অবশেষে আলোচিত যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। গতকাল রবিবার ভোরে কুমিল্লার নিভৃতপল্লি ভারতের সীমান্তঘেঁষা চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আলকরা ইউনিয়নের কুঞ্জুশ্রীপুর গ্রাম থেকে তাকে সহযোগী যুবলীগ নেতা এনামুল হক আরমানসহ গ্রেফতার করা হয়। সম্রাট যুবলীগ ঢাকা মহানগরের (দক্ষিণ) সভাপতি। আর আরমান একই কমিটির সহসভাপতি। কুঞ্জুশ্রীপুর গ্রামের যে বাড়িটি থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, সেই বাড়িটি ফেনী পৌর মেয়র ও স্টার লাইন পরিবহনের মালিক হাজি আলাউদ্দিনের ভগনিপতি ও স্টার লাইন পরিবহনের পরিচালক জামায়াত নেতা মনির চৌধুরীর।
গ্রেফতারের পর সম্রাট ও আরমানকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। এরপর সম্রাটকে সঙ্গে নিয়ে তার কাকরাইলের অফিসে অভিযান চালায় র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। ঐ অফিস থেকে একটি পিস্তল, বিপুল পরিমাণ মদ, ইয়াবা ও দুটি ক্যাঙ্গারুর চামড়া উদ্ধার করা হয়। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন-২০১২ অনুযায়ী অবৈধভাবে বন্যপ্রাণীর চামড়া সংরক্ষণের অভিযোগে তার ৬ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এছাড়া সম্রাটের দ্বিতীয় স্ত্রী শারমীন চৌধুরীর মহাখালী ডিওএইচএসের বাসা, শান্তিনগরে তার ভাই বাদলের বাসা ও মিরপুরে আরমানের বাড়িতে অভিযান চালায় র্যাব। গ্রেফতারের সময় সম্রাট ও আরমান মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন। তাদের কাছ থেকে বিদেশি মদও পাওয়া গেছে। এ কারণে আরমানকেও ৬ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। পরে রাতে সম্রাটকে কেরানীগঞ্জ ও আরমানকে কুমিল্লা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
কি অভিযোগে সম্রাটকে গ্রেফতার করা হয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে র্যাব মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ বলেন, ক্যাসিনো কেলেঙ্কারির ঘটনায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ক্যাসিনো ব্যবসার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা হবে উল্লেখ করে র্যাব মহাপরিচালক বলেন, ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর পর সবগুলোতেই তার নাম পাওয়া যাচ্ছিল। তখনই তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা শুরু করে র্যাব। কিন্তু পালিয়ে যান সম্রাট। বারবার স্থান বদলের কারণে তাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। ভারতে পালিয়ে যাওয়ার জন্য সীমান্তবর্তী একটি গ্রামে অবস্থান নিয়েছিলেন। পরে সেখান থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
সম্রাটের অফিসে মিলল অস্ত্র-মাদক ও ক্যাঙ্গারুর চামড়া
ক্যাসিনো সম্রাট খ্যাত যুবলীগ নেতা সম্রাটের কার্যালয়ে একটি পিস্তল, বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ ও দুটি ক্যাঙ্গারুর চামড়া পাওয়া যায়। বন অধিদপ্তরের পরিদর্শক আবদুল্লাহ আস-সাদিক বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন-২০১২ অনুযায়ী অবৈধভাবে বন্যপ্রাণীর চামড়া সংরক্ষণ আইন-বহির্ভূত ও শাস্তিযোগ্য। এ আইনের ৩৪ এর ‘খ’ ধারা অনুযায়ী শাস্তি সর্বোচ্চ ছয় মাস ও ১ লাখ টাকা জরিমানা। আটক সম্রাটের কার্যালয় থেকে দুটি ক্যাঙ্গারুর চামড়া পাওয়ায় বন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মামলার প্রস্তুতি চলছে বলেও জানান তিনি।
গতকাল দুপুরে র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলমের নেতৃত্বে র্যাবের একটি দল কাকরাইলে ভুঁইয়া ট্রেড সেন্টারে তালা ভেঙে সম্রাটের কার্যালয়ে ঢুকে অভিযান শুরু করে। সন্ধ্যা সোয়া ৬টা পর্যন্ত অভিযান চলে। পরে বন্যপ্রাণীর চামড়া রাখার অপরাধে তাকে ৬ মাসের কারাদণ্ড দেন র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম।
গতকাল সন্ধ্যায় সম্রাটকে তার কাকরাইলের অফিস থেকে বের করার সময় তার লোকজন জয়বাংলা ও সম্রাটের নামে স্লোগান দেন। তবে কেউ সম্রাটকে ছিনিয়ে নিতে এগিয়ে যাননি। এর আগে দুপুরে র্যাবের অভিযানের শুরু থেকেই বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী কাকরাইলের অফিসের সামনে অবস্থান নেন। এছাড়া উত্সুক মানুষের ভীড়ও ছিল।
কুমিল্লার যে বাড়ি থেকে গ্রেফতার হন সম্রাট
আমাদের কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, সীমান্তবর্তী জামায়াত অধ্যুষিত কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আলকরা ইউনিয়নের কুঞ্জুশ্রীপুর গ্রাম এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এলাকার এবং ঐ বাড়ির লোকজন জানতো ঢাকা থেকে তারা মেহমান হিসেবে বেড়াতে এসেছেন। সীমান্ত থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হওয়ায় র্যাবের ধারণা, সম্রাট হয়তো ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে ঐ গ্রামে পালিয়েছিলেন।
আলকরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এ কে এম গোলাম ফারুক বলেন, শনিবার রাত ৯টার দিকে প্রথমে র্যাবের সাত-আটটি গাড়ি ঐ বাড়িটি ঘিরে ফেলে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরো ১০-১২টি গাড়ি মনির চৌধুরীর বাড়ির পাশে অবস্থান নেয়। ভোর ৫টার দিকে র্যাব সদস্যরা সম্রাট ও তার সহযোগী আরমানকে ধরে নিয়ে যায়।
বাড়ির মালিক মনির চৌধুরীর বোন নাজু বেগম বলেন, র্যাব যাদের ধরে নিয়ে গেছে, তারা তিন দিন আগে এই বাড়িতে এসে দোতলার একটি কক্ষে অবস্থান নেয়। সেখানেই তাদের খাবার দেওয়া হতো। কখনো বাসার বাইরে বের হতো না। আমাদের জানানো হয়, তারা বেড়াতে এসেছেন। তিনি বলেন, তিন মাস আগে আমার ভাই এই বাড়িট নির্মাণ করেন। অভিযানের সময় আমার ভাই মনির চৌধুরী বাসায় ছিল। প্রতিবেশীরা জানান, মনির চৌধুরী জামায়াতের নেতা। এলাকায় তিনি ছক্কা নামে পরিচিত। মাঝেমধ্যে গাড়িতে বিভিন্ন লোকজনকে বাড়ি নিয়ে আসতেন।
হাজি আলাউদ্দিন সাংবাদিকদের বলেছেন, মনিরের বাসায় সম্রাটের অবস্থান করার খবর তারও ‘আগে জানা ছিল না’। শনিবার র্যাবের অভিযানের খবর জানার পর রাত ১১টার দিকে মনিরকে ফোন করেছিলাম। সম্রাট কেন তার বাসায়, তা জানতে চেয়েছিলাম। সে আমাকে বলেছে, তিন দিন আগে তারা ঐ বাসায় গেছে। রবিবার সকালেই তারা ঢাকা ফিরে যাবে বলে জানিয়ে রেখেছিল। তার আগেই র্যাব তাদের গ্রেফতার করে।
বিদেশে পালাতে চেয়েছিলেন সম্রাট : র্যাব মহাপরিচালক
র্যাব প্রধান (ডিজি) বেনজীর আহমেদ বলেছেন, ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর দু-একদিন পরই সম্রাট ঢাকা ছেড়ে আত্মগোপনে ছিলেন। আত্মগোপনে থাকতে তিনি বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছিলেন। যে কারণে তাকে গ্রেফতার করতে সময় লেগেছে। গতকাল দুপুরে র্যাব সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
বেনজীর আহমেদ বলেন, সম্রাট বিদেশে পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। এ কারণে সীমান্তবর্তী গ্রামে অবস্থান নিয়েছিলেন। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। এ দেশে সবাই সমান অধিকার ভোগ করবেন। আইন মেনে চলবেন। কেউ যদি আইন অমান্য করেন, বেআইনি কাজে লিপ্ত হন, তাকে শাস্তি পেতে হবে। সম্রাটের বিরুদ্ধে কি অভিযোগ আছে, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে বেনজীর আহমেদ বলেন, আমরা যেসব জায়গায় ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছি, সেসব জায়গা থেকে সম্রাটের নাম বারবার এসেছে। ক্যাসিনো পরিচালনার অভিযোগেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
