনন্দের হাজার পসরা ডানা মেলেছে গুলশান বনানী পূজামণ্ডপে। ২০০৮ সাল থেকে বনানীতে মণ্ডপ করে দুর্গাপূজার আয়োজন শুরু হয়েছে। মণ্ডপের গঠন ও দীর্ঘ সড়ক আলোকিত করে করা হয়েছে বর্ণিল আলোকসজ্জা। আলোর এই ব্যবহারের বিশেষত্ব হচ্ছে নিজেকে আনন্দিত ও আলোকিত করা। প্রতি বছরের মতো এবারও মণ্ডপে প্রবেশ করার আগে দীর্ঘ রাস্তায় বর্ণিল আলোকসজ্জা মনকে শারদীয় আনন্দে ভরে দেয়।
বনানী পূজামণ্ডপের বয়স বেশি না হলেও শুরু থেকেই মণ্ডপ সাজানোতে তাদের আয়োজন লক্ষণীয়। দিনাজপুরের ঐতিহাসিক কান্তজিউ মন্দিরের আদলে বা কলকাতার দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দিরের আদলে মন্দির করা মানে ঐতিহ্যের সঙ্গে মানুষের সমন্বয় করা—যেটা শুরু থেকেই তারা করে চলেছে। এবার করা হয়েছে ইলোরা অজন্তা গুহাচিত্রের আদলে। ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের রাজ্য মহারাষ্ট্রের খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ইলোরা-অজন্তা গুহাচিত্র। চরন্দ্রী পাথুরে পাহাড় কেটে এ গুহা মন্দিরসমূহ তৈরি করা হয়েছে। এটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদায় ভূষিত। গ্রানাইড পাথরের এ পাহাড়ের ৩৪টি গুহার মধ্যে ১৭টি সনাতন ধর্মের, ১২টি বৌদ্ধ ধর্মের এবং ৫টি জৈন ধর্মের মন্দির রয়েছে। ধারণা করা হয় চতুর্থ থেকে নবম শতাব্দীর মধ্যে কালাচুরি, চালুক্য ও রাষ্ট্রকুট রাজবংশের শাসনামলে এই মন্দিরগুলো নির্মিত হয়েছিল।
এগুলোর মধ্যে সর্বাপেক্ষা বিস্ময়কর গুহাটির নাম ‘কৈলাসনাথ মন্দির’। এটি একটি গুহা, দেখতে অনেকটা বহুতল মন্দিরের মতো, একটিমাত্র পাথরকে কেটে এটি তৈরি করা হয়েছে। এই গুহায় বহু সনাতন ধর্মের দেবতা এবং পৌরাণিক মূর্তি খোদাই করা আছে। অষ্টম শতাব্দীতে রাষ্ট্রকুটদের রাজত্বকালে এই মন্দিরটি নির্মাণ করে হিন্দু দেবতা শিবের নামে উত্সর্গ করা হয়। মন্দিরটির মধ্যে একটি উন্মুক্ত মণ্ডপ আছে। এখানে বিশাল বিশাল হাতি ও চতুষ্কোণ স্তম্ভ নির্মিত হয়েছে। কৈলাসনাথ মন্দিরের উচ্চতা ২৯ মিটার ও দৈর্ঘ্য ৫০ মিটার। এটি প্রায় ২ লাখ টনের পাথুরে পাহার কেটে তৈরি করা হয়েছিল, যার জন্য সময় লেগেছিল ১০০ বছর। পাহাড় কেটে কীভাবে এই মন্দিরগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল তা আজও স্থাপত্যজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক বড়ো বিস্ময়।
সেই আদি নিদর্শন তুলে ধরেছে বনানীর মণ্ডপ। প্রাচীন দেবীর মূর্তি থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে সাজানো হয়েছে মণ্ডপ। দেবী দুর্গার অলংকার তৈরি করা হয়েছে মাটি দিয়ে। সে বার্তায় মাটির কাছাকাছি থেকে বিনয়ী দেবী দুর্গা দূর করবে সকল অশুভ। মন্দিরের ডিজাইন করা হয়েছে প্রাচীন ও আধুনিক মন্দিরের স্থাপনাশৈলী। সঙ্গে রয়েছে বিভিন্ন দেবতার প্রতিলিপি। দেবী দুর্গা এবার ঘোড়ায় চড়ে আসবেন বিদায়ও নেবেন ঘোড়ায় চড়েই। এই বিষয়টিকে মাথায় নিয়ে এবং সম্পূর্ণ নতুন থিমে দেশের সর্ববৃহত্ বনানী পূজামণ্ডপকে সাজানো হয়েছে।
ধূসর রঙে সাজানো মণ্ডপে সন্ধ্যা হলে উঠে আসে এক অন্যরকম আবহ। মণ্ডপ সংলগ্ন মঞ্চে প্রতিবেদন থাকছে সাংস্কৃতিক আয়োজন। যেখানে দেশের প্রতিথযশা শিল্পীরা পরিবেশন করছেন গান-নৃত্য। এছাড়াও নাটিকাসহ নানা আয়োজন থাকছে মঞ্চে। প্রতিদিন থাকছে আলোচনা অনুষ্ঠান, যেখানে বক্তারা তুলে ধরে সম্প্রীতির বাংলাদেশের নানা দিক। ভক্তদের জন্য রয়েছে প্রসাদের ব্যবস্থাও। পূজামণ্ডপের পাশেই দিনভর হচ্ছে রান্না। আগতরা জানালেন, গুলশান বনানী পূজা ফাউন্ডেশনের এমন আয়োজনে তারা খুশি। নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো ছাড় নেই এখানে। তাই নির্বিঘ্নে ঘোরাঘুরি চলছে পূজা চত্বরে।
গুলশান-বনানী পূজা উদ্যাপন ফাউন্ডেশনের যুগপূর্তির এই আয়োজনের প্রধান সমন্বয়ক সুকুমার চৌধুরী জানান, কারিগরদের প্রায় তিন মাসের নিরলস পরিশ্রমের ফসল এবারের পূজামণ্ডপ, যা এরই মধ্যে দেশের সবচেয়ে নান্দনিক পূজামণ্ডপে রূপ নিয়েছে।
